সাদা রঙের ডেমু ট্রেনটি আসছিল নাজিরহাট থেকে চট্টগ্রাম শহরে। কিন্তু ঝাউতলাতে এসে সেটিতে লাগল রক্তের ছোপ। সিএনজি অটোরিকশা ও হিউম্যান হলারের সঙ্গে সংঘর্ষে মুহূর্তেই লাশ হয়ে গেলেন তিনজন। এদেরই একজন সাতরাজ উদ্দীন শাহীন। হিউম্যান হলারের ভেতর গুরুতর আহত হয়ে বাঁচার জন্য আকুতি জানাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু এগিয়ে আসেনি কেউ। সবাই যখন মোবাইল ফোনে ভিডিও করা নিয়ে ব্যস্ত, তখন ত্রাতা হয়ে এলেন সাহেলা আক্তার নামে এক নারী। পাশের বস্তিতেই থাকেন। কিন্তু বুকে রাখেন অসীম সাহস। আরও দুই নারীকে সঙ্গে নিয়ে আহতদের উদ্ধার করতে ঝাঁপিয়ে পড়েন সাহেলা।

'ডেমু ট্রেন সিএনজি ও বাসের যাত্রীদের চুরমার করে চলে যায়। দুর্ঘটনা দেখে আমরা এগিয়ে গিয়ে দেখি, সিএনজির ভেতর এক ছাত্র বাঁচার জন্য খুবই আকুতি করছেন। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসছিল না। সবাই মোবাইলে ভিডিও করছে। আমি বললাম, ভাইয়ারা, একটু ধরেন। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। পরে আরও দু'জন মহিলার সহায়তায় আমি চারজনকে উদ্ধার করে গাড়িতে তুলে দিয়েছি।' এভাবেই সাহসিনী সাহেলা আক্তার জানালেন রুদ্ধশ্বাস উদ্ধার অভিযানের কথা। যে ছাত্রকে উদ্ধার করে গাড়িতে তুলে দিয়েছেন সাহেলা; জীবন-মৃত্যুর যুদ্ধে হেরে গেছেন তিনি। হাসপাতালেই মারা গেছেন এইচএসসি বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী শাহীন। তার সঙ্গে প্রাণ গেছে কনস্টেবল মনিরুল ইসলাম ও প্রকৌশলী বাহাউদ্দিনের। এ তিন হতভাগ্যের পরিবারে চলছে এখন শোকের মাতম। হাসপাতালের করিডোরে বিলাপ করতে করতে মনিরুলের স্ত্রী সেলিনা আক্তার বলছিলেন, 'আমাদের চারজনের কী হবে? সন্তানদের নিয়ে কোথায় যাব? কে নেবে আমাদের দায়িত্ব?'

ট্রাফিক কনস্টেবল মো. মনিরুল ইসলাম ট্রেন আসতে দেখে সড়কে চলাচল করা গাড়ি থামাতে গিয়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আট বছর ধরে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশে (সিএমপি) কর্মরত ছিলেন তিনি। কোমরে ব্যথা থাকায় দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে ডিউটি করতে না পারায় কোর্ট পুলিশের ইউনিটে চাকরি করেছেন দীর্ঘদিন। দাঁড়িয়ে ডিউটি করা থেকে বাঁচতে থানা থেকে কোর্টেই দায়িত্ব পালনে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন তিনি। কিন্তু কোর্ট থেকে বদলি করায় ফের রাস্তায় ডিউটি করতে গিয়ে এবার চিরতরে বিদায় নিলেন কনস্টেবল মনিরুল। অসুস্থতার কারণে সিনিয়রদের আর কোনোদিন কোর্ট শাখায় দায়িত্ব দেওয়ার জন্য বায়না করবেন না তিনি। দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে অনিশ্চিত জীবনের পথে রেখে গেছেন মনিরুল।

মেডিকেলে মর্গের সামনে কনস্টেবল মনিরুলের বড় মেয়ে মাহমুদা ফেরদৌস লিমা বলেন, বাবাই ছিল আমাদের পরিবারের সব। সারাজীবনের জন্য বাবার আদর থেকে বঞ্চিত হলাম আমরা। বাবার এমন মৃত্যু কোনোভাবে আমরা মেনে নিতে পারছি না।

মনিরের সঙ্গে দায়িত্ব পালনরত অপর পুলিশ কনস্টেবল আলী হোসেন বলেন, আমি ক্রসিংয়ের পশ্চিম পাশে ডিউটি করছিলাম আর মনির ভাই ছিলেন পূর্বপাশে। ডেমু ট্রেন আসার সময় রেললাইনের ওপর বাস, অটোরিকশা ও টেম্পো উঠে গেলে তিনি সরাতে ছুটে যান। তখন গাড়ি তার ওপর ছিটকে এসে পড়ে।