জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল বসানো নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ উঠেছে রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য, কাটাখালী পৌর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ও পৌরসভার মেয়র আব্বাস আলীর বিরুদ্ধে। সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া একটি অডিওতে তার কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটুবাক্য শোনা যায়। এক মিনিট ৫১ সেকেন্ডের অডিও রেকর্ডটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীরা তাকে বহিস্কারসহ কঠোর শাস্তির দাবি তুলেছেন।
আব্বাস আলী কাটাখালী পৌরসভায় পরপর দুবার নৌকা প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, তিনি আওয়ামী লীগের মেয়র হলেও আগে জাতীয়তাবাদী তরুণ দল করতেন। জাতীয় পার্টির রাজনীতিও করেছেন। তার পরিবারের অন্য সদস্যরা বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতিতে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
আওয়ামী লীগ কর্মী বাক্কার হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি আব্বাস আলী। তার ভাই আরিফুল ইসলাম মানিক রাজশাহী জেলা যুবদলের সদস্য এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শফিউল ইসলাম লিলন হত্যা মামলার ফাঁসির দণ্ডাদেশ পাওয়া আসামি।
সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া অডিওতে আব্বাস আলী বলেন, 'সিটি গেট থেকে আমার অংশ হাইওয়েটাকে ডিজাইন করতে একটি ফার্মকে দিয়েছি। তারা বিদেশি স্টাইলে সাজায়ে দেবে। ফুটপাত, সাইকেল লেনসহ টোটাল আমার অংশটা। একটু থেমে গেছি গেটটা নিয়ে, একটু চেঞ্জ করতে হচ্ছে। বড় হুজুরের সাথে আমাদের একজন ব্যক্তি বসছিল। যে ম্যুরালটা দিয়েছি বঙ্গবন্ধুর, সেটা ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী সঠিক না। এ জন্য আমি ওটা থুবো না, সব করব, যা কিছু আছে...। আমি দেখতে পাচ্ছি, আমাক যেভাবে বুঝাল ম্যুরালটা ঠিক হবে না; দিলে আমার পাপ হবে। কেন দিবো? দিবো না। আমি তো কানা লোক না। যেভাবে বুঝায়েছে তাতে আমার মনে হয়েছে, ম্যুরালটা দিলে আমার ভুল হবে। এ জন্য চেঞ্জ করছি। এ খবরটাও যদি আবার যায়, তাহলে আমার রাজনীতি যাবে। বঙ্গবন্ধু ম্যুরাল দিতে চায়া দিছে না। বঙ্গবন্ধুক খুশি করতে যায়া আবার আল্লাহক নারাজ করব নাকি? এইডি লিয়াও রাজনীতি হবে কিন্তু আমি শিওর। তাই বুইলি মানুষেক সন্তুষ্ট করতে গিয়ে আল্লাহক অসন্তুষ্ট করব নাকি? মাইন্ড কইরিই আমার... ফেলায়ে দিয়েছে ৯৪ পার্সেন্ট। কী মাইন্ড কইরি... ভাইয়েরা আমার ৯৪ পার্সেন্ট ভোট দিছে।'
এ বিষয়ে আব্বাস আলীর সঙ্গে কথা বলতে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে তার পৌর কার্যালয়ে গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তিনি দুপুর ২টা পর্যন্ত অফিসে আসেননি বলে জানান কর্মচারীরা। এরপর তার বাসায় গেলে তাকে সেখানেও পাওয়া যায়নি। গেটে তার মা ও কন্যা পরিচয়ে দু'জন নারী এসে জানান, আব্বাস আলী বাসায় নেই। সকাল থেকে একাধিকবার ফোন করলেও আব্বাস আলী ফোন ধরেননি। তবে এর আগে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, 'ভাইরাল হাওয়া বক্তব্য তার নয়। ষড়যন্ত্র করে কেউ এডিটিং (সম্পাদনা) করে করতে পারে।'
কাটাখালী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মঞ্জুর রহমান বলেন, '৪২ বছর ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করছি। সে মাছের মূর্তির মুখে আল্লাহর নাম লেখে রাখে। আর আওয়ামী লীগের পদে থেকে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তি করে। এটা আমরা মানতেই পারছি না। '
কাটাখালী পৌর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর বোরহান উদ্দীন বলেন, 'যে বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে বাংলাদেশের জন্ম হতো না, তাকে নিয়ে এতটা ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্য দেওয়ার পর এক সেকেন্ডও তাকে সংগঠনের পদে দেখতে চাই না।'
কাটাখালী পৌর আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যক্ষ জহুরুল আলম রিপন বলেন, এই ঘৃণিত অপকর্মের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। তাকে দল থেকে বহিস্কারসহ কঠোর শাস্তি চাই। এ ধরনের আওয়ামী লীগের পদে থাকলে সংগঠনের ভয়ংকর ক্ষতি হবে।
এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অনিল কুমার সরকার বলেন, 'চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্যের জন্য তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গাজীপুরের মেয়র জাহাঙ্গীরের যে শাস্তি হয়েছে, আব্বাসেরও একই শাস্তি হবে, আশা করছি।'
তিনি আরও বলেন, 'তার পরিবার বিএনপি-জামায়াতের। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী হিসেবে চিহ্নিত। কিন্তু সে যখন দলীয় পদ ও মেয়র পদে মনোনয়ন পায়, তখন আমি কোনো দায়িত্বে ছিলাম না। এটা মেরাজ মোল্লা ও দারা সাহেব জানেন।'
এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী আবদুল ওয়াদুদ দারা বলেন, অডিও ক্লিপ পেয়েছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশের অপেক্ষায় আছি। দলীয় বিধিবিধান অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। তার ভাই যুবদলের নেতা বলেও শুনেছি।
যেভাবে মেয়র হন আব্বাস :কাটাখালী এলাকার আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জানান, আব্বাস আলীর পিতা আশরাফ আলী ছিলেন ফুটপাতের চা বিক্রেতা। আব্বাসের পাঁচ ভাই, বাবা-চাচারা কেউই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ছিলেন না। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আব্বাস আলী ছিলেন জাতীয়তাবাদী তরুণ দলের নেতা। ২০০১ সালে সাহাপুরের আওয়ামী লীগ কর্মী আবু বাক্কারকে হত্যা করা হয়। সে মামলায় আব্বাস আলী ও আসের আলীর যাবজ্জীবন (৩০ বছর) কারাদণ্ড হয়। পরে উচ্চ আদালতে জামিন নিয়ে বের হয়ে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ২০১১ সালের ১২ জানুয়ারি কাটাখালী পৌরসভার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আবদুর রউফ নান্নুর বিরুদ্ধে ভোটে অংশ নেন। সেবার জামায়াতের প্রার্থী মাজেদুর রহমান মেয়র নির্বাচিত হন। ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে মেয়র হন আব্বাস। ২০২০ সালের ২৮ ডিসেম্বর আবার তিনি দলীয় মনোনয়ন পেয়ে মেয়র হন।
২০১৫ সালের নির্বাচনী হলফনামায় আব্বাস আলী ২০ হাজার টাকা নগদ, ব্যাংকে ২০ হাজার, স্ত্রীর নামে পাঁচ ভরি স্বর্ণ ও এক লাখ টাকা দেখান। কৃষি ও অকৃষি মিলিয়ে ১২ কাঠা জমি দেখান। আসবাবপত্র মিলিয়ে দেখান তিন লাখ টাকা। পূবালী ব্যাংকে ঋণ দেখান এক লাখ ২৩ হাজার ৬১২ টাকা।
২০২০ সালের নির্বাচনী হলফনামায় নগদ দুই লাখ, ব্যাংকে দেড় লাখ, পাঁচ ভরি স্বর্ণ ও এক লাখ টাকা, ১৫ ভরি উপহারের স্বর্ণ ও আসবাবপত্র তিন লাখ টাকা দেখান। এ ছাড়া বালু সাপ্লাই, মাছ চাষ, মুরগির খামার ও পাটের ব্যবসা দেখান। এবার তিনি জমির পরিমাণ দেখান ৭২ কাঠা। ব্যাংকের ঋণ দেখান ৩৬ লাখ ৮৬ হাজার ৬৪২ টাকা।
তবে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা জানান, তার সম্পদ শতকোটি টাকার ওপরে। কাটাখালী পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর আবদুল মোত্তালেব বলেন, 'আব্বাসের কোনো সম্পদই ছিল না। তার বাবা ছিল ফুটপাতের চা বিক্রেতা। আব্বাস মেয়র হওয়ার পর এখন শতকোটি টাকার সম্পদ। পৌরসভার সমস্ত টেন্ডার মেয়র আব্বাস নিজেই করেন।'
পৌরসভার আরেক কাউন্সিলর বোরহান উদ্দীন বলেন, 'শূন্য থেকে শতকোটি টাকার মালিক মানুষ কীভাবে হয়? নিশ্চয়ই অবৈধ কারবার করে। তার সম্পদের হিসাব নেওয়া জরুরি।'


বিষয় : কাটাখালীর পৌর মেয়র 'আব্বাসের অডিও

মন্তব্য করুন