ঢাকা বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

পরিবার নিয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটছে আরামের

পরিবার নিয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটছে আরামের

পরিবার নিয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন আরাম সাখিদার। ছবি: সমকাল

জয়পুরহাট প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৩ | ১৩:৩৫ | আপডেট: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৩ | ১৩:৩৭

ঋণের চাপে মাথা গোঁজার ঠাঁই ছেড়ে বৃদ্ধ মা-বাবাসহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আরাম সাখিদার পাড়ি জমিয়েছিলেন ঢাকা শহরে। সেখানে প্রায় এক বছর ধরে রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। সবকিছুর দাম বেশি তাই আর সেখানে টিকতে পারছেন না। বাধ্য হয়ে গত শুক্রবার (১ নভেম্বর) সবাইকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন। দরজায় গিয়ে দেখতে পান তার বাড়ি দখলে নিয়েছেন প্রতিবেশী এক প্রভাবশালী। বাড়িতে প্রবেশ করতে না পেরে আরেক প্রতিবেশীর বাড়ির উঠানে খোলা আকাশের নিচে তিনদিন ধরে বসবাস করছেন। 

এমন ঘটনা জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার আহম্মেবাদ ইউনিয়নের সুড়াইল গ্রামে ঘটেছে। রোববার রাতে গিয়ে আরামের পরিবারের সকল সদস্যকে প্রতিবেশীর উঠানে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করতে দেখা গেছে। 

আরামের পরিবার ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আরাম বৃদ্ধ মা-বাবা ও স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে দুইশতক জায়গার ওপর বসবাস করেন। এরই মধ্যে আরামের মেয়ে রাবেয়ার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে একই গ্রামের হবিবর রহমানের ছেলে রানার। সম্পর্কের জেরে গত তিন বছর আগে রাবেয়ার সঙ্গে রানার বিয়ে হয়। চলছিল তাদের সংসার। দুই পরিবারের সম্পর্কও ভালো। এরই মধ্যে হবিবর রহমান জমি বিক্রির প্রস্তাব দেন বিয়াই আরামকে। ধারদেনা করে চার শতক জমি কেনেন আরাম। সেখানে মাটির দেয়ালের বাড়ি নির্মাণ করেন। গত দেড় বছর আগে ভেঙে যায় দুই পরিবারের সম্পর্ক। ছাড়াছাড়ি হয় রাবেয়া-রানার মধ্যে। বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনায় আরামসহ পুরো পরিবারের সদস্যদের মারপিট করেন হবিবর ও তার ছেলে। গ্রাম্য শালিসে ১০ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হয় হবিবরকে। 

ঋণের চাপে অস্থির আরাম বাধ্য হয়ে এক বছর আগে বাড়িতে তালা দিয়ে পরিবার নিয়ে পাড়ি জমান ঢাকায়। সেখান থেকে গত শুক্রবার এসে দেখেন হবিবর ও তার ছেলে মিলে ওই বাড়ির তালা ভেঙে নিজেদের দখলে নিয়েছেন। তাদেরকে আর বাড়িতে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। বাধ্য হয়ে তারা প্রতিবেশীর বাড়িতে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন। বর্তমানে তারা সেখানেই রয়েছেন। 

প্রতিবেশী নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘এদের বাড়ি ছাড়া আর কিছুই নেই। এরা ছিন্নমূল। হবিবর ও তার ছেলে কুখ্যাত। এলাকায় তাদের ভয়ে কেউ কথা বলতে পারে না। তিনদিন ধরে আরাম তার বৃদ্ধ বাবা-মাসহ সবাইকে নিয়ে এ অবস্থায় আছে। বাড়িতে ঢুকতে পারছে না। পুলিশ আসছিল। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।’ 

স্থানীয় আহম্মেদাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলী আকবর বলেন, ‘এ বিষয়ে শুনেছি। হবিবর যেটা করেছে তা অন্যায়। একজনের বাড়ী আরেকজন জোরপূর্বক দখল করতে পারে না।’ 

আরাম বলেন, ‘একদিকে ওদের অত্যাচার অন্যদিকে ঋণের চাপ। বাধ্য হয়ে সবাইকে নিয়ে বাড়ি ছাড়া হয়েছিলাম। এক বছর পর এসে দেখি বাড়িটা দখল করেছে।’ কী কারণে বাড়ি দখল করেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমারও জানা নেই, তাই থানায় অভিযোগ করেছি। দেখা যাক কী ঘটে।’

আরামের স্ত্রী সেলিনা বেগম বলেন, ‘আমার মেয়েকে বিয়ে করে ছেড়ে দিয়েছে। অত্যাচার তো করেই যাচ্ছে, এখন আবার বাড়ি দখল করেছে। আমরা গরিব তাই সবাই অত্যাচার করে। তা সহ্য করেই আছি। তাই বলে কি জোরপূর্বক একজনের বাড়ি আরেকজন দখল করে নিবে? দেশে আইন বলতে কিছুই নেই?’  

অভিযুক্ত হবিবর রহমান বলেন, ‘এক সময় আরাম আমার বিয়াই ছিল, এখন নেই। আমার জায়গায় ওর নিকট বিক্রি করেছি তবে বাড়ি যে পাশে করেছে দলিলে সেই পাশ উল্লেখ করা নেই। তাই বাড়ি আমি দখলে নিয়েছি। ওর জায়গা ফাঁকা পড়ে আছে।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘এখন আরাম অনেক উল্টাপাল্টা কথা বলতেই পারে, তবে সব মিথ্যা।’

কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওয়াসিম আল বারী বলেন, ‘বাড়ি দখলের বিষয়ে একটি অভিযোগ পেয়েছি। ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ 

আরও পড়ুন

×