স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ দফায় দফায় বীভৎস সময় অতিক্রম করেছে। যে বিষয়গুলো কেন্দ্র করে এই বীভৎসতার সৃষ্টি এবং ফিরে ফিরে অনেক মানুষ এর নির্মম বলি হয়েছে, সে সবকিছুরই নিরসন ঘটেছিল একাত্তর-পর্বে, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা স্বাধীনতা-উত্তর মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় নিপতিত হলাম গাঢ় অন্ধকারে; ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর সৃষ্ট নির্মম অধ্যায় শুধু একজন ব্যক্তি কিংবা কয়েক ব্যক্তিকে নিঃশেষ করে দেওয়ার বিষয় হিসেবে কোনোভাবেই দেখার অবকাশ নেই। যে জাতিরাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের স্বপ্ন ছিল দীর্ঘদিনের এবং যার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে একটি জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের পথরেখা রচিত হয়েছিল, এর যবনিকাপাত ঘটল এবং রক্তমূল্যে অর্জিত বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার সব রকম চেষ্টা হয়ে উঠল বেগবান।
বিশ্বের ক'টি দেশে আইন করে মানুষ হত্যার বিচারের পথ রুদ্ধ করে রাখার দৃষ্টান্ত আছে? বাংলাদেশ সেই দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে পঁচাত্তর-পরবর্তী অধ্যায়ে। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ হীনস্বার্থবাদী কিংবা রাজনীতির নামে অপরাজনীতির কুশীলবদের নখরাঘাতে বারবার ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে। এই ক্ষত উপশমের উপযুক্ত দাওয়াই না মেলায় ক্ষতের ওপর ক্ষত সৃষ্টি হয়েই চলেছে। সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক বীভৎসতা এরই পুরোনো নজির। ২৪ অক্টোবর সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের অপচেষ্টার কোনো মামলারই বিচার সম্পন্ন হয়নি আজও। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৮ বছর ৯ মাসে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচারের তিন হাজার ৬৭৯টি হামলা হয়েছে। এই সময়ে তাদের বাড়িঘর ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, মন্দির, প্রতিমা ভাঙচুরসহ লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। হতাহতের সংখ্যাচিত্রও অনেক স্ম্ফীত। কোনো অপরাধ কিংবা দুস্কর্মের যদি বিচার না হয়; এসব যদি থেকে যায় প্রতিকারহীন, তাহলে জনজীবনে দুঃখের খতিয়ান বিস্তৃত হওয়াই তো স্বাভাবিক এবং তা হয়েছেও। বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি কিংবা বিলম্বিত বিচারের কুফল কী হতে পারে, এর অনেক নজির আমাদের সামনে আছে। সমকালের ওই শীর্ষ প্রতিবেদনের পার্শ্ব প্রতিবেদনের প্রথমটিতে বলা হয়েছে, সাক্ষীদের অনাগ্রহে বিচার বিলম্বিত। সাক্ষীদের অনাগ্রহ কেন? খুব সহজেই প্রতীয়মান, সাক্ষী সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সাক্ষীরা ফের জীবনের ঝুঁকি নিতে চান না। তারা মনে করেন, যা গেছে যাক; বাকি যেটুকু আছে তা যদি থাকে তবু না হয় কোনোমতে বাঁচা গেল। দ্বিতীয়টিতে বলা হয়েছে, তদন্ত কর্মকর্তারা জানেন না, কোন মামলা কার! কী বিস্ময়কর! রাষ্ট্রশক্তির দায়িত্বশীলদের অবস্থা যেখানে এই, সেখানে কীভাবে তিমির প্রহর কিংবা দুঃখের নিরসন ঘটবে? বাংলাদেশে ইতোমধ্যে অনেকবার দেখা গেছে সর্বনাশের রাজনৈতিক ঐকমত্য। এসবই রয়েছে হীনস্বার্থবাদী রাজনীতির মেরুকরণের ছকে।
শুধু বাংলাদেশ কেন, বিশ্বের অনেক দেশেই সংখ্যালঘুরা কমবেশি ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। কিন্তু এও সত্য, আমাদের মতো কোনো দেশেই প্রতিকারহীনতার চিত্র এত উৎকট নয়। এ দেশে অনেক কিছুই অদ্ভুত। স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনীতি হয়ে দাঁড়াবে বারো ভূতের সমাহার- তা অচিন্তনীয়ই ছিল। মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশে যে সংবিধান রচিত হয়েছিল, তাতে মুক্তিযুদ্ধ পর্বের প্রত্যয়ের প্রতিফলনই ঘটেছিল। কিন্তু সেই সংবিধানের মূল স্তম্ভগুলোতে আঘাত আসতে থাকল একে একে। বদলে গেল রাষ্ট্রের ধর্ম-চরিত্র দুই-ই। সাংবিধানিকভাবেই রাষ্ট্রের চরিত্র হলো সাম্প্রদায়িক। এ অবস্থায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার যে উচ্চারণ আমরা শুনি, এর বাস্তবায়ন কী করে সম্ভব? বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার দাবি দীর্ঘদিনের। এখন সেই সুবর্ণ সুযোগ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও এ নিয়ে কোনোই কথা নেই। এমতাবস্থায় সব অঙ্গীকার, প্রতিশ্রুতি কিংবা প্রত্যয় প্রশ্নবিদ্ধ না হয়ে পারে কী করে?
বাংলাদেশের মানুষ নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের বাসিন্দা হলেও অনেকেই পছন্দ করেন গরম কথা। আমাদের রাজনীতি ও অনেক রাজনীতিবিদের ব্যর্থতা, দ্বিচারিতা, স্ববিরোধিতা, গ্লানি এত বেশি যে, এসব ঘাঁটলে দুর্গন্ধ ছড়ানোর আশঙ্কাই বেশি। তবুও মানুষ আশায় বাঁচে। এও সত্য, নদীতে সব সময় ভাটার টান থাকে না, জোয়ারও আসে। তিমির হননের গানও এই সমাজেই শোনা যায়। তার পরও দুঃখের অবসান হয় না। দুঃখের বিচার হয় না; উপরন্তু দুঃখের খতিয়ান বিস্তৃতই হতে থাকে। মোট কথা, রাষ্ট্রব্যবস্থায় এত অসংগতি জিইয়ে রেখে সংগতিপূর্ণ রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের চিন্তা কতটা যৌক্তিক- এ প্রশ্ন এড়ানোর অবকাশ খুব ক্ষীণ। অতলান্ত আঁধার কাটাতে স্বপ্নের বাংলাদেশে হাজারো মানুষের নীরব আর্তনাদ ধ্বনিত হয়- 'আমি-যে দেখেছি প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে/ বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।' এ দেশে চিকিৎসাবিজ্ঞানের কল্যাণে অনেক দুরারোগ্য ব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব হলেও সাম্প্রদায়িকতার মতো 'ছোঁয়াচে' ও ভয়ংকর ব্যাধি নির্মূল করা যায়নি আজও। কেন যায়নি- এ প্রশ্নের উত্তরও সচেতন মানুষমাত্রেই জানা।
এই সত্য এড়ানো কঠিন- অসাম্প্রদায়িক চেতনা আমাদের রাজনীতির বহিরঙ্গে যতটা দৃশ্যমান, ব্যক্তির প্রাণে কিংবা সমাজের গভীরে তা ততটা প্রবেশ করেনি। এর মুখ্যত কারণ, মানুষের চেতনার অগ্রগতি ও তা ধরে রাখার জন্য রাজনৈতিকভাবে মনোজগতে প্রভাব ফেলার মতো তেমন গভীর কোনো কাজ হয়নি। আজকের উন্নত ইউরোপ এক সময় গভীর সাম্প্রদায়িক ব্যাধিমগ্ন ছিল। কিন্তু সেখানে নানা ধারার সংস্কার আন্দোলন ও ধর্মনিরপেক্ষ মুক্তবুদ্ধি চর্চার বহুমুখী প্রয়াস সমাজকে সংস্কারমুক্ত হতে, অচলায়তন ভাঙতে বড় ভূমিকা রেখেছে। বাঙালি সমাজে প্রতিরোধের আন্দোলন হলেও সঠিক অর্থে স্বাধীন দেশে জাগরণের আন্দোলন কতটা হয়েছে, এ নিয়ে তর্ক আছে। আমরা জানি, দায়িত্বশীলতা বলে মানবজীবনে এক অবশ্য অনুষঙ্গ আছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- বলবান কিংবা ক্ষমতামদমত্ত, দায়িত্বজ্ঞানহীন কুচক্রী মানুষেরা কতদূর যাবে? বাংলাদেশে রাষ্ট্র ও ধর্ম সমার্থক হয়ে গেছে। আমরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অপচেষ্টায় প্রথমেই আঙুল তুলি ধর্মাশ্রয়ী, রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে। হ্যাঁ, তা অমূলক নয়। কিন্তু তাদের 'হেদায়েত' করেন এমন রাজনীতিকের সংখ্যা কি আওয়ামী লীগ কিংবা অন্য ডানপন্থি দলগুলোতে কম?
বাংলাদেশে দুঃখের বিচার হোক। মানুষের অধিকারের সুবর্ণচর হোক দৃশ্যমান। আর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যয় যদি বাস্তবায়ন করতে হয়, তাহলে রাষ্ট্রকে সর্বাগ্রে অসাম্প্রদায়িক করতে হবে। আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীনতা, অসাম্প্রদায়িকতা সর্বোপরি গণতন্ত্র কথার কথা নয়। এ সবকিছুর জন্য যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সদিচ্ছা দরকার; আমাদের রাজনীতির নীতিনির্ধারক অনেকেরই মন-মানসিকতা কতটা এর সংলগ্ন- এটুকুও অস্পষ্ট নয়। কষ্টকর নানা অভিজ্ঞতার পরও আমরা আশাবাদী। আমরা প্রত্যাশ করব, রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদের উচ্চারণসর্বস্ব অঙ্গীকার নয়; মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক অধিকার নিশ্চিতকল্পে কোনো ক্ষেত্রেই তারা এমন কিছু করবেন না, যা দুর্বৃত্তদের অভয় দিতে পারে। যে অপরাজনীতি এত কদর্যের উৎস, এর যদি শুদ্ধিকরণ না করা যায়, তাহলে দুঃখের বিচারের পথ যেমন মসৃণ ও অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না, তেমনি এই কদর্য রাজনীতির প্রতিও মানুষের ধিক্কার বাড়বে। অকল্যাণের পথ আরও প্রশস্ত করবে। আকাশপ্রমাণ তরঙ্গ তুলে গর্জে উঠুক শুভবোধসম্পন্ন সব মানুষ।
লেখক, সাংবাদিক
deba_bishnu@yahoo.com