দ্রুতগতিতে চলছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনের কাজ। ২০২৩ সালের জুনের মধ্যেই শেষ হতে পারে সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক এই মেগা প্রকল্পের কাজ। কিন্তু পরিকল্পনাহীনতার কারণে এ মেগা প্রকল্পের পুরোপুরি সুবিধা পাওয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। কারণ এ রেলপথের জন্য অপরিহার্য হওয়ায় কর্ণফুলী নদীর মেয়াদোত্তীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কালুরঘাট সেতুটি নতুন করে নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এখনও শুরুই হয়নি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাঠ পর্যায়ের কাজ শুরু দূরে থাক, এখনও সেতুটির ফিজিবিলিটি স্টাডিই করতে পারেনি রেলওয়ে। এমনকি নিশ্চিত করা যায়নি অর্থের উৎসও। রেললাইন প্রকল্পের সঙ্গে সংগতি রেখে এই সেতু নির্মাণের কাজ এগিয়ে না নেওয়ায় এখন বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে।

প্রশ্ন উঠেছে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন স্থাপন শেষে যে লোডের ট্রেন চালানো হবে, সেতুটি তা নিতে পারবে কিনা কিংবা আদৌ ট্রেন চালানো যাবে কিনা। এ অবস্থায় বর্তমান সেতু দিয়ে ট্রেন চালানোর উপায় বের করতে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞদের দ্বারস্থ হয়েছে রেলওয়ে।

রেলের ডাকে সাড়া দিয়ে গত ৯ অক্টোবর সরেজমিন কালুঘাট সেতু পরিদর্শন করেছে বুয়েটের তিন সদস্যের বিশেষজ্ঞ টিম। এই টিমে ছিলেন বুয়েটের তিন অধ্যাপক ড. এএফএম সাইফুল আমিন, ড. আবদুল জব্বার খান ও ড. খান মাহমুদ আমানত। বুয়েট প্রতিনিধি দলের সঙ্গে রেলওয়ের পক্ষে ছিলেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সেতু) আহসান জাবির। রেলওয়ে বলছে, বুয়েটের বিশেষজ্ঞ টিমের পরামর্শ অনুযায়ী কালুরঘাট সেতু মেরামত করে ট্রেন চালানোর উপযোগী করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রেলওয়ের একটি সূত্র জানায়, কালুরঘাটে নতুন সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হতে আরও অনেক সময় লেগে যেতে পারে। মূলত অর্থের উৎস নিশ্চিত না হওয়ায় সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। দক্ষিণ কোরিয়া এই প্রকল্পে ঋণ সহায়তা দেওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে। কিন্তু বিষয়টি এখনও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে।

১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকায় চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নতুন এ রেললাইন স্থাপন করা হচ্ছে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। গত অক্টোবর পর্যন্ত এই প্রকল্পের ৬৪ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বর্ষা মৌসুমের জন্য প্রকল্পের কাজ কিছুটা ধীরগতিতে চললেও কয়েক দিন ধরে তাতে গতি এসেছে। ২০২২ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। তবে ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতা ও করোনা মহামারির কারণে প্রকল্পের কাজ ব্যাহত হয়। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পরপরই ট্রেন চালু করতে ইতোমধ্যে ইঞ্জিন ও কোচ (বগি) সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রামের দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মফিজুর রহমান সমকালকে বলেন, 'ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতাজনিত দেরি, করোনা মহামারির প্রাদুর্ভাব ও সব শেষে বর্ষার কারণে প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করা যাচ্ছে না। এ জন্য ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে। তবে এর আগেই প্রকল্পের কাজ শেষ করতে আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। ছয় কিলোমিটার রেললাইন (ট্র্যাক) স্থাপনের ফলে রেললাইন এখন দৃশ্যমান। ৯টি স্টেশনের মধ্যে সাতটির কাজ শেষ পর্যায়ে। প্রকল্পের আওতায় অনেক কালভার্ট নির্মাণের কাজও শেষ পর্যায়ে। অক্টোবর পর্যন্ত এই প্রকল্পে ৬৪ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।'

এদিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পের কাজ অর্ধেকেরও বেশি শেষ হয়ে গেলেও কর্ণফুলী নদীতে নতুন সেতু নির্মাণ এখনও অনেক দূর। তবে মাস খানেকের মধ্যে নতুন সেতু নির্মাণে নতুন করে ফিজিবিলিটি স্টাডির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরপর নকশা প্রণয়নসহ আনুষঙ্গিক কাজ শুরু করা হবে।

রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, কালুরঘাটে বর্তমানে যে সেতু রয়েছে সেটি দিয়ে ১১ দশমিক ৯৬ টন এক্সেল লোডবিশিষ্ট ছোট লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) কিংবা হালকা ওজনের কোচ চলাচল করে থাকে। কক্সবাজার রেললাইনের কাজ শেষ হলে সেতুটিতে প্রতিটি এক্সেল লোডে ১৫-১৬ টন ওজনের ইঞ্জিন ব্যবহার করতে চায় রেলওয়ে। বর্তমানে তিন থেকে চারটি বগি নিয়ে এ লাইনে ট্রেন চলাচল করে। নতুন রেললাইনে ১৫ থেকে ২০টি বগি সংযুক্ত করে ট্রেন চালানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব কারণেই বুয়েট বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সেতু) আহসান জাবির বলেন, 'কর্ণফুলী নদীতে নতুন সেতু নির্মাণের কাজ বিলম্বিত হওয়ায় বর্তমানে থাকা কালুরঘাট সেতু দিয়ে ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পুরোনো সেতু দিয়ে ভারী এক্সেলের ট্রেন চালানো যাবে কিনা কিংবা ভারী ট্রেন চালাতে সেতুতে কী ধরনের কাজ করতে হবে, তা জানতে বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে বুয়েটের তিনজন বিশেষজ্ঞ সেতুটি দেখে গেছেন। তাদের দেওয়া পরামর্শ অনুযায়ী সেতুকে ভারী ট্রেন চালানোর উপযোগী করা হবে।'

কর্ণফুলী নদীর কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণের পথে মূল বাধা অর্থ। তবে এর আগে আরও কিছু বিষয় নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় সেতু নির্মাণের প্রক্রিয়া আশানুরূপ এগোয়নি। যেমন, সেতুটি কি রেল কাম সড়ক সেতু হবে, নাকি কেবলই রেলসেতু হবে- এ নিয়ে বিতর্কে চলে যায় অনেক সময়। আবার এই সেতু সড়কপথ ও সেতু মন্ত্রণালয় করবে, নাকি রেলপথ মন্ত্রণালয় করবে, তা নিয়েও দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চলে রশি টানাটানি। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত সেতুটি রেল কাম সড়ক সেতু হচ্ছে এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ই এটি নির্মাণ করবে।

এসব জটিলতা নিরসন হওয়ার পর দেখা দেয় নতুন সমস্যা। সেতু নির্মাণের নকশা অনুযায়ী, এটির উচ্চতা নির্ধারণ করা হয় ৭ দশমিক ২ মিটার। কিন্তু এতে আপত্তি জানায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন অধিদপ্তর (বিআইডব্লিউটিএ)। কারণ এই অধিদপ্তরের একটি গেজেট অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগর মোহনা থেকে কর্ণফুলী নদীর শাহ আমানত সেতু পর্যন্ত অংশটি প্রথম শ্রেণিভুক্ত। প্রথম শ্রেণিভুক্ত নদীতে সেতু নির্মাণ করতে হলে উচ্চতা রাখতে হয় ১২ দশমিক ২ মিটার। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী ১২ দশমিক ২ মিটার উচ্চতায় সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কোরিয়ান ইউশিন নামে এক প্রতিষ্ঠান নতুন করে সেতুর এই নকশা প্রণয়নের কাজ করছে। নতুন নকশার কারণে এ সেতু নির্মাণে এখন কমবেশি চার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে বলে জানিয়েছেন কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণ প্রক্রিয়ায় জড়িত রেলের কর্মকর্তারা।

বোয়ালখালী-কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক আবদুল মোমিন বলেন, 'কালুরঘাট রেল কাম সড়ক সেতুটি এক লেনের। সেতু পারাপারে মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনে ট্রেন চলাচল শুরু হলে সেতু পারাপারে সড়কপথের যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। আমরা চাই, নতুন করে আর কোনো অজুহাত না দেখিয়ে সেতু নির্মাণের কাজ যেন দ্রুত শুরু করা হয়।'

চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর ওপর কালুরঘাট রেল কাম সড়ক সেতুটি নির্মাণ করা হয় ১৯৩০ সালে। উত্তর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামকে সংযুক্ত করা এই সেতুটিকে ২০০১ সালেই ঝুঁঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে রেলওয়ে। বিকল্প পথ না থাকায় সংস্কার-মেরামত করে এই সেতু দিয়ে ট্রেন ছাড়াও সব ধরনের যানবাহন চলাচল করছে। এখন এই সেতু ব্যবহার করে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে ভারী ট্রেন চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।