সূর্য তখন পাহাড়ের চূড়া আলিঙ্গন করে ডুব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মধ্য অগ্রহায়ণের শীতের স্নিগ্ধতা বান্দরবানের রুমা ও আশপাশ এলাকার ছোট-বড় পাহাড়কে ততক্ষণে ভালোবাসার ফ্রেমে বেঁধে ফেলেছে। এমন পরিবেশেই নয়ন দাশ নামে এক পাহাড়ি তরুণ আঁকাবাঁকা উঁচুনিচু পিচঢালা পথ পাড়ি দিচ্ছিল গাড়ির স্টিয়ারিং হাতে। নয়ন তার ফোর হুইলের পুরোনো লক্কড়ঝক্কড় গাড়ির নাম দিয়েছে 'ল্যান্ডক্রুজার'। দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়েই গাড়ি চালাচ্ছেন তিনি।
গাড়িতে বসেই পাহাড়িজীবনের নানা দুঃখ-কষ্টের গল্প বলে যাচ্ছিলেন নয়ন। জানালেন, বছর দুয়েক আগে গাড়ি চালানোর সময় তাকে অপহরণ করে পাহাড়ি একটি সশস্ত্র গ্রুপ। সেই গ্রুপটির নাম মগ লিবারেশন পার্টি। ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে দুই দিনের মাথায় জিম্মিদশা থেকে ছাড়া পান। তার ভাষ্য, পাহাড়ে এখনও আতঙ্ক একাধিক সশস্ত্র গ্রুপ ও চাঁদাবাজ গ্রুপ। বান্দরবান সরেজমিন গিয়ে নয়নের সঙ্গে কথা হয়।
নয়ন মোটেই বাড়িয়ে বলেননি। পার্বত্য শান্তিচুক্তির দুই যুগপূর্তি হলেও খুনোখুনি, হানাহানি ও অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধ হয়নি এই পাহাড়ি জনপদে। ভয়ংকরভাবে সক্রিয় আছে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী।
রক্তাক্ত পরিস্থিতি ও হানাহানির অবসান ঘটাতে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের উপস্থিতিতে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) শীর্ষ নেতা জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা)। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৮ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে জনসংহতি সমিতির সদস্যদের অস্ত্র সমর্পণ শেষে শান্তির প্রতীক পায়রা ওড়ান বঙ্গবন্ধুকন্যা।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ১৯৯৮ সালে স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন সংশোধন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন সংসদে পাস হয়। ওই বছর ১৫ জুলাই গঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়। চুক্তির পর পার্বত্য অঞ্চলকে দেশের মূলধারার সম্পৃক্ত করতে তিন পাহাড়ি জেলার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। তিন জেলায় ১ হাজার ২১২ কিলোমিটার পাকা সড়ক নির্মাণ, ১৪১টি কালভার্ট তৈরি, ৫২০ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা, ১ হাজার ৪০৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন ভবন, ১ হাজার ৯৮৬টি বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ৭৮টি কমিউনিটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ২ লাখ ৫৯ হাজার ২৩৮টি বনায়ন, ৫৫১টি পানি সম্প্রসারণ কার্যক্রম, প্রত্যন্ত অঞ্চলে বৈদ্যুতিক সঞ্চালন লাইন নির্মাণ, সোলার সরবরাহ, ৯১টি হাটবাজার উন্নয়নসহ ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, পর্যটন কেন্দ্রসহ নানা অবকাঠামো তৈরি করা হয়। এ ছাড়া পার্বত্য এলাকার ৫১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়েছে।
পাহাড়ে বিভিন্ন সংস্থায় নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, চুক্তির ৭২টি ধারার ৪৮টিই পূর্ণাঙ্গ এবং ১৫টির আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে। ৯টি ধারা বাস্তবায়নের জন্য প্রক্রিয়াধীন। সড়ক নেটওয়ার্ক, নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি, অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ পাহাড়িদের জীবন বদলে দেওয়ার জন্য কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এতে পাহাড়িদের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। নিজস্ব সংস্কৃতি ও জীবন ব্যবস্থা ধরে রেখেই পাহাড়ি জনগোষ্ঠী বিভিন্ন আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ সমাজের মূল স্রোতধারায় যুক্ত হয়েছেন।
তবে পাহাড়ের কিছু সশস্ত্র গ্রুপ এখনও প্রায়ই অশান্ত পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। অন্তত ৪টি সশস্ত্র গ্রুপকে মাঝে মাঝে খুনোখুনিতে জড়াতে দেখা যায়। এগুলো হলো- জনসংহতি সমিতি (জেএসএস), জেএসএস সংস্কার, ইউনাইটেড পিপল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)। ভূমি ইস্যু ও পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার দাবির আড়ালে চাঁদাবাজি ও এলাকায় আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ, মূলধারার রাজনৈতিক নেতাদের টার্গেট, বিরোধী আঞ্চলিক দলকে ছাড় না দেওয়া, উন্নয়ন ও পর্যটন বিকাশে বাধাসহ নানা প্রতিবন্ধকতা ও জটিলতা তৈরি করছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৭ সাল থেকে গত পাঁচ বছরে পাহাড়ে খুনের ঘটনা ঘটেছে ১০৫টি। আর অপহরণ করা হয়েছে ৯০ জনকে। সর্বশেষ গত ৩০ নভেম্বর রাঙামাটি সদর উপজেলায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে জেএসএস কর্মী মানিক চাকমা নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিককে দায়ী করেছে জেএসএস।
এর আগে ২০১৯ সালে বাঘাইছড়ি উপজেলার ৯ মাইল এলাকায় উপজেলা নির্বাচনী কর্মকর্তার গাড়িতে জেএসএস ও ইউপিডিএফের মূল সংগঠনের ক্যাডারদের সশস্ত্র হামলায় ৮ জন নিহত হয়। আহত হয় ১৮ জন। গত ১৭ অক্টোবর কাপ্তাই উপজেলার ৩ নং চিৎমরম ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি নেথোয়াই মারমাকে নিজ বাড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ হত্যার জন্য জেএসএসকে দায়ী করছে প্রতিপক্ষ।
১৯৯৭ সালে শান্তি চুক্তির পর গত ২৪ বছরে পাহাড়ে খুনের শিকার হয়েছেন এক হাজার ২১০ জন। এর মধ্যে বাঙালি ৪৩৯ জন ও পাহাড়ি ৭৭১ জন। আর গত চার বছরে ইউপিডিএফের ৪২ জন, ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিকের ৫ জন, জেএসএসের ১২ জন, জেএসএস সংস্কারের ৩২ জন, বাঙালি ২ জন ও অন্যান্য ১০৫ জন হত্যার শিকার হন।
সশস্ত্র গ্রুপগুলো খুনোখুনির ঘটনায় অত্যাধুনিক অস্ত্রও ব্যবহার করছে। এর মধ্যে রয়েছে এমজি, এলএমজি, রাইফেল, পিস্তল ও গ্রেনেড। এ ছাড়া ২০০৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৩ হাজারের বেশি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় প্রায় আড়াই লাখ গোলাবারুদ জব্দ করা হয়।
সশস্ত্র গ্রুপগুলোর চাঁদাবাজির বিভিন্ন ক্ষেত্র হলো পরিবহন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন ফলের বাগান। এ ছাড়া বেসামরিক কর্মকর্তা, কর্মচারী ও ঠিকাদারকে টার্গেট করেও তারা চাঁদা দাবি করেন। পার্বত্য তিন জেলায় বছরে ৩০০-৪০০ কোটি টাকার চাঁদা আদায় হয়। ২০২০ সালের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত চাঁদাবাজির অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হয় ৩৩ জন।
ফোর হুইলার চালক নয়ন দাশ বলছিলেন, পাহাড়ে অধিকাংশ মানুষ শান্তিতে বসবাস করলেও এখনও কয়েকটি সশস্ত্র গ্রুপ প্রায়ই ভীতির কারণ হয়ে উঠছে। শান্তিচুক্তির শর্ত অনুযায়ী পাহাড়িরা অস্ত্র সমর্পণ করে সন্ত্রাস ও অপরাধ বন্ধ করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার কথা থাকলে কেউ কেউ তা করেননি।
দেশের এক-দশমাংশ ভূখণ্ড নিয়ে পার্বত্য তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান। এর মোট আয়তন ৫ হাজার ৫০০ বর্গমাইল। কিন্তু জনসংখ্যা মাত্র ১৬ লাখ; যা দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ। এর মধ্যে ৮ লাখ বাঙালি আর বাকি ৮ লাখ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর। এখানে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বম, মুরং, তঞ্চঙ্গ্যা, খুমী, লুসাই, খেয়াং, উষাই, চাক ও পাংকু আদিবাসীদের বাস। একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি মেডিকেল কলেজ সেখানে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। শিক্ষার হার বেড়ে বর্তমানে প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে অগ্রসর চাকমা জনগোষ্ঠীর শিক্ষার হার ৭৫ শতাংশ।