‘এলাকায় কোনো মহিলারে তার স্বামী বা পরিবারের কেউ মারলে, ধরলে, আমরা এলাকার মুরুব্বিদের কাছে যাই। তারা বলেন মামলা দেও। কিন্তু মামলা করার পর তারা সবাই চুপ হয়ে যান। তখন উল্টা চাপ হয়ে যায় আমাদের।’

সোমবার দুপুরে নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার পাংখার বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ে এক উন্মুক্ত সংলাপে অংশ নিয়ে স্থানীয় নারীরা এমন অভিযোগ জানিয়েছেন। 

উন্নয়ন সংগঠন পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশান নেটওয়ার্ক-(প্রাণ), নিজেরা করি এবং বন্ধনের যৌথ উদ্যোগে এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের সহায়তা ছিল এতে।

সংলাপে অংশ নেওয়া একজন নারী বলেন, ‘নারীদের জন্য প্রধান বাধা তৈরি করে সমাজ। নারীদের আসলে কোনো কথা বলতে দেয়া হয় না। সহিংসতা, নিপীড়নের কথা বলতে গেলে আবারও নিপীড়নের শিকার হতে হয়, এই সহিংসতার তীব্রতা প্রথমবারের চেয়েও বেশি হয় কখনও কখনও।’ 

একজন কলেজপড়ুয়া ছাত্রী তুলে ধরেন বাল্যবিবাহের ভয়াবহতা। করোনা মহামারীতে দেশজুড়ে বাল্যবিবাহের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিত নিয়েও কথা বলেন তিনি। 

তিনি বলেন, ‘এখানে নারীর প্রতি সহিংসতার মূল বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে যৌতুক, বাল্যবিবাহ। প্রায়শই দেখা যায়, জন্ম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বয়স নিয়ে মিথ্যে রেজিস্ট্রেশন হয়। চলমান করোনা মহামারীতে এখানে বাল্যবিবাহের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। অনেক সময় প্রশাসনের সহায়তায় বিয়ের আয়োজন বন্ধ করা গেলেও কোর্টে গিয়ে এই আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়।’

নারী নির্যাতনের সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লেষ থাকার কথাও বলেন কেউ কেউ। 

তারা বলেন, ‘নোয়াখালীর সুবর্ণচরে এক ধরণের না, অনেক ধরণের নিপীড়নও আছে; যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক। এগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলা এখন সময়ের দাবি। মামলার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেক নারীরা মামলা করতে চান না। ফলে অনেকেই আইনি সহায়তা নিতে চান না।’ 

সোমবার দুপুরে বৈরি আবহাওয়া উপেক্ষা করে এই সংলাপে অংশ নেন তিন শতাধিক নারী-পুরুষ, যাদের মধ্যে ছিলেন শিক্ষার্থী, জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পেশাজীবীরা।

অনুষ্ঠানের অতিথি  ছিলেন চর জব্বার থানার অফিসার ইন চার্জ জিয়াউল হক, সুবর্ণচর উপজেলা ভাইস চেয়ার সালমা চৌধুরী, পাংখার বাজার উচ্চ বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক আক্তার হোসেন বাবুল। 

সমবেত জাতীয় সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় উন্মুক্ত সংলাপ। 

নারীর প্রতি চলমান সহিংসতার কারণ, করণীয় ও প্রতিকার বিষয়ে অংশগ্রহণকারী ও অতিথিদের মধ্যে নানা প্রশ্নোত্তরের মধ্যে দিয়ে এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় নারীরা নির্যাতনের শিকার হলে কোথায় গেলে প্রতিকার পাবেন, আইনি পদক্ষেপগুলো কেমন হবে, তা নিয়ে অতিথিদের প্রশ্ন করেন। 

সুবর্ণচর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান সালমা চৌধুরী বলেন, ‘একজন নারীকে আঘাত করা মানে গোটা পরিবারকে আঘাত করা। সমাজ পরিবারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অবদান অপরিসীম হলেও তার স্বীকৃত সেভাবে নেই।’

নারীর প্রতি নির্যাতনের যেকোনো ঘটনায় সরাসরি প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের শরণাপন্ন হওয়ার আহবান জানান তিনি। 

চর জব্বর থানা অফিসার ইন চার্জ (ওসি) জিয়াউল হাসান বলেন, ‘প্রশাসন আইনি বিষয়গুলো অবশ্যই দেখবে কিন্তু কিন্তু নিজের ঘরে নির্যাতিত হবার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হলে নিজেদের সচেতন হবার বিকল্প নেই। নারীর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই কমবেশি সহিংসতা ঘটে, আমরা হয়তো তা বুঝতে পারিনা, বা তা নিয়ে কথা বলিনা। আর যতক্ষণ আমরা কথা না বলবো, ততক্ষণ সহিংসতা হবে। সব ধরণের সহিংসতা বন্ধ করতে আমাদের পারিবারিক শিক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।’ 

জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে ব্যক্তিগত এবং ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার শপথের মধ্যে দিয়ে এই আয়োজন সমাপ্ত হয়। 


বিষয় : সুবর্ণচর উন্মুক্ত সংলাপ পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশান নেটওয়ার্ক

মন্তব্য করুন