সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের অপচেষ্টার নেপথ্যে যারা ভূমিকা রেখেছে, এখনও তাদের শনাক্ত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কারা, কেন, কী উদ্দেশ্যে কুমিল্লায় ইকবাল হোসেনকে ব্যবহার করে অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছে- ১২ দিনেও তার আসল কারণ বের হয়নি। তবে সব পক্ষই বলছে, তার পেছনে কেউ না কেউ রয়েছে। বিষয়টি জানতে ইকবালসহ চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এ অবস্থায় মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। এদিকে, ইকবালকে নিয়ে গতকাল রাত ১০টার দিকে মণ্ডপে হনুমানের হাতে থাকা গদা উদ্ধারে নানুয়ারদীঘির পাড় এলাকায় যায় পুলিশের একটি দল। ওই গদা পানিতে ফেলেছিল বলে ইকবাল জানিয়েছিল। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে কুমিল্লা দারোগাবাড়ি মাজারের পাশের একটি ঝোপ থেকে গদাটি উদ্ধার হয়েছে।

হিন্দুদের বাড়িঘর, মণ্ডপে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ করার অভিযোগে গতকাল রোববার পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় মোট ১১৮টি মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ছয় শতাধিক অভিযুক্তকে। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা দুই হাজার। অজ্ঞাতনামা আরও ২০ হাজারের মতো আসামি রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

কুমিল্লায় মন্দিরে পবিত্র কোরআন শরিফ রাখার ঘটনায় গ্রেপ্তার ইকবাল 'ভবঘুরে' হিসেবে পরিচিত হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনৈতিক নেতা ও পূজা উদযাপন কমিটির নেতারা বলছেন, পরিকল্পিতভাবে এই যুবককে ভাড়া করে দেশে ঘোলাটে পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। তবে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ইকবাল এখনও মুখ খোলেনি। তাকে কে ভাড়া করে এ কাজে ব্যবহার করেছে- সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি। শুধু নিজের ওপর দায় নিচ্ছে। বারবার জিজ্ঞাসাবাদে একই কথা বলছে।

জিজ্ঞাসাবাদ সম্পর্কে জানাশোনা আছে, এমন একটি সূত্র জানিয়েছে, ইকবাল দাবি করছে- মসজিদের অদূরে মন্দিরে পূজা-অর্চনা হয়, এটি তার পছন্দ নয়। নিজের অনুভূতি থেকেই মন্দিরে কোরআন শরিফ রেখেছে। তবে সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, উগ্রপন্থিদের কাছ থেকে তথ্য বের করা যেমন কষ্টসাধ্য, ইকবালের ক্ষেত্রেও তাই হচ্ছে। কক্সবাজার থেকে গ্রেপ্তার করে কুমিল্লায় আনার পর বাবা-মা, মামা ও স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করানো হয় ইকবালকে। এ সময় ইকবাল তার বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলে। তার মা পূজামণ্ডপ বিষয়ে সব ঘটনা পুলিশকে বলে দেওয়ার কথা বললে ইকবাল এতে ইতিবাচক সাড়া দেয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মন্দিরে হামলা-ভাঙচুর ও সহিংসতার ঘটনায় নেপথ্যে যারা ভূমিকা রেখেছিল, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনাই বড় চ্যালেঞ্জ। এটা না করতে পারলে যে কোনো সময় আবার একই চক্র একই ধরনের ঘটনা ঘটাতে পারে। এর পেছনে রাজনৈতিক কোনো উদ্দেশ্য, দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র, স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ রয়েছে কিনা, তাও বের করা হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, যেখানে সহিংসতা ঘটেছে, সেখানে কেন কী কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো, তা বের করতে পৃথকভাবে অনুসন্ধান চলছে। এরই মধ্যে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু হয়েছে। অনুসন্ধান দলে যারা রয়েছেন, তারা পুলিশ সদর দপ্তরে প্রতিবেদন দেবেন।

আরেক কর্মকর্তার ভাষ্য, কুমিল্লা থেকে ঘটনার সূত্রপাত হওয়ার পর অনেক এলাকায় কুচক্রী মহল অল্প সময়ের মধ্যে এলাকাবাসীকে সংঘবদ্ধ করে হামলা-ভাঙচুরে সম্পৃক্ত করে। গাজীপুরসহ একাধিক জায়গায় স্থানীয়ভাবে যারা এই অপ্রীতিকর ঘটনায় জড়িয়েছে, তারা জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

কুমিল্লা জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্মল চন্দ্র সমকালকে বলেন, ইকবাল একাকী এ ঘটনা ঘটিয়েছে- এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তার পেছনে কারা রয়েছে- এটা বের করতে হবে। প্রয়োজনে তাকে ঢাকায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক।

ইকবালের মা আমেনা বেগম বলেন, ছেলের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। তার মাথা ঠিক নেই। কারও মাথা ঠিক থাকলে কেউ কি মা-বাবা, স্ত্রী-ছেলেমেয়ে ছেড়ে মাজার-মসজিদ ও কবরস্থানে গিয়ে রাত কাটায়? তিনি বলেন, 'ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বলেছি মণ্ডপের ঘটনা বিষয়ে পুলিশকে সব বলে দিতে। সে সব বলে দেবে বলে আমাকে কথা দিয়েছে।'

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, রিমান্ডে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার ব্যাপারে আরও নতুন কিছু তথ্য দিয়েছে ইকবাল। এ বিষয়ে যথাসময়ে গণমাধ্যমকে জানানো হবে।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদ সমকালকে বলেছেন, 'এটি একটি স্পর্শকাতর মামলা। এর তদন্ত আমরা গুছিয়ে আনছি। কে কী বলল, তার কাউন্টার দিতে চাই না। ইকবালের গ্রেপ্তার হওয়া ঘটনা ও জজ মিয়া নাটকের তফাত আছে।'

কুমিল্লার পুলিশ সুপার আরও বলেন, বর্তমানে ইকবালসহ চারজনকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তাই এ বিষয়ে এখন কিছু মন্তব্য করা ঠিক হবে না। আমরা ঘটনার সঙ্গে ইকবালের সম্পৃক্ততা বিষয়ে শতভাগ নিশ্চিত হয়েই তাকে গ্রেপ্তার করেছি।

ইকবালের মামা তাজুল ইসলাম সমকালকে জানান, ঘটনার পর থেকে 'ইকবালের বাবাসহ আমাকে পুলিশ আটক করেছে' মর্মে বিভিন্ন মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। কিন্তু পুলিশ আমাদের আটক করেনি। চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের বিভিন্ন মাজারে ইকবালকে খুঁজতে ডিবি ও জেলা পুলিশকে আমরা সহায়তা করেছি।

কারও কারও ভাষ্য, ঘটনার দিন সকালে মণ্ডপের সামনে থেকে পুলিশকে ৯৯৯-এ কল দেওয়া ও বর্তমানে রিমান্ডে থাকা ইকরাম কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর অনুসারী। এ বিষয়ে গতকাল মেয়র বলেন, 'রাজনীতি করি, সিটি করপোরেশনের মেয়র আমি। আমার অনেক ফলোয়ার থাকতে পারে। ইকরামকে আমি চিনতাম না। ঘটনার পর থেকে তার নাম শুনছি।' মেয়র আরও বলেন, পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে। আশা করি, তদন্তে প্রকৃত অপরাধীরা শাস্তির আওতায় আসবে।

গত ১৩ অক্টোবর নগরীর নানুয়ারদীঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন রাখার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন জেলায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হয়। এ ঘটনায় কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানায় পাঁচটি, সদর দক্ষিণ মডেল থানায় দুটি এবং দাউদকান্দি ও দেবিদ্বার থানায় একটি করে মোট ৯টি মামলা হয়। এসব মামলায় এ পর্যন্ত ৫২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার রাতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত থেকে ইকবালকে গ্রেপ্তারের পর শুক্রবার দুপুরে কুমিল্লায় আনা হয়। গত শনিবার দুপুরে জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম বেগম মিথিলা জাহান ঊর্মির আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চাইলে আদালত ইকবালসহ চরজনের সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। অন্য আসামিরা হলো- ঘটনার দিন সকালে পুলিশকে ৯৯৯-এ ফোন করা রেজাউল ইসলাম ইকরাম, দারোগাবাড়ি মাজার মসজিদের সহকারী খাদেম ফয়সাল ও হুমায়ুন কবির সানাউল্লাহ।