হলে ছাত্র ওঠানো, ডাইনিং ম্যানেজার (খাবার পরিচালনা) নির্বাচন, বিভিন্ন কর্মসূচি পালনে ছাত্রলীগ নেতাদের কথামতোই চলে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ছয়টি ছাত্র হল। মেধার ভিত্তিতে সিট বরাদ্দের কথা থাকলেও ছাত্রলীগ নেতাদের 'আশীর্বাদ' না পেলে সিট বরাদ্দ পাওয়া যায় না। ডাইনিং পরিচালনাসহ আর্থিক সুবিধা-সংবলিত পদগুলোতে ছাত্রলীগ নেতারাই দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

এর বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত নিলেই প্রভোস্টসহ সিনিয়র শিক্ষকদের চাপ প্রয়োগ ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। ছাত্রদের মধ্যে কেউ কোনো বিষয়ে প্রতিবাদ করলেই তারা নির্যাতনের শিকার হন। ভিন্ন মতের 'ট্যাগ' দিয়ে ছাত্রদের পিটিয়ে পুলিশে তুলে দেওয়ারও অনেক ঘটনা ঘটেছে হলগুলোতে।

গত কয়েক দিন কুয়েটের বিভিন্ন হলের আবাসিক ছাত্র ও প্রভোস্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে কোনো শিক্ষক ও ছাত্রই সংবাদমাধ্যমে তাদের নাম প্রকাশ করতে চাননি।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুয়েটে কোনো ছাত্র সংসদ নেই। কিন্তু 'ছাত্র কল্যাণ কমিটি' নামে একটি কমিটি তৈরি করেছিলেন কুয়েটের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমগীর। ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এই কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। ছাত্রবিষয়ক যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে এই কমিটির সঙ্গে পরামর্শের অলিখিত নিয়ম ছিল। যার কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ছাত্রলীগ নেতাদের খবরদারি বেড়ে যায়।

কুয়েটে সাতটি হলের মধ্যে একটি ছাত্রী হল। বাকি ছয়টি ছাত্র হল ছাত্রলীগ নেতাদের নিয়ন্ত্রণে। এর মধ্যে অমর একুশে হল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল বড় হওয়ায় এখানে প্রতি মাসে চারজন করে ডাইনিং ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করে। অন্য চারটি হলে ম্যানেজার থাকে একজন, সর্বোচ্চ দু'জন করে। হল কমিটির সভায় ম্যানেজারের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ছাত্রলীগ নেতারাই হল কমিটির বিভিন্ন পদে
 থাকেন- যার কারণে ম্যানেজার হিসেবে চতুর্থ বর্ষের ছাত্রলীগ নেতারাই দায়িত্ব পান।

শিক্ষার্থীরা জানান, ম্যানেজারের কাজ মূলত বাজার করা। এ ছাড়া প্রতি মাসেই প্রত্যেক ছাত্রের বিপরীতে ৫০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত বিল করা হয়। বাজার ও অতিরিক্ত বিলের কারণে ছোট হলগুলোতে প্রতি মাসে একজন ম্যানেজারের ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকা আয় হয়। বড় হলগুলোতে আয়ের অঙ্ক দেড় লাখের কাছাকাছি। আয়ের একটি অংশও যায় নেতাদের পকেটে। মূলত আয় ও প্রভাব খাটাতেই ডাইনিং ম্যানেজার পদে নিজের অনুগতদের রাখতে চান ছাত্রলীগ নেতারা।

সূত্র জানায়, গত নভেম্বর মাসে লালন শাহ হলে ডাইনিং ম্যানেজার ছিলেন নাজমুস সাকিব। ছাত্রলীগের সভাপতি গ্রুপের অনুসারী এই নেতাকে বাদ দিয়ে ডিসেম্বর মাসে নিজের এক অনুসারীকে নিতেই প্রভোস্ট ড. মো. সেলিম হোসেনকে চাপ প্রয়োগ করেছিলেন কুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান সেজান।

ছাত্রলীগ নেতাদের এমন চাপ সহ্য করতে না পেরে ১ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রভোস্ট পদ থেকে পদত্যাগ করেন ড. কল্যাণ কুমার হালদার। তার পদত্যাগপত্র এখনও গ্রহণ করা হয়নি।

শনিবার দুপুরে ড. কল্যাণ কুমার হালদার সমকালকে বলেন, সবাই নিজের অনুসারীদের কমিটি বা ডাইনিং ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ দিতে চেষ্টা করে। আমার ওপরও চাপ ছিল। এজন্য আমি দুটো ডাইনিং দুই পক্ষের দু'জনকে দিয়ে (ম্যানেজার) পরিচালনা করেছি। আর চাপ নিতে পারছি না। তাই পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি।

খানজাহান আলী হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মো. সুলতান মাহমুদ সমকালকে বলেন, সব হলের চিত্র প্রায় একই রকম। কোথাও কম, কোথাও বেশি।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভর্তির প্রথম বছর পর হলে উঠতে আবেদন গ্রহণ করা হয়। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে মেধাবীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু প্রথম বর্ষে যারা ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে অংশ নেয়, নেতাদের সঙ্গে থাকে- তারাই প্রথমে হলে সিট পায়। যাদের সিট পাওয়ার কথা তারা পায় আরও এক বছর পরে। আর যারা সাধারণ ছাত্র, শিক্ষাজীবনের পুরোটাই তাদের মেসে থেকে কাটিয়ে দিতে হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব ঘটনার বাইরে হলে বা ক্লাসে ভিন্নমত প্রকাশ করলেই শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের শিকার হতে হয়। করোনার কারণে গত দেড় বছর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় নতুন কোনো ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু এর আগে ২০১৯ সালের ২৪ মার্চ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শাহীন, রেজাউল ও মেহেদী নামের তিন শিক্ষার্থীকে ফজলুল হক হলের একটি কক্ষে আটকে সারারাত মারধর করা হয়। ২৫ মার্চ সকালে 'শিবির নেতা' পরিচয় দিয়ে তাদের খানজাহান আলী থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর আগে ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি চারজনকে বেদম মারধর করে পুলিশে তুলে দেওয়া হয়। এর মধ্যে আল আমিন নামের এক শিক্ষার্থীর চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কুয়েটে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থীকে একসঙ্গে মারধর করা হয় ২০১৭ সালের ১ মে। ওইদিন রাতে বিভিন্ন হলের ২১ জন শিক্ষার্থীকে একসঙ্গে বঙ্গবন্ধু হলের গেস্টরুমে নিয়ে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১৪ জনকে শিবির পরিচয়ে পুলিশে তুলে দেওয়া হয়।

এ ব্যাপারে কুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান সেজান সমকালকে বলেন, হল নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ সঠিক নয়। প্রথা অনুযায়ী চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীরাই ডাইনিং ম্যানেজার হয়। প্রতি বেলায় শিক্ষার্থীদের খাবার খরচ ৫০ টাকা। বর্তমান বাজারদরে এই টাকায় বাজার করে সেখান থেকে আত্মসাৎ করার কোনো সুযোগই নেই।

তিনি বলেন, কুয়েট ছাত্রলীগে কোনো গ্রুপিং নেই। আমার গ্রুপের লোকদের ম্যানেজার দিতে বলেছি- এ অভিযোগ সঠিক নয়। আর হলে ছাত্র ওঠানোর দায়িত্ব প্রভোস্টদের। আমাদের কিছু অনুরোধ থাকে কিন্তু প্রভোস্টরাই সব নিয়ন্ত্রণ করেন। শিক্ষার্থীদের মারধরের ঘটনা অনেক আগের। তখন আমরা জুনিয়র ছিলাম, কী হয়েছিল জানা নেই।

এ ব্যাপারে কুয়েটের ভারপ্রাপ্ত ছাত্র কল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক ড. ইসমাইল সাইফুল্লাহ সমকালকে বলেন, হল-সংক্রান্ত বিষয়গুলো প্রভোস্টরাই তদারক করেন। এর বাইরে কোনো ছাত্র অভিযোগ দিলে সেগুলোর ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়।