পৌনে দুই বছর পর পুনরায় অস্ত্রোপচার করে মনিরা খাতুনের পেট থেকে কাঁচিটি অপসারণ করা গেলেও তার সুন্দর জীবন ফিরিয়ে দেবে কে- সেটাই এখন তার মা ও ভাইয়ের একমাত্র প্রশ্ন।

মা রাহেলা বেগমের কান্না থামছেই না। ভাই কাইয়ুম মিয়ার কণ্ঠে ঝরছে অনবরত ক্ষোভ।

বর্তমানে ফরিদপুরের বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মনিরা খাতুন (১৯)। কাঁচি বের করার পরও এখনও সে বেশ অসুস্থ। গত শনিবার তার দ্বিতীয় দফা অস্ত্রোপচার হয়। চিকিৎসকরা বলছেন, তার স্বাভাবিক হতে সপ্তাহখানেক লাগবে।

হাসপাতালের দায়িত্বরত এক নার্স জানিয়েছেন, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় মলত্যাগের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন মনিরা। বিকল্প পথে পাইপ লাগিয়ে তার মলত্যাগের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

আক্ষেপের সঙ্গে মনিরার মা বলছিলেন, 'ডাক্তারদের কাছে এটা ভুল, কিন্তু আমাদের পরিবারে এটা সারা জীবনের কান্না।'

কাইয়ুম মিয়া বলেন, মনিরার জীবনটাই শেষ হয়ে গেল। পাঁচ মাস আগে তার স্বামী কাউকে কিছু না জানিয়ে আরেকটি বিয়ে করেছেন। অসুস্থতার কারণে দিন দিন শীর্ণ হয়ে পড়ছে তার বোন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রাহেলা বেগম জানান, এই দুই বছরে কবিরাজ, গ্রাম্য ডাক্তার, হুজুরের পানি পড়া- এমন কিছু নেই, যা তারা করেননি। কিন্তু কিছুতেই কাজ হয়নি। দিনে দিনে মেয়েটা চোখের সামনে ছটফট করেছে। এখন যে সে সুস্থভাবে হাঁটাচলা করতে পারবে, সেই নিশ্চয়তাও দিতে পারছেন না চিকিৎসকরা।

মনিরার প্রথম অস্ত্রোপচারের সময় ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। সেই খরচের ১৬ হাজার টাকা এখনও একটি এনজিও পাবে। সময়মতো কিস্তি পরিশোধ করতে না পারায় দুই মাস আগে মামলা দিতে চেয়েছিল সংস্থাটি। তার ওপর গত শুক্রবার মাসে ২০০ টাকা সুদে একজনের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা ধার করে তার পরিবার।

পরিবারটির একমাত্র উপার্জনক্ষম কাইয়ুম মিয়া গোপালগঞ্জে ইউকে ফুডের এসআর হিসেবে কাজ করেন। তার সামান্য আয় দিয়েই চলে উচ্চ মাধ্যমিক পড়ূয়া ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা, বোনের চিকিৎসা ও বাবা-মায়ের খরচ। বাবা খাইরুল মিয়া এখন অচল, আগে কৃষি কাজ করতেন।

পেটে কাঁচি রেখে অস্ত্রোপচার সম্পন্নের ঘটনায় তদন্ত কমিটি করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তিন সদস্যের এ কমিটির সভাপতি সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কামরুল হাসান। অপর দুই সদস্য হলেন- গাইনি বিভাগের অধ্যাপক কানিজ ফাতেমা ও সার্জারি বিভাগের কামরুজ্জামান। আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক সাইফুর রহমান। তার ভাষ্য, মনিরার অবস্থা উন্নতির দিকে।

ফরিদপুর জেলা আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় কমিটির সভায় ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। রোববারের এ সভায় সভাপতি জেলা প্রশাসক অতুল সরকার বলেন, 'আমরা নিবিড়ভাবে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি। এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট লিটন মিয়া হাসপাতালে গিয়ে মনিরার শারীরিক অবস্থার ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছেন। সিভিল সার্জন সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। চিকিৎসকের গাফিলতির কারণেই অনভিপ্রেত ঘটনাটি ঘটেছে।

ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমএ জলিল জানান, মনিরার পরিবারের সদস্যরা মানবিক সাহায্যের জন্য শুক্রবার রাতে পুলিশের কাছে এসেছিলেন। পুলিশ রাতেই তাকে হাসপাতালে ভর্তি ও অস্ত্রোপচারের ব্যাপারে সহায়তা করে।

মনিরা গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের ঝুটিগ্রামের বাসিন্দা। ফরিদপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০২০ সালের ৩ মার্চ তার অস্ত্রোপচার হয়। তখন একটি কাঁচি মনিরার পেটে রেখে সেলাই করে দেন চিকিৎসকরা।