সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার দুর্গম গ্রাম বেংনাই। জেলা শহর থেকে আঁকাবাঁকা মেঠোপথে যেতে লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। শান্ত সুনিবিড় গ্রামজুড়ে সোনালি ধানের ঝিলিক। বেংনাইয়ের এক পাশে খাল; বসতবাড়ির আশপাশেও রয়েছে প্রচুর ডোবা, বিল আর পুকুর। জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় এসব জলাশয় যেমন অনন্য ভূমিকা রাখছে, তেমনি হয়ে উঠেছে বেংনাইয়ে অনেক অস্বাভাবিক শিশুমৃত্যুর কারণ।
সাঁতার না জানা কত শিশু যে এসব জলাশয়ে পড়ে মারা গেছে, তার সঠিক সংখ্যা জানা মুশকিল। বেংনাইসহ রায়গঞ্জের বিভিন্ন গ্রামের মানুষের মুখে মুখে ফেরে এরকম সন্তান হারানোর গল্প। কিন্তু এই শিশুদের পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে এসেছে 'আঁচল'। রায়গঞ্জের বিভিন্ন গ্রামে গড়ে ওঠা এই দিবাযত্ন কেন্দ্রটি ৯ থেকে ৩৬ মাস বয়সী শিশুদের লালনপালন করছে, সাঁতার শেখাচ্ছে। আঁচলের তলে নিরাপদেই বিকশিত হচ্ছে রায়গঞ্জের শিশুরা। তত্ত্বাবধানকারী ও সাঁতারের প্রশিক্ষক নারীদের ওরা ডাকে 'আঁচল মা' বলে।
বেংনাইয়ের নিলুফার খাতুন বছর তিনেক আগে হারিয়েছিলেন তার ১৬ মাস বয়সী ছেলে জোনায়েদকে। সেই দুঃসহ স্মৃতি এখনও ভুলতে পারেন না তিনি। জ্যৈষ্ঠ মাসের এক বিকেলে কৃষক পরিবারের এই কিষানি ব্যস্ত ছিলেন ধান তোলার কাজে। জোনায়েদ তখন বাড়ির বাইরে খেলছিল ওর চেয়ে একটু বড় এক শিশুর সঙ্গে। কাজ সেরে সেখানে তাকে না পেয়ে বাড়ির আশপাশে হন্যে হয়ে অনুসন্ধান করতে থাকেন নিলুফার তার বুকের মানিককে। অবশেষে খুঁজে পান বাড়ির পাশের ছোট ডোবায়।
ছলছল চোখে নিলুফার বললেন, একটু ভুলের কারণে ছেলেটা হারিয়ে গেল! এভাবে আর কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয়। সবাই যেন সচেতন থাকেন।
বেংনাইসহ রায়গঞ্জের বিভিন্ন গ্রামে এখন এমন শিশুমৃত্যু রোধে নজির স্থাপন করেছে বেসরকারি সংগঠন সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ (সিআইপিআরবি)। প্রতিষ্ঠানটি রায়গঞ্জে ২০০৫ সাল থেকে শিশুমৃত্যু রোধে কাজ করছে।
বেংনাই গ্রামে মৃত শিশু জোনায়েদের বাড়ির পাশেই রয়েছে সিআইপিআরবির 'আঁচল দিবাযত্ন কেন্দ্র'। জোনায়েদও সেই কেন্দ্রে যেত। তবে দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু ঘটে দিবাযত্ন কেন্দ্রের নির্ধারিত সময়ের পর।
সিআইপিআরবি রায়গঞ্জের বেড়াবাজুয়া গ্রামেও 'আঁচল দিবাযত্ন কেন্দ্র' রয়েছে। সরেজমিন দেখা গেল, এই কেন্দ্রের একটি ঘরে একদল শিশু আনন্দে সময় পার করছে। ছড়া, গান, কবিতা আর গল্পে-গল্পে কাটছে তাদের শৈশব। সেই ঘরের দেয়ালে কচি হাতের রকমারি আঁকিবুঁকি। শিশুদের গল্প, কবিতা আর গানে-গানে সাঁতারের প্রয়োজনীয়তা শেখাচ্ছেন প্রশিক্ষিত 'আঁচল মা' নমিতা রানী মালাকার।
এই 'আঁচল মা' সমকালকে জানালেন, সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ৯ থেকে ৩৬ মাস বয়সী শিশুদের আঁচলে রাখার ব্যবস্থা আছে। কারণ এই সময়ে পরিবারের অন্যরা সংসারের নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন বলে শিশুদের অপমৃত্যুর হার বেশি। তিনি বলেন, কেন্দ্রে প্রাক-প্রাথমিকের নানা শিক্ষা দেওয়া হয়। ছন্দে ছন্দে শেখানো হয় সবকিছু। শুধু পাঠ্যপুস্তকের পাঠ নয়, নীতি-আদর্শের নানা গল্প, পানিতে ডুবে গেলে করণীয় সম্পর্কে ছড়া, এর সঙ্গে অঙ্গভঙ্গি- এসব নিয়ে আনন্দময় করে তোলা হয় সময়টুকু। আগে প্রতি বছর গ্রামের অনেক শিশুই ডুবে মারা যেত; এখন এর সংখ্যা অনেক কমেছে। এ কেন্দ্রে ছয় বছরের বেশি বয়সী শিশুদের সাঁতারও শেখানো হয়। সিআইপিআরবির উপকর্মসূচি ব্যবস্থাপক যোবায়ের আলম বলেন, ছয় থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুরা যদি ২৫ মিটার সাঁতার পারে, ৩০ সেকেন্ড পানিতে ভেসে থাকতে পারে এবং ভুক্তভোগীকে পানিতে না নেমে যদি উদ্ধার করতে পারে তাহলে তাকে সুইম সেভ গ্র্যাজুয়েট হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
২০১৬ সালের বাংলাদেশ হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে অনুযায়ী, দেশে এক থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুমৃত্যুর (আঘাতজনিত) ৩৭ শতাংশই হয় পানিতে ডুবে। সে হিসাবে বছরে সাড়ে ১৪ হাজার শিশু ডুবে মারা যায়। এর মধ্যে ৭১ শতাংশই দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশু। ২৮ শতাংশ শিশুর বয়স পাঁচ থেকে ৯ বছর। শিশুমৃত্যু রোধ, পুষ্টি ইত্যাদি খাতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বড় বিনিয়োগ থাকলেও পানিতে ডুবে মৃত্যু রোধে তৎপরতা কম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এই মৃত্যু প্রতিরোধে ১০টি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে। এর তিনটিই বাংলাদেশে সিআইপিআরবির সাফল্যের অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া। এগুলো হলো শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র, সাঁতার শেখানো ও প্রাথমিক চিকিৎসা।
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ ছাড়াও নরসিংদীর মনোহরদী, শেরপুর সদর, চাঁদপুর সদর, মতলব উত্তর, মতলব দক্ষিণ, কুমিল্লার দাউদকান্দি, পটুয়াখালীর কলাপাড়া এবং বরগুনার বেতাগী ও তালতলী উপজেলায় সিআইপিআরবির দিবাযত্ন কেন্দ্র রয়েছে। সারাদেশের ১০ উপজেলার তিন হাজার ২০০টি কেন্দ্রে প্রায় ৮০ হাজার শিশুকে রাখা হয়।
গবেষণার বরাত দিয়ে সিআইপিআরবির উপনির্বাহী পরিচালক আমিনুর রহমান বলেন, যেসব এলাকায় আঁচল আছে, সেখানে ডুবে যাওয়ার ঘটনা ৮৬ শতাংশ কমে গেছে।
রায়গঞ্জের বেড়াবাজুয়া গ্রামের বাসিন্দা আজিজুর রহমান বলেন, 'আঁচল' কেন্দ্রে বাচ্চাদের রেখে নিশ্চিন্তে অন্য কাজকর্ম করতে পারছেন অভিভাবকরা। সারাদেশে এমন কেন্দ্র থাকলে শিশুমৃত্যু কমে আসবে।
এ নিয়ে এতদিন সরকারের তেমন উদ্যোগ না থাকলেও সম্প্রতি নীতিনির্ধারণী স্তরে আলোচনা হচ্ছে। ডুবে শিশুমৃত্যু রোধে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ৩০৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকার একটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। 'সমাজভিত্তিক সমন্বিত শিশুযত্ন কেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুদের প্রারম্ভিক বিকাশ ও সুরক্ষা এবং শিশুর সাঁতার-সুবিধা প্রদান' প্রকল্পের ৮০ ভাগ অর্থই দেবে বাংলাদেশ সরকার। বাকি অর্থ আসবে ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রোপিজ ও রয়্যাল ন্যাশনাল লাইফবোট ইনস্টিটিউট (আরএনএলআই) নামের দুটি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে। এ প্রকল্পে এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুর সুরক্ষায় দিবাযত্ন কেন্দ্র, ওই বয়সী দুই লাখ শিশুর জন্য সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা, ছয় থেকে ১০ বছর বয়সী তিন লাখ ৬০ হাজার শিশুকে সাঁতার শেখানো, দুই লাখ অভিভাবককে শিশুর লালন-পালনে সক্ষমতা বাড়ানো ও সচেতনতা তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।