জামালপুরের সরিষাবাড়ীর আওনা ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামের বাসিন্দা ডা. মুরাদ হাসান। তার বাবা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মতিয়র রহমান তালুকদার। তিনি জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের কান্ডারি হয়ে দীর্ঘদিন সভাপতি ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। মা মনোয়ারা বেগম ওরফে মিনু একজন গৃহিণী। দুই ভাই এক বোন। বড় ভাই মাহমুদুল হাসান মিন্টু হাইকোর্টের বিচারপতি, আর বোন মমতাজ জাহান ডিজু। গ্রামের বাড়ি দৌলতপুরে হলেও জামালপুর শহরের নয়াপাড়ার একটি বাসায় তারা সপরিবারে বসবাস করেন। জামালপুর জিলা স্কুল থেকে ১৯৯০ সালে এসএসসি পাস করেন মুরাদ হাসান। এরপর ঢাকার নটর ডেম কলেজ থেকে এইচএসসি ও সর্বশেষ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন।
আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্রে জানা যায়, মুরাদ হাসান ১৯৯২ সালে নটর ডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর ১৯৯৩ সালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে পড়ালেখা শুরু করেন। মেডিকেলে পড়ার সময় কলেজ শাখা ছাত্রদলের রাজনীতি শুরু করেন। প্রচার সম্পাদকের দায়িত্বও পান। বিএনপি ক্ষমতায় থাকায় ওই সময় ছাত্রদলের রাজনীতিতে তুমুলভাবে জড়িয়ে পড়েন মুরাদ হাসান। তারপর রাজনীতির প্রেক্ষাপট বদলে ১৯৯৮ সালে ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক থেকে সরে এসে দাপটের সঙ্গে ছাত্রলীগে যোগ দেন মুরাদ। অল্প সময়ের মধ্যেই ছাত্রলীগের কর্মী বনে যান। পরে তিনি কলেজ শাখার সাংগঠনিক সম্পাদকের পদটি দখল করেন। এরপর ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতির পদ পেয়ে যান মুরাদ হাসান। তিনি ২০০১ সালে এমবিবিএস পাস করেন। ২০০৩ সালে আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য হন। এরপর জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও সরিষাবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য হন। ২০০০ সালের পর থেকে সরিষাবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জোরালো ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। বাবার যোগ্যতায় ৩৪ বছর বয়সে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে সংসদ নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন। এমপি হয়েই দলের মধ্যে গ্রুপিং তৈরি করেন। আধিপত্য বিস্তার করতে একটি ক্যাডার বাহিনীও গঠন করেন। ওই সময় তার ক্যাডার বাহিনীর তাণ্ডবে সরিষাবাড়ীতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল। তার ক্যাডারদের হাতে উপজেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মী লাঞ্ছিত হন। এরপর আওয়ামী লীগের এক জনসভায় দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাকের উপস্থিতিতে তার সফরসঙ্গীকে মারধর করে মুরাদের ক্যাডার বাহিনী। ২০২০ সালে জনসমক্ষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন মুরাদ হাসান। তার জন্য তাকে ক্ষমা চাইতে হয়। এ ছাড়া মুরাদ বাহিনী যমুনা সার কারখানার বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে অর্থ আদায় করত। তার গড়া সন্ত্রাসীরা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ লুট করেছে। তাদের তাণ্ডবে সরিষাবাড়ীর নেতাকর্মীরাসহ সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এতকিছুর পরও উপজেলা আওয়ামী লীগসহ অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের দলীয় পদপদবির নেতারা মুরাদ ও তার ক্যাডার বাহিনী নিয়ে কোনো কথা বলতে সাহস পাননি। সম্প্রতি রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম নিয়ে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তব্য দিয়ে আসছিলেন তিনি। সবকিছু মিলিয়ে মুরাদ হাসান দাম্ভিকতার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে ছিলেন।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছানোয়ার হোসেন বাদশা বলেন, মুরাদ হাসানকে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। মুরাদের পদত্যাগের কথা শুনে দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক খুশি দেখা গেছে। তাই তারা আনন্দ মিছিল, মিষ্টি বিতরণসহ কুশপুত্তলিকা দাহ করেছেন।
আনন্দ মিছিল, কুশপুত্তলিকা দাহ :ডা. মুরাদ হাসানকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার খবরে তার নির্বাচনী এলাকা জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে আনন্দ মিছিল করেছেন আওয়ামী লীগসহ অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। গতকাল মঙ্গলবার সকালে উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আল-আমিন হোসাইন শিবলুর নেতৃত্বে একটি আনন্দ মিছিল আরামনগর বাজার ট্রাক মালিক সমিতির মোড় থেকে শুরু করে উপজেলার প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা করা হয়। এ সময় বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা মুরাদ হাসানের কুশপুত্তলিকা দাহ করেন। একই সময় পৌর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম বিদ্যুতের নেতৃত্বে শিমলা বাজার থেকে আনন্দ মিছিল বের হয়। মিছিলটি আরডিএম স্কুল রোড ও বাস টার্মিনাল সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে বঙ্গবন্ধু চত্বরে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা করা হয়। এর আগে সোমবার রাতে তারাকান্দি শহীদ মিনার চত্বরে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রফিকুল ইসলামের কর্মী-সমর্থকরা আনন্দ মিছিল করেন। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে লোকজন পটকা ফুটিয়ে উল্লাস প্রকাশ করে। এদিকে মুরাদ হাসানের কর্মী-সমর্থকরা গা ঢাকা দিয়েছেন।