৩ নভেম্বর এলেই কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বীরদামপাড়া নামের নিঝুম পল্লিটি স্বজন হারানোর হাহাকারে আরও বেশি বিষণ্ণ হয়ে ওঠে। এ গ্রামের সৈয়দবাড়িতে ১৯২৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জন্ম নিয়েছিলেন এক অমৃতের সন্তান। গোলাপের সুঘ্রাণ বয়ে গিয়েছিল আকাশজুড়ে- তাই বাবা-মা তার নাম রেখেছিলেন গোলাপ। কালক্রমে তিনিই সারাদেশে পরিচিত হয়ে ওঠেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম নামে।
সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ৩ নভেম্বর জেলখানার অভ্যন্তরে দেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ জাতীয় চার নেতার কলঙ্কিত হত্যাকাণ্ড জাতীয় রাজনীতিতে সৃষ্টি করে বিরাট শূন্যতা। রাজনৈতিক সততা ও শিষ্টাচারও হয় প্রশ্নবিদ্ধ।
সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছেলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ শাফায়েতুল ইসলাম সে সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষমতাসীন খুনি মোশতাক চক্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ না করায় তাকে কারাজীবন বেছে নিতে হয়। আরও তিন সতীর্থের সঙ্গে ৩ নভেম্বর জীবন দিতে হয় কারাগারের ভেতর। তিনি জানান, ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর তাদের বাসায় ফোন করেছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। কে কল করেছেন বুঝতে না পেরে সৈয়দ নজরুল ফোনটি রিসিভ করেছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর 'বেইমান' বলে হুংকার দিয়ে প্রচণ্ড রাগে কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়ে পড়েন এবং টেলিফোন সেটটি সজোরে আছড়ে ফেলেন। এরপরও একাধিকবার ফোন করেছিলেন খন্দকার মোশতাক। কিন্তু তার সঙ্গে আর কথা বলেননি সৈয়দ নজরুল। সৈয়দা নাফিসা ইসলামকে ফোনে তখন মোশতাক বলেছিলেন, আশরাফের বাপের তো ভয়াবহ পরিণতি হবে।
খন্দকার মোশতাকের ডাক উপেক্ষা করায় ২৩ আগস্ট গ্রেপ্তার হন সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ জাতীয় চার নেতা। জেলখানায়ও অনেক প্রলোভন দেখানো হয় তাদের। আটকের দুই মাস ১১ দিন পর ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন তারা।
দুঃসহ সেই সময়ের কথা জানাতে গিয়ে সৈয়দ শাফায়েতুল ইসলাম জানান, সৈয়দ নজরুলসহ জাতীয় চার নেতাকে গ্রেপ্তারের পর সৈয়দা নাফিসা ইসলাম সরকারি বাসভবন ছেড়ে গোপীবাগে একটি বাসা ভাড়া নেন। সেই বাসায় মায়ের আঁচল ঘিরে থাকতেন অবুঝ তিন ভাই-বোন সৈয়দ শরীফুল ইসলাম, সৈয়দা জাকিয়া নূর লিপি ও সৈয়দা রাফিয়া নূর রূপা। সৈয়দা নাফিসা ইসলাম প্রতিদিন রান্না করে সৈয়দ নজরুলের জন্য কেন্দ্রীয় কারাগারে খাবার পাঠাতেন। এরই মাঝে ৩ নভেম্বর ঘটে মর্মন্তুদ জেলহত্যার ঘটনা। তখন সৈয়দ নজরুল ইসলামের চার ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে বড় ছেলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও ছোট ছেলে সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম দেশের বাইরে এবং সৈয়দ শাফায়েতুল ইসলাম বিএমএর ট্রেনিংয়ে চট্টগ্রামে ছিলেন। অবুঝ ছেলে সৈয়দ শরীফুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে সৈয়দা নাফিসা ইসলাম কারাগারে যান সৈয়দ নজরুল ইসলামের লাশ আনতে। কিন্তু সৈয়দ শরীফুল ইসলাম 'প্রাপ্তবয়স্ক নয়'- এই অজুহাতে তাকে লাশ শনাক্ত করতে দেয়নি কারা কর্তৃপক্ষ। পরে সৈয়দা নাফিসা ইসলামের ভাই আসাদুজ্জামান গিয়ে লাশ শনাক্ত করেন। আসাদুজ্জামানের বাসায় লাশ আনার পর আরমানিটোলা মাঠে জানাজা হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দাফন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও জানাজার পরপরই একটি পিকআপে করে একদল সেনাসদস্য এসে জোর করে লাশ নিয়ে গিয়ে বনানী কবরস্থানে দাফন করে।
সৈয়দ নজরুল ইসলামের মেয়ে বর্তমানে কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দা জাকিয়া নূর লিপি বলেন, বাবার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর মা আমাদের নিয়ে পাথরচাপা কষ্টে শোক সামলেছেন। সে সময় আমাদের সমবেদনা জানানোর মতো কেউ ছিল না। মায়ের নিরন্তর সংগ্রামের কারণেই আজ পরিবারের সব সদস্য বর্তমানে এ পর্যায়ে আসতে পেরেছে।

বিষয় : স্বজন হারানোর হাহাকার

মন্তব্য করুন