পিতৃহীন আসপিয়া ইসলাম কাজল (১৯) পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি পাবেন, অভাবের সংসারে ফিরবে স্বচ্ছলতা এমন স্বপ্নে বিভোর ছিল তার পরিবারের সবাই। কিন্ত স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে জটিলতার কারণে চাকরিটাই হচ্ছে না আসপিয়ার।

চাকরি হবে না জানতে পেরে বুধবার আসপিয়া ছুটে যান বরিশাল রেঞ্জের উপ মহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) এসএম আখতারুজ্জামানের কার্যালয়ে। সেখানে গিয়ে আসপিয়া চাকরি কেন পাবেন না, তা জানতে চান। জবাবে ডিআইজি তাকে বলেন, স্থায়ী ঠিকানা যেখানে সেই জেলা থেকে আবেদন না করার কারণে তাদের কিছু করার নেই।

নিয়োগ পরীক্ষার মেধা তালিকায় পঞ্চম হয়েও পুলিশের কনস্টেবল পদে নিয়োগ বঞ্চিত হচ্ছেন আসপিয়া। উত্তরাধিকার সূত্রে এ তরুণীর স্থায়ী নিবাস ভোলার চরফ্যাশন উপজেলায়। বাবার কর্মসূত্রে বরিশালের হিজলা উপজেলায় ভাড়া বাড়িতে জন্মগ্রহণ ও পড়াশোনা করায় তিনি আবেদনপত্রে স্থায়ী ঠিকানা হিজলা উপজেলা উল্লেখ করেন। এ ত্রুটির কারণে নিয়োগপত্র প্রদানের আগে পুলিশি তদন্তে আসপিয়ার নিয়োগ অযোগ্য বিবেচিত হয়। সরকারি চাকরি নামক সোনার হরিণটি হাতছাড়া হওয়ায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন আসপিয়া ও তার পরিবার। 

আসপিয়ার পরিবার হিজলার খুন্না-গোবিন্দুপুর গ্রামে মেজবাহউদ্দিন অপু চৌধুরীর বাড়িতে ভাড়া থাকেন। সেখানকার একাধিক বাসিন্দা জানান, তার বাবা শফিকুল ইসলাম চরফ্যাসন থেকে তিন দশক আগে হিজলায় এসে বসবাস শুরু করেন। তিনি ঠিকাদারি কাজ করতেন। ২০১৯ সালে তার মৃত্যু হয়। শফিকুল ইসলামের ৩ মেয়ে ১ ছেলের জন্ম ও লেখাপড়া হিজলাতেই। বাবার মৃত্যুর পর বড় ছেলে ঢাকায় পোশাক কারখানায় চাকরি নিয়ে সংসারের হাল ধরেন।

আসপিয়ার স্বজনরা জানান, ২০২০ সালে হিজলা ডিগ্রি কলেজ থেকে আসপিয়া উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। গত সেপ্টেম্বরে বরিশাল জেলায় পুলিশ কনেস্টেবলের শূন্যপদে জনবল নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলে আসপিয়াও আবেদন করেন। ১৪, ১৫ ও ১৬ নভেম্বর জেলা পুলিশ লাইনসে শারীরিক যোগ্যতা পরীক্ষা, ১৭ নভেম্বর লিখিত পরীক্ষা এবং ২৪ নভেম্বর একই স্থানে মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে মেধা তালিকায় পঞ্চম হন তিনি। পরে ২৬ নভেম্বর জেলা পুলিশ লাইনসে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সর্বশেষ ২৯ নভেম্বর ঢাকার রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ লাইনসে চূড়ান্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয় আসপিয়ার। সংসারের অভাব-অনটন লাঘবের স্বপ্নে নিয়োগপত্র পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। চূড়ান্ত নিয়োগের আগে পুলিশি তদন্তে ঘটে বিপত্তি।

আসপিয়ার নাম, ঠিকানা ও পরিচয় তদন্তের কাজ করেছেন হিজলা থানার উপ পরিদর্শক (এসআই) আব্বাস উদ্দিন। তিনি বলেন, আবেদনপত্রে দেওয়া স্থায়ী ঠিকানায় তদন্তে গিয়ে জানতে পারেন আসপিয়ার পরিবার সেখানে ভাড়া থাকে। হিজলায় তাদের জমিজমা নেই। তার দাদাবাড়ি ভোলার চরফ্যাশন উপজেলায়। বাবা শফিকুুল ইসলামের মৃত্যু হলে তাকে চরফ্যাশন উপজেলায় দাফন করা হয়। উত্তরাধিকার সূত্রে তাদের চরফ্যাশনের দাদা বাড়ি হচ্ছে স্থায়ী ঠিকানা।

এসআই আব্বাস উদ্দিন বলেন, আসপিয়ার জন্ম ও লেখাপড়া হিজলা উপজেলাতে। সে কারণে না বুঝে স্থায়ী ঠিকানা হিজলা উল্লেখ করেছেন। এসব বিষয় উল্লেখ করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন বলে এসআই আব্বাস উদ্দিন জানান।

এ বিষয়ে জানতে বৃহস্পতিবার দুপুরে আসপিয়া ইসলাম কাজলের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তিনি ও তার পরিবার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।

আসপিয়া বলেন, 'আমি যোগ্যতাবলে সাতটি ধাপ পেরিয়ে চূড়ান্ত নিয়োগের অপেক্ষায় ছিলাম। স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার কারণে আমার চাকরিটা হচ্ছে না। এজন্য আমি বুধবার দুপুরে ডিআইজি মহোদয়ের কাছে গিয়ে মিনতি জানাই চাকরিটি পাওয়ার জন্য। কিন্ত আইনি বাধা থাকায় কিছুই করার নেই বলে জানান ডিআইজি স্যার।'

বরিশাল রেঞ্জের উপ মহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) এসএম আখতারুজ্জামান বলেন, 'আসপিয়ার জন্য খারাপ লাগছে। সে অনেক মেধাবী। আসপিয়ার মতো মেধাবীদের পুলিশ বিভাগে পাওয়া গেলে ভাল হতো। কিন্ত পুলিশ বিভাগে নিয়োগ হয় জেলাভিত্তিক। অবশ্যই জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। কিন্ত আসপিয়া বরিশাল জেলার কোটায় আবেদন করলেও এই জেলার স্থায়ী বাসিন্দা নয়। তাই তাকে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের মানবিক প্রধানমন্ত্রী সদয় হয়ে যদি আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেন, তাহলে আসপিয়ার ভাগ্য খুলতে পারে।'

বরিশাল জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) মো. ইকবাল হোসাইন জানান, চাকরি বিধিমালায় স্পষ্ট উল্লেখ আছে, যে জেলা থেকে নিয়োগ পরীক্ষা দেবেন সে জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। নিয়োগপ্রত্যাশী ওই জেলার বাসিন্দা তার স্বপক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ থাকতে হবে। আসপিয়ার ক্ষেত্রে স্থায়ী ঠিকানা সঠিক পাওয়া যায়নি। তাই নিয়োগ বিধিমালায় যেভাবে উল্লেখ আছে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।