কুমিল্লায় গুলিতে শরীর ঝাঁজরা করে ১৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সৈয়দ মো. সোহেল ও তার সহযোগী হত্যার ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেননি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। জনপ্রিয় এই কাউন্সিলরের মৃত্যুর চব্বিশ ঘণ্টা পরও চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় এখনও মামলা হয়নি। তবে জড়িতদের শনাক্ত করতে পুলিশ-র‌্যাবসহ একাধিক সংস্থা নানামুখী তৎপরতা শুরু করেছে। এখন পর্যন্ত চার কারণ সামনে রেখে ছায়াতদন্তও শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এলাকায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে ঘটেছে এ ঘটনা। এর বাইরে আসন্ন কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচন ঘিরে আগাম কোনো চক্রান্ত রয়েছে কিনা, তাও বিবেচনায় নিয়েছেন তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা। দু'বারের কুসিক কাউন্সিলর সোহেল আসন্ন সিটি নির্বাচনেও প্রার্থী হতে যাচ্ছেন- এলাকায় এমন প্রচারণাও ছিল। এ কারণে তিনি টার্গেট কিলিংয়ের শিকার কিনা, তা নিয়েও চলছে তদন্ত। তবে এখন পর্যন্ত প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে খুনসহ একাধিক মামলার আসামি শাহ আলমকে। ঘটনার পর থেকে তিনি লাপাত্তা। একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য- শাহ আলম কিলিং মিশনে নেতৃত্ব দেয়। গুলির পর লাথি মেরে 'মিশন কমপ্লিট' বলে পালায় খুনিরা।
তদন্ত-সংশ্নিষ্ট একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সমকালকে জানান, স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধের জেরে গত কয়েক মাসে কুমিল্লায় বেশ কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ জোড়া খুনের নেপথ্যে ওই গ্রুপিংকেন্দ্রিক রাজনীতির কোনো হিসাব রয়েছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নগরীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে দুটি স্পষ্ট বিভাজন রয়েছে। দুই এমপিকে ঘিরে আছে দুটি স্বতন্ত্র বলয়।
গতকাল রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সমকালকে বলেন, কুমিল্লার ঘটনায় জড়িতদের খুব অল্প সময়ের মধ্যে ধরে ফেলবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে কেন, কী কারণ এই খুন- এটা এখনই বলা সম্ভব নয়। দু-চারজন ধরা পড়লে এটা স্পষ্ট হবে।
র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) কর্নেল কে এম আজাদ সমকালকে বলেন, হত্যার পেছনে কী কারণ হতে পারে এমন কয়েকটি বিষয় নিয়ে আমরা কাজ করছি। আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক বিরোধের বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখছি আমরা। কোথা থেকে কারা অস্ত্র দিল- এসব বের করা হবে।
গত সোমবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে নগরীর পাথরিয়াপাড়ায় কাউন্সিলরের কার্যালয়ে মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি করে। এতে সোহেল ও তার সহযোগী হরিপদ সাহা নিহত হন। সোহেলের মাথা, বুক, পেটসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ১০টি গুলি লাগে। এ ঘটনায় আরও অন্তত আটজন গুলিবিদ্ধ হন।
তদন্ত-সংশ্নিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, যে কোনো ঘটনার পরপরই কুমিল্লা থেকে পালানো খুব সহজ। সীমান্ত এলাকা হওয়ায় খুনিরা প্রথমেই দেশ ছাড়ার চেষ্টা করে। সোহেলের ঘটনায় জড়িতরা দেশ ছাড়ার জন্য মরিয়া হতে পারে। এমন আশঙ্কার জায়গা থেকে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি ও সতর্কতা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্য এক কর্মকর্তা জানান, কুমিল্লার ঘটনায় যে ধরনের অস্ত্র ও গুলি ব্যবহার করা হয়, এটাও উদ্বেগের। জোড়া খুনের ঘটনায় পিস্তল, শটগান, এলজি, পাইপগান ব্যবহার করা হয়। কিলিং মিশনে জড়িত সাত-আটজনের কাছে অস্ত্র ছিল। এ ছাড়া সেখানে হাতবোমাও ছিল। মূল কিলিং মিশনের সদস্যদের বাইরে আরেকটি ছিল ব্যাকআপ পার্টি। তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা এও বলছেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে অনেকের হাতেই আগে থেকে অস্ত্র ও গুলির মজুদ ছিল। সোহেল ও তার সহযোগীকে হত্যার ঘটনায় ওই অস্ত্র ব্যবহার করা হয়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কাউন্সিলর সোহেলের ব্যক্তিগত সহকারী বাদল জানান, কালো পোশাক পরিহিত দুর্বৃত্তদের এ গ্রুপটি স্থানীয় মাদক কারবারি ও একাধিক মামলার আসামি শাহ আলমের নেতৃত্বে অতর্কিতে কাউন্সিলরের কার্যালয়ে ঢুকে পড়ে। ওই শাহ আলমই প্রথমে কাউন্সিলরের বুকে ও মাথায় গুলি চালায়। এ সময় কাউন্সিলর বাঁচতে নিচে বসে চেয়ারটি মাথায় রাখার সময় আরও গুলি চালানো হয়। একপর্যায়ে কাউন্সিলর অচেতন হয়ে লুটিয়ে পড়লে তার খুনিরা লাথি মেরে মৃত্যু নিশ্চিত করে। এরপর 'মিশন কমপ্লিট' বলে পালিয়ে যায়। এ সময় সন্ত্রাসীরা ওই কার্যালয়ে অবস্থানরত অন্যদের ওপরও এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। তিনি আরও বলেন, কিছুদিন আগে শাহ আলমের সহযোগী ছাব্বির এলাকায় ডাকাতি করতে গেলে জনতা বাধা দেয়। এ সময় শাহ আলম গুলি চালিয়ে ছাব্বিরকে ছাড়িয়ে নেয়। এ ঘটনা পুলিশকে অবহিত করেছিলেন কাউন্সিলর সোহেল। এ নিয়ে শাহ আলম ও তার লোকজন কাউন্সিলরের প্রতি ক্ষিপ্ত ছিল। এর জের ধরে এ ঘটনা ঘটেছে বলেও বাদল দাবি করেছেন।
মুখোশ পরিহিত থাকলে কীভাবে শাহ আলমকে চিনলেন- এমন প্রশ্নে সোহেলের ব্যক্তিগত সহকারী বলেন, এত দিন রাজনীতি করি, মুখ ঢাকা থাকলেও অনেককে স্পষ্ট চেনা যায়। শাহ আলম সেখানে কথাও বলছিল। তার কণ্ঠ শুনেও চিনে ফেলেছি।
কাউন্সিলরের অফিসের সামনের বাড়ির বাসিন্দা ফারুক মিয়া সমকালকে বলেন, মুখোশ পরিহিত কয়েকজন অস্ত্রসহ জগন্নাথ দেবের মন্দির বরাবর রাস্তার ওপর মহড়া দিচ্ছিল। ঘটনার সময় স্থানীয়রা এগিয়ে গেলে গুলি ও ককটেল ছোড়ে তারা।
একই এলাকার বাসিন্দা রমিজ উদ্দিন, রোমা বেগমসহ আরও কয়েকজন বলেন, ঘটনার পর পুলিশের সহায়তা চাওয়া হলেও পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা পর।
মঙ্গলবার সকাল ১১টার দিকে লাশ আসার খবরে এলাকার প্রতিটি রাস্তায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন দেখে তারা ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, এখন এলাকায় পুলিশ কেন? ঘটনার সময় পুলিশকে বারবার কল দেওয়া হলেও তারা এগিয়ে আসেনি। বাদ জোহর জানাজা শেষে স্থানীয় একটি কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে কাউন্সিলর সোহেলকে সমাহিত করা হয়েছে। এ ছাড়া হরিপদ সাহার শেষকৃত্য টিক্কাচর শ্মশানে সম্পন্ন হয়।
এদিকে, প্রকাশ্যে জোড়া হত্যাকাণ্ডের পর নগরজুড়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। ঘটনাস্থল ও এর আশপাশের এলাকায় সোমবার রাত থেকে হামলা ও ভাঙচুর আতঙ্কে অনেকেই বাড়িছাড়া। নগরজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি। কাউন্সিলর সোহেলের কর্মী-সমর্থকরা সোমবার রাতে নগরীর সুজানগরে ১৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমির হোসেনের ব্যক্তিগত কার্যালয় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এ ছাড়া রাতে দফায় দফায় সুজানগর, বউবাজার, নবগ্রাম এলাকার দোকানপাট ও বিভিন্ন বাড়িঘরে ব্যাপক হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
এদিকে, কাউন্সিলরের অফিসের সামনে স্থাপন করা তিনটি ও পাশের একটি ভবনের দুটি সিসিটিভি ফুটেজ থেকে দুর্বৃত্তদের আগমন ও প্রস্থানের ফুটেজ পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিকেলে ওই স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে অস্ত্র, বুলেট ও কিছু হাতবোমা। হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে মাদক ব্যবসায়ী শাহ আলমসহ তার কয়েক সহযোগীকে আটক করতে পুলিশ ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা মাঠে অভিযান চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মো. আনওয়ারুল আজিম বলেন, কাউন্সিলর সোহেলকে যেখানে হত্যা করা হয়, তার ঠিক আধা কিলোমিটার দূরে সুজানগর এলাকার সীমানাপ্রাচীর ঘেরা একটি স্থান থেকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে দুটি এলজি, একটি পাইপগান, ১৫-২০টি অবিস্ম্ফোরিত বোমাসদৃশ বস্তু, তিনটি কালো ব্যাগ, দুটি কালো জামা ও ১২ রাউন্ড তাজা বুলেট উদ্ধার করে পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে, কাউন্সিলর সোহেল হত্যাকাে এগুলো ব্যবহার করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কাউন্সিলর সোহেল ছিলেন সদর আসনের এমপি হাজি আ ক ম বাহাউদ্দিনের অনুসারী। তিনি ১৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং দু'বারের নির্বাচিত কাউন্সিলর। এ ছাড়া সোহেল সাবেক প্যানেল মেয়রও। এলাকায় তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী। স্থানীয়রা জানান, নবগ্রাম এলাকার বাসিন্দা শাহ আলম নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে কাউন্সিলর সোহেলের বিরোধ চলছিল। শাহ আলম পেশায় মাদক ব্যবসায়ী। সোহেল কাউন্সিলর হওয়ার পর থেকে শাহ আলমের মাদক ব্যবসায় বাধা হয়ে দাঁড়ান। এ ছাড়া শাহ আলম গ্রুপের সঙ্গে কাউন্সিলর সোহেলের এলাকায় আধিপত্যসহ বিভিন্ন কারণে বিরোধও চলছিল। স্থানীয়রা এ-ও বলছেন, সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়ও বদল হয় শাহ আলমের। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্থানীয় একাধিক আওয়ামী লীগ নেতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে সে এলাকায় মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধে লিপ্ত। অস্ত্র, মাদক ও পুলিশের ওপর আক্রমণসহ ১০টি মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে।



বিষয় : কুমিল্লায় কাউন্সিলরসহ ২ খুন

মন্তব্য করুন