হকারদের পুনর্বাসনে প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছিল সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) ও সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি)। বেশ সাড়া পড়েছিল তাতে। ঢাকঢোল পিটিয়ে হকারদের নেওয়া হয় সিসিক ভবনের পেছনে লালদীঘির পাড় ময়দানে। জমে উঠেছিল পুনর্বাসিত হকারদের বাজার। হকাররাও ছিলেন উল্লসিত। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে লালদীঘির পাড় মার্কেট ফাঁকা। বাজার করতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন ক্রেতারা। ভ্রাম্যমাণ এসব হকার আবার দখল করে নিয়েছেন নগরীর ফুটপাতগুলো। সরেজমিন লালদীঘি মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, খালি মাঠে ভাঙাচোরা কিছু খুপরি ঘর ছাড়া কিছুই নেই। বিষয়টিও জানা নেই সিসিক ও এসএমপির।
সিলেট নগরীর সবচেয়ে ব্যস্ততম সড়ক বন্দরবাজার-চৌহাট্টা। প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ এ সড়কের পুরো ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করতে শুরু করেন ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীরা। এমনকি সড়কের অর্ধেকটা চলে যায় তাদের দখলে। ফলে দেখা দেয় দীর্ঘ যানজট। দুর্ভোগ পোহাতে হয় সড়কের যাত্রী ও পথচারীদের। বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করা হয়। তাতেও সাফল্য মেলেনি।
এ অবস্থায় গত বছরের ডিসেম্বরে হকারদের স্থায়ী পুনর্বাসনের জন্য সিসিক ও এসএমপি যৌথভাবে কাজ শুরু করে। প্রাথমিকভাবে লালদীঘির পাড় খালি মাঠে ১ হাজার ৭০ জন হকারকে পুনর্বাসন করা হয়। সিসিকের ব্যয় হয় প্রায় অর্ধকোটি টাকা। এতে প্রাধান্য পান বন্দরবাজার-চৌহাট্টা সড়কের হকাররা।
হকারদের নাম তালিকাভুক্ত করে বাঁশ দিয়ে দোকান বানিয়ে দেওয়া হয়। প্রথম দিকে লোকজন সেখানে কম যান। ধীরে ধীরে জমে ওঠে লালদীঘি মাঠ। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে বাজারটি পরিচিতি পেতে শুরু করে। এভাবেই চলে বেশ কয়েক দিন।
দুই মাস ধরে মাঠে কোনো ব্যবসায়ী নেই। লোকজন কেনাকাটা করতে গিয়ে দেখেন, খালি মাঠ পড়ে আছে। মাঠের ভেতর পলিথিন দিয়ে মোড়ানো কয়েকটি খুপরি ঘর ছাড়া আর কিছু নেই।
মাঠে বাজার করতে যাওয়া আইনজীবী আলতাফ হোসেন জানান, তার বাসা নগরীর তোপখানা এলাকায়। গত কয়েক দিনে মাঠে বাজার করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। বাজারে গিয়ে দেখি ব্যবসায়ীরা নেই। তিনি বলেন, মাঠে বাজার থাকায় তারা অনেকটা সহজেই কেনাকাটা করতে পেরেছেন। এখন বাজার করতে হলে বন্দরবাজার বা লালবাজারে যেতে হবে।
এ ব্যাপারে হকার নেতা দুলাল পাঠান জানান, ওই মাঠে লোকজন যায় না। আর দোকানও বাঁশ আর পলিথিন দিয়ে মোড়ানো। সেখানে বসলে আমাদের অনেক লোকসান গুনতে হয়। এ কারণে হকারদের সেখানে ধরে রাখা যায়নি। যেখানে-সেখানে বসলে যানজটের সৃষ্টি হয়- এমন প্রশ্নের জবাবে দুলাল বলেন, আমাদেরও পেট-পিঠ আছে। আমাদের কেউ ঘরে খাবার দিয়ে যায় না।
গত কয়েক দিন নগরীতে বেড়েছে যানজট। সরেজমিন দেখা গেছে, ব্যস্ততম বন্দরবাজার ও জিন্দাবাজার সড়কের দু'পাশ হকারদের দখলে। সকালে নগর ভবনের প্রধান ফটকের সামনের ফুটপাত থাকে তালা-চাবি মেরামতকারীদের দখলে। আর রাতে চলে যায় সবজি বিক্রেতাদের দখলে। ফলে মানুষ চলাচল দূরে থাক, রাস্তায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়।
কুদরত উল্লাহ মার্কেট ও জিন্দাবাজারের প্রতিটি দোকানের সামনে অস্থায়ীভাবে পসরা সাজিয়ে বসেন হকাররা। এ ছাড়া আদালত পাড়া, জেলা প্রশাসকের বাসভবনের ফটক, পুলিশ সুপার কার্যালয়, বন্দরবাজার ফাঁড়ি, জেলা পরিষদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সামনের ফুটপাতও হকারদের দখলে। এ কারণে নগরবাসীর মধ্যে হকার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ ব্যাপারে সিলেট কল্যাণ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এহসানুল হক তাহের জানান, নগরীতে যানজট প্রকট আকার ধারণ করেছে। হকার বেড়েছে। তিনি বলেন, এসবের পেছনে কারা রয়েছে তাদের আগে বের করতে হবে। যারা ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করছে তারা কারা? তাদের পেছনের মদদদাতা কারা? তাদের শক্তি জোগাচ্ছে কে? এসব বের হলেই নগরীর যানজট নিরসন হবে বলে তিনি জানান।
এ ব্যাপারে সিলেট মহানগর উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) ফয়সল মাহমুদ সমকালকে বলেন, তালিকা অনুযায়ী আমরা তাদের দোকান করে দিয়েছি। তারা ব্যবসাও শুরু করে। তারা সেখানে নেই- বিষয়টি এখন জানলাম। বিষয়টি দেখে পরবর্তী ব্যবস্থা নেব।
এ ব্যাপারে সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী সমকালকে বলেন, অসংখ্যবার ফুটপাত দখলমুক্ত করতে অভিযান চালানো হয়েছে। যখনই অভিযান চালিয়েছি, তখনই পুনর্বাসনের দাবি উঠেছে। দাবির পরিপ্রেক্ষিতে হকাররা যাতে যেখানে সেখানে বসে ব্যবসা না করে, সেজন্য লালদীঘি মাঠে ব্যবস্থা করে দিয়েছি। পুনর্বাসন করার পরও তারা মাঠে বসছে না- এটি খুবই দুঃখজনক। আমি ওমরাহ হজে ছিলাম। এ কারণে বিষয়টি আমার কানে আসেনি। তাদের বলেছিলাম পুনর্বাসন করা হবে। আমি কথা রেখেছি। এখন তারা যদি সেখানে না বসে নগরীতে যানজট সৃষ্টি করে, সেটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।




বিষয় : সিলেটের লালদীঘি মাঠ ফাঁকা

মন্তব্য করুন