প্রচলিত আছে মশা মারতে 'কামান' দাগানোর কথা। এখন সেটিই যেন বাস্তব হয়ে ধরা দিচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে (চসিক)। মশা মারার কার্যকর ওষুধ খুঁজতে পার করেছেন সাড়ে ৯ মাস। এখনও সেই ওষুধের হদিস পাননি তারা। এর আগে দুই বছর মশা মারতে যে ওষুধ ছিটিয়েছিল সিটি করপোরেশন, পরীক্ষার পর দেখা গেছে সব ওষুধ ছিল অকার্যকর। অথচ অকার্যকর ওই ওষুধই কেনা হয়েছিল দুই কোটি টাকায়। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সিটি মেয়র রেজাউল করিম মশা নিধনে নেন ১০০ দিনের ক্র্যাশ কর্মসূচি। তার এই কর্মসূচিও 'ফ্লপ'।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা নগরের ৫১টি স্থান থেকে মশার লার্ভা সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে ৩৩টি স্থানে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার উপস্থিতি পেয়েছেন। ম্যালেরিয়ার জীবাণুবাহী অ্যানোফিলিস মশার উপস্থিতি পেয়েছেন ৩৯টি স্থানে। আর এ দুই ধরনের মশার লার্ভা পাওয়া গেছে ২২টি স্থানে। ৩৩টি স্থানের মধ্যে ১৫টি থেকে সংগ্রহ করা নমুনার শতভাগই ছিল এডিসের লার্ভা। আর অ্যানোফিলিস লার্ভার শতভাগ উপস্থিতি ছিল দুটি জায়গায়। গত আগস্টে এ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগ সূত্র জানায়, মশার লার্ভা নিধনে স্প্রে মেশিন দিয়ে ছিটানো হয় কীটনাশক লার্ভিসাইড ও পূর্ণবয়স্ক বা উড়ন্ত মশা নিধনে ফগার মেশিন দিয়ে অ্যাডাল্টিসাইড ছিটানো হয়। ২০২০ সালে 'ক্লোরপাইরিফস এম ফস ২০ ইসি' নামের ১০ হাজার লিটার লার্ভিসাইড কেনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। প্রতি লিটার ৯৯০ টাকা করে ৯৯ লাখ টাকায় কেনা হয় এসব ওষুধ। লার্ভিসাইডগুলো সরবরাহের আগে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের কীটতত্ত্ব বিভাগে পরীক্ষার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তা না করেই এসব লার্ভিসাইড গত বছরের ১৪ মে সরবরাহ করা হয়। সরবরাহের এক মাস পর আইইডিসিআরের পরীক্ষার ফলাফল পাঠানো হয়। এ ছাড়া সরবরাহ করা লার্ভিসাইড শর্তানুযায়ী উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের স্ট্যান্ডার্ড স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী যাচাই করার শর্ত ছিল। তাও করা হয়নি।

এর আগে ২০১৯ সালে দরপত্র ছাড়াই নারায়ণগঞ্জের সরকারি প্রতিষ্ঠান ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড থেকে ২৫ হাজার লিটার লিকুইড অ্যাডাল্টিসাইড কেনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। প্রতি লিটার ৪১২ টাকা করে সিটি করপোরেশনের ব্যয় হয় এক কোটি তিন লাখ টাকা। এসব অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে সিটি করপোরেশনের নিরীক্ষায় প্রশ্ন তোলে পার্বত্য চট্টগ্রাম পল্লী উন্নয়ন ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠান অডিট অধিদপ্তর। গত আগস্টে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক মশক নিধনের এসব ওষুধ পরীক্ষা করে বলেছেন, ওষুধগুলো অকার্যকর।

যাচাই-বাছাইয়ে ৯ মাস পার: ওষুধ ছিটানোর পরও মশা নিধন না হওয়ায় ওষুধের কার্যকারিতা যাচাই করে দেখতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুরোধ জানান সিটি মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় একটি কারিগরি কমিটি গঠন করে দেয়। তারা সিটি করপোরেশনের ব্যবহূত দুটি ওষুধসহ মোট ছয়টি ওষুধ পরীক্ষা করেন। এতে মাত্র একটি ওষুধের কার্যকারিতা পান তারা। অকার্যকর ওষুধগুলোর ব্যবহার বন্ধ করে কার্যকর ওষুধটি ব্যবহারের সুপারিশ করেন কারিগরি টিমের বিশেষজ্ঞরা। পরে এটি পরীক্ষামূলক ব্যবহার করলেও ওষুধটি কেনেনি সিটি করপোরেশন। সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, ওষুধটির ব্যবহারে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ছাড়পত্র নেই।

এর আগে মেয়রের নির্দেশে মশা নিধনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম দেখতে যায় পরিচ্ছন্ন বিভাগের একটি টিম। তারা এসে মেয়রকে প্রতিবেদন জমা দেন। কিন্তু মশা নিধনে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। গত ১৬ আগস্ট কার্যকর ওষুধ সংগ্রহে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে দেন মেয়র। এই কমিটিও প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে চসিকের ব্যবহূত পূর্ণাঙ্গ মশা ধ্বংসের কীটনাশক লিকুইড অ্যাডাল্টিসাইড (ডেল্টামেথ্রিন ও ল্যাম্বডা সাইহ্যালোথ্রিন) ব্যবহার বন্ধ করার সুপারিশ করা হয়। এর পরিবর্তে 'ম্যালাথিয়ন-৫৭ ইসি' ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়। এ ছাড়া লার্ভিসাইড হিসেবে 'ক্লোরপাইরিফস এম ফস ২০ ইসি'-এর পরিবর্তে 'টেমিফস ৫০ ইসি' ব্যবহারের সুপারিশ করে। এভাবে গত সাড়ে ৯ মাসে তিন দফা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেও কীটনাশক কেনার কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

চসিকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি মোবারক আলী সমকালকে বলেন, দীর্ঘদিন সিটি করপোরেশন যে ওষুধ ব্যবহার করছে, সেটি অকার্যকর বলেছেন গবেষকরা। আবার যেটি কার্যকর বলেছেন, সেটির পাবলিক হেলথ পেস্টিসাইড হিসেবে নিবন্ধিত নয়। এ জন্য কার্যকর ওষুধের খোঁজ করতে গিয়ে মশার ওষুধ কিনতে দেরি হচ্ছে। তবে মশা নিধন কার্যক্রম থেমে নেই বলে জানান তিনি।

আবারও পরীক্ষামূলক ওষুধ কেনার সিদ্ধান্ত: গত মঙ্গলবার সিটি করপোরেশনের সাধারণ সভায় মশা নিধন কার্যক্রম নিয়ে কাউন্সিলরদের তোপের মুখে পড়েন উপপ্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা মোরশেদুল আলম চৌধুরী। এ সময় ওষুধ কেনা নিয়ে প্যানেল মেয়র আবদুস সবুর লিটন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি মোবারক আলীর মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডাও হয়েছে। এরপর সভায় আবারও পরীক্ষামূলক ওষুধ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের উপপ্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা মোরশেদুল আলম চৌধুরী সমকালকে বলেন, পরীক্ষামূলকভাবে অ্যাডাল্টিসাইড হিসেবে 'ইনভেন্ট লিকুইড ইনসেক্টিসাইড' ১৬শ লিটার ও লার্ভিসাইড হিসেবে 'টেমিফস ৫০ ইসি' ২৫০ লিটার কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই দুটির মধ্যে যেটির কার্যকারিতা পাওয়া যাবে, সেটি কেনা হবে।