'প্রতিশোধ' নিতেই কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের (কুসিক) প্যানেল মেয়র ও ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সৈয়দ মো. সোহেলকে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যার ঘটনায় মূল সন্দেহভাজন শাহ আলমেরই প্রতিশোধের শিকার হন সোহেল। তিন কারণে টার্গেট করা হয়েছিল তাকে। এক. শাহ আলম বিশ্বাস করতেন তার বাবাকে যে বা যারা খুন করেছিল, তারা সোহেলের ঘনিষ্ঠ। এতে তার হাত ছিল। বছর দশেক আগে আধিপত্য নিয়ে জেরে শাহ আলমের বাবা জানু মিয়া খুন হন। দুই. শাহ আলম ও তার কিছু ঘনিষ্ঠ সহযোগী সোহেলের কারণে কোণঠাসা ছিলেন। একাধিক মামলায় শাহ আলমের অন্তত ৫ সহযোগীকে কারাগারে যেতে হয়। এর পেছনে সোহেলের হাত ছিল বলে বিশ্বাস করতেন তারা। তিন. বালুমহাল ছাড়াও এলাকায় মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সোহেলের সঙ্গে শাহ আলমের বিরোধ ছিল। তাদের মাদক কারবারে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন কাউন্সিলর। আর জেলখানা থেকে বেরিয়ে হত্যার ছক চূড়ান্ত করা হয়। তদন্ত-সংশ্নিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদ সমকালকে বলেন, সবকিছু মাথায় নিয়ে তদন্ত করছি আমরা। কেন, কী কারণে, কারা খুন করেছে তার আদ্যোপান্ত বের করা হবে।
তদন্ত-সংশ্নিষ্ট অন্য একটি সূত্র বলছে, একসময় সোহেলের সঙ্গে শাহ আলমের ঘনিষ্ঠতা ছিল। তবে এলাকায় আধিপত্য ও মাদক কারবার নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। শাহ আলমের পরিকল্পনা ছিল, সোহেলকে সরিয়ে দিয়ে এলাকায় সব ধরনের অনৈতিক বাণিজ্যে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
এদিকে, ঘটনার এক সপ্তাহ পার হলেও মামলার প্রধান আসামি শাহ আলমকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ ও গোয়েন্দারা। হত্যাকাণ্ডের পর থেকে তার বারবার অবস্থান ও মোবাইল সিম পরিবর্তনের কারণে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায়ও কাজে আসছে না দাবি করছেন পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা।
এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত দুটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে জেলা ডিবি পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয়েছে শাহ আলমের বন্ধু শাখাওয়াত হোসেন ওরফে জুয়েলকে। গত মঙ্গলবার গভীর রাতে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের একটি টিম জেলার নাঙ্গলকোটের গান্দাচি গ্রাম থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। জুয়েল ওই গ্রামের দোলোয়ার হোসেনের ছেলে।
কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এম তানভীর আহমেদ জানান, উদ্ধার অস্ত্র দুটি কাউন্সিলর সোহেল হত্যাকাণ্ডে জড়িত এজাহারনামীয় ১ নম্বর আসামি শাহ আলমের। এটি কিলিং মিশনে ব্যবহার হয়। ঘটনার পর দিন রাতে জুয়েলের নাঙ্গলকোটের গান্দাচি গ্রামের বাড়িতে যায়। ওই রাতেই শাহ আলম কাউন্সিলর হত্যাকাণ্ডে দুটি আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি জুয়েলকে নিরাপদে রাখতে বলে। জিজ্ঞাসাবাদে জুয়েল পুলিশকে আরও জানিয়েছে, শাহ আলম ও জুয়েল একসময় কুমিল্লা কারাগারে বন্দি ছিলেন। ওই সময়ে তাদের মধ্যে সম্পর্ক হয়। অস্ত্র তার হেফাজতে রেখে পর দিন সকালে শাহ আলম তাদের বাড়ি থেকে অন্যত্র চলে যায়।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরও জানান, জুয়েলের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি বিদেশি রিভলবার, দুটি পিস্তলের ম্যাগাজিন ও ৩ রাউন্ড পিস্তলের গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় নাঙ্গলকোট থানায় অস্ত্র আইনে মামলা করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা গোয়েন্দা বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, শাহ আলম মাদক কারবারে জড়িত থাকায় সীমান্ত হয়ে পরিচিত লোকদের সহায়তায় ভারতে পালিয়ে যেতে পারে- পুলিশের এমন ধারণা ছিল। কিন্তু ঘটনার পর দিনও শাহ আলম নাঙ্গলকোটে অবস্থানের খবরে নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ।
শাহ আলম পেশায় মাদক ব্যবসায়ী। সোহেল কাউন্সিলর হওয়ার পর থেকে শাহ আলমের মাদক ব্যবসায় বাধা হয়ে দাঁড়ান। এ ছাড়া শাহ আলম গ্রুপের সঙ্গে কাউন্সিলর সোহেলের এলাকায় আধিপত্যসহ বিভিন্ন কারণে বিরোধও চলছিল। সোহেলকে 'পথের কাঁটা' মনে করতেন তিনি। সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়ও বদল হয় শাহ আলমের। স্থানীয় একাধিক আওয়ামী লীগ নেতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এলাকায় মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধে জড়িত ছিলেন তিনি। অস্ত্র, মাদক ও পুলিশ আক্রমণসহ ১০টি মামলা রয়েছে শাহ আলমের বিরুদ্ধে।
গত ২২ নভেম্বর কুসিক কাউন্সিলর সোহেলের কার্যালয়ে ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় কাউন্সিলর সোহেল ও তার সহযোগী হরিপদ সাহা গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। নিহত কাউন্সিলরের ভাই বাদী হয়ে ১১ জনের নামে মামলা করেন। এই মামলায় এ পর্যন্ত ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন- সুমন, মাসুম, আশিকুর রহমান রকি, আলম মিয়া, জিসান ও অন্তু। তাদের মধ্যে অন্তু ছাড়া সবাই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। গত সোমবার রাতে 'বন্দুকযুদ্ধে' মারা গেছে মামলার আসামি সাব্বির ও সাজন।