মাঝিপাড়ায় হিন্দুদের বাড়িতে লুটপাট, হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ফের আলোচনায় এসেছে পার্শ্ববর্তী ধাপেরহাট বন্দর। ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের ওপর অবস্থিত গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলার ধাপেরহাট বন্দর থেকে পীরগঞ্জের মাঝিপাড়ায় যাওয়া যায় সহজেই। দূরত্ব মাত্র পাঁচ কিলোমিটারের মতো। স্থানীয় আওয়ামী লীগ দাবি করেছে, মাঝিপাড়ার ঘটনার পেছনে ধাপেরহাটের জামায়াত-শিবিরের বড় ইন্ধন রয়েছে। একসময় এই ধাপেরহাট থেকে প্রকাশ্যেই গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর, পলাশবাড়ী, সুন্দরগঞ্জ, রংপুরের পীরগঞ্জ, মিঠাপুকুর এবং দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ, ঘোড়াঘাট পর্যন্ত সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো জামায়াতে ইসলামীর। তবে এখন তাদের তৎপরতা গোপনে পরিচালিত হয়ে থাকে বলে জানা গেছে।
রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ বলছিলেন, 'কার ইন্ধনে কারা সহিংসতার এই কাণ্ডটি ঘটিয়েছেন, তা জানতে হয়তো সময় লাগবে। হয়তো রামু থেকে নাসিরনগর পর্যন্ত আরও সব সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মতো এ ঘটনার হোতারাও আড়ালে থেকে যাবে। তবে এ নিয়ে আমার একটুও সংশয় নেই যে মাঝিপাড়ায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা পরিকল্পিত।'

মানচিত্রে ধাপের হাটের অবস্থান (ছবি-সংগৃহীত) 
ফেসবুকে পরিতোষ দাস নামের মাঝিপাড়ার এক কিশোরের বিরুদ্ধে কাবা শরিফ অবমাননার অভিযোগ এনে গত ১৭ অক্টোবর রাতে জেলেদের ওই পাড়াটিতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয় ৩০টি ঘর। হামলাকারীরা ব্যাপক লুটপাটও করেছিল সে রাতে। ঘটনার পরদিনই রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের আগুনে পোড়া ওই গ্রামটিতে গিয়েছিলেন অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ। তিনি বলেন, 'আমরা গ্রামবাসীর কাছ থেকে শুনেছি, আগুন দেওয়ার আগে বাড়িগুলোতে পেট্রোল ছিটানো হয়েছে। তারা কেউ কেউ বাড়ির অদূরে ধানক্ষেতে লুকিয়ে থেকে এ ঘটনা দেখেছেন। দগ্ধ বাড়িঘর দেখে আমাদেরও মনে হয়েছে, কোনো দাহ্যবস্তু ব্যবহার করা না হলে আগুন এমন তীব্রতা পেত না।'
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের রংপুর জেলা উপসহকারী পরিচালক আবদুস সালাম বলেন, 'আমরা প্রাথমিকভাবে দাহ্য পদার্থের সে রকম আলামত পাইনি। যারা তদন্তকাজে আছেন, তারাই ভালো বলতে পারবেন এ নিয়ে।' তবে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) গোলাম রাব্বানী বললেন, 'তদন্ত যেহেতু চলমান, সেহেতু এখনই সব বিষয়ে বলা যাচ্ছে না।'
পরিতোষ কাবা শরিফ অবমাননা করেছে জানিয়ে উজ্জ্বল হাসান পোস্ট দিলেন ১৭ অক্টোবর দুপুরের দিকে। বিকেলের মধ্যেই শত শত লোক জড়ো হতে শুরু করল, এটা খুবই অস্বাভাবিক বলে মনে করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীরাও। পরিতোষের মা ভারতী রানী ও বাবা প্রসন্ন দাস মনে করেন, এ রকম কিছু একটা ঘটাবে বলেই উজ্জ্বল হঠাৎ করে পরিতোষের বাড়িতে আনাগোনা বাড়িয়ে দিয়েছিল। ভারতী রানী বলেন, 'ছইলটার সাথে উজ্জ্বল মোর বেটির বাড়ি বেড়াবার গেছিল কয়েক মাস আগোত। সেই সময় থাকি উজ্জ্বল পরিকল্পনা করছিল মনে হয়। সেই দিনোত দুপুরে (ঘটনার দিন দুপুর) অবশ্যই মোর ছইলের মোবাইল কাড়ি নিয়া ইসলাম ধর্মে দুর্নামের নাটক সাজাইছে। উজ্জ্বল আর আল আলামিন মোর ছইলের মোবাইল কাড়ি নিছিল- এইটা সবায় কয়।'
উজ্জ্বল ও বটেরহাট মসজিদের ইমাম রবিউল ইসলাম পরস্পরের প্রতিবেশী। উজ্জ্বলের মায়ের দাবি, 'উজ্জ্বল সিলাই মেশিনে কাম করে। মানুষোক সিলাইয়ের কাম শিখায়। সিলাই শিখাইতে গেছলো দিনাজপুরোত।' রবিউল 'আল্লাহ আল্লাহ' করতে বেরিয়ে যেত বলে জানিয়েছেন তার স্ত্রী শাপলা বেগম। রবিউলের রহস্যজনক অন্তর্ধান, উজ্জ্বলের সেলাই প্রশিক্ষণের কাজ প্রশ্ন আনে। উজ্জ্বল নিজে সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ধাপেরহাটে। উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় জামায়াতে ইসলামীর আন্ডার কাভার্ড সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, উজ্জ্বল পুরো এলাকাতেই প্রশিক্ষণ দিতে যেতেন। তবে কাদের হয়ে তিনি প্রশিক্ষকের চাকরিটি করতেন, তা তারা বলতে পারছেন না। উজ্জ্বলের সঙ্গে ধাপেরহাটের সম্পর্ক স্পষ্ট। কথা উঠেছে কারমাইকেল কলেজের বিতর্কিত ছাত্রলীগ নেতা সৈকত মণ্ডলের ধাপেরহাট সংযোগ নিয়েও। পরিতোষ, উজ্জ্বল, সৈকত ও রবিউল- এ চারজনই এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের হাতে গ্রেপ্তার রয়েছেন।
মাঝিপাড়ার হামলায় জড়িত সন্দেহে পুলিশ ধাপেরহাট থেকে একজন ছাত্রশিবির নেতাকে আটক করায় সন্দেহ আরও ঘনীভূত হচ্ছে। অনেক দিন থেকে জামায়াত-শিবিরের নাশকতার কারণে ধাপেরহাট বেশ পরিচিত। ২০১৪ সালে ধাপেরহাটে হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছিল তারা। যোগাযোগ ব্যবস্থা আর ভৌগোলিক কারণে ধাপেরহাট বন্দরটি রংপুর বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান।
সাদুল্যাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যক্ষ জাকারিয়া খন্দকার বলেন, 'সুন্দরগঞ্জ, পলাশবাড়ী, মিঠাপুকুর, সাদুল্যাপুর ও পীরগঞ্জ উপজেলার শিবির ক্যাডাররা একত্র হয়ে মাঝিপাড়ায় হামলা ও অগ্নিসংযোগ করেছে।' তিনি জানান, ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগ পর্যন্ত এই এলাকায় মুসলিম লীগের এমএনএ (মেম্বার অব ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লি) ছিলেন। তবে সত্তরের নির্বাচনেও মুসলিম লীগ হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করেছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুসলিম লীগ সমর্থকরাই কনভার্ট হয়ে জামায়াতে ইসলামীতে যুক্ত হন। এখনও এখানে জামায়াতে ইসলামীর শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে।
প্রায় একই ধরনের কথা বললেন সাদুল্যাপুর উপজেলার ধাপেরহাট ইউনিয়নের উত্তরপাড়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সামাদ প্রমাণিক। তিনি বলেন, 'স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তান মুসলিম লীগ আর জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীর ভয়ে এখানকার মানুষ মুক্তিযুদ্ধেও অংশ নিতে পারেনি। যার কারণে ধাপেরহাট ইউনিয়নে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা মাত্র তিনজন। সেই থেকে ধাপেরহাট এলাকায় জামায়াত-শিবির একটু বেশি। সামনে নির্বাচন লক্ষ্য করে ইদানীং জামায়াত-শিবির আরও বেশি প্রভাব দেখানোর চেষ্টা করছে।'
ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের ওপর অবস্থিত ধাপেরহাট বন্দর থেকে মাঝিপাড়ার দূরত্ব পাঁচ কিলোমিটারের মতো। ধাপেরহাট বন্দরের দক্ষিণে পলাশবাড়ী, উত্তরে পীরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর, পূর্বে সাদুল্যাপুর উপজেলা শহর ও গাইবান্ধা সদর এবং পশ্চিমে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ। এখান থেকে যে কোনো সময় দেশের যে কোনো স্থানে যাওয়ার জন্য দূরপাল্লার যানবাহনে উঠতে সমস্যা হয় না। সে জন্য অনেকের কাছেই ধাপেরহাট বন্দর নিরাপদ। কোনো কারণে এখানে মহাসড়কে ব্যারিকেড সৃষ্টি হলে রংপুর বিভাগের আট জেলার সঙ্গে ঢাকার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
ধাপেরহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি জালাল উদ্দিন মণ্ডল হিরু বলেন, 'ধাপেরহাট এলাকা জামায়াত-শিবিরের পুরোনো আস্তানা। তারা এই এলাকাকে তাদের শক্ত আস্তানা মনে করে। কাদের মোল্লার মামলার রায় আর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখানে ব্যাপক নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়েছে জামায়াত-শিবির। সেই সময়ে ধাপেরহাট বন্দরের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ধাপেরহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ কার্যালয়। এরাই মাঝিপাড়াতে হামলা করেছে।'
এই এলাকায় জামায়াত-শিবিরের শক্ত অবস্থানের কারণেই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আশপাশের সব উপজেলায় বিজয়ী হয়েছে জামায়াত-বিএনপির প্রার্থী। তারা প্রায় সবাই সন্ত্রাস ও নাশকতা মামলার আসামি। তাদের মধ্যে পলাশবাড়ী উপজেলায় বিজয়ী হয়েছিলেন জামায়াত দলীয় আবুল কাউসার মো. নজরুল ইসলাম লেবু, সাদুল্যাপুর উপজেলায় সাইদুর রহমান মুন্সি, সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় মাজেদুর রহমান, গাইবান্ধা সদর উপজেলায় আবদুল করিম, রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলায় গোলাম রাব্বানী আর পীরগঞ্জ উপজেলায় বিএনপিদলীয় নুর মোহাম্মদ মণ্ডল। তবে নুর মোহাম্মদ মণ্ডল দল পাল্টিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েছেন।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়ার বড় ভাই আবদুল ওয়াহেদ কানু মিয়াকে পরাজিত করে পীরগঞ্জ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন নুর মোহাম্মদ মণ্ডল। ড. ওয়াজেদ মিয়ার বড় ভাতিজা ছায়দৎ হোসেন বকুলকে হারিয়ে ২০১৪ সালে পীরগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে বিজয়ী হয়েছিলেন নুর মোহাম্মদ মণ্ডল। জাতীয় পার্টি, বিএনপি ঘুরে আসা এই নুর মোহাম্মদ মণ্ডলই এখন পীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য। পীরগঞ্জে এমন নব্য আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ বহু। মাঝিপাড়ায় হামলার অন্যতম প্রধান হোতা সৈকত মণ্ডল তিন প্রজন্মের আওয়ামী লীগ হলেও তাকে ছদ্মবেশী শিবির বলা হচ্ছে। অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, তিনিই ডেকে এনেছেন দূরের হামলাকারীদের।
[প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন সাদুল্যাপুর (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি শাহজাহান সোহেল]