ঢাকা শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪

এমপি হয়েই ঋণ কমেছে এনামুল হকের, বেড়েছে গাড়ি টাকা সম্পদ

এমপি হয়েই ঋণ কমেছে এনামুল হকের, বেড়েছে গাড়ি টাকা সম্পদ

এনামুল হক। ফাইল ছবি

সৌরভ হাবিব, রাজশাহী

প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৩ | ১৭:৫৩

রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনে সংসদ সদস্য হওয়ার আগে এনামুল হকের ঋণ ছিল ১১টি ব্যাংকে ৩৭ কোটি টাকার বেশি। ২০১৩ সালে এসে তিনি একেবারেই ঋণমুক্ত হয়ে যান। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে এসে ঋণ দেখালেও নিজের এবং স্ত্রীর সম্পদ বেড়েছে বহুগুণ। ২০০৮ সালে সংসদ সদস্য হওয়ার আগে তার কোন গাড়ি ছিল না। তবে সংসদ সদস্য হওয়ার পরই বেড়েছে তার গাড়ির বহর। দুই কোটি টাকার বেশি মূল্যের গাড়িও রয়েছে তার নামে।

সংসদ সদস্য হয়ে জাদুর কাঠি হাতে পাওয়া এনামুল হকের শৈশব কেটেছে হতদরিদ্র পরিবারে। এলাকাবাসী জানায়, অনেকের সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে পড়ার খরচ চালিয়েছেন এনামুল হক। ২০০৮ সালের নির্বাচনে হঠাৎ করেই তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে এমপি হয়ে যান। এরপরই বদলে যায় তার ধন সম্পদের হিসাবটাও। আগে তিনি ঢাকায় গার্মেন্টস ব্যবসা করতেন বলে এলাকার মানুষ জানত।

রাজশাহী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এনামুল হক ২০০৮ সালে নির্বাচনে জেতার আগে নিজের আয় দেখান বছরে ২০ লাখ টাকা। নির্ভরশীলদের আয় সাত লাখ ৫১ হাজার টাকা। নগদ টাকা দেখান ৫৮ লাখ ১৯ হাজার। স্ত্রীর নামে ৯ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। ব্যবসা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা ছিল এক লাখ ৩১ হাজার টাকা। কোম্পানির শেয়ার ছিল ৯ কোটি ২০ লাখ টাকার। স্ত্রীর ছিল দুই কোটি ৮০ লাখ টাকা। স্থায়ী আমানতে বিনিয়োগ ছিল নিজ নামে ১৫ লাখ ৭ হাজার টাকা। কৃষি জমি নিজ নামে সাত লাখ ২৫ হাজার টাকার এবং অকৃষি জমি এক লাখ ২৫ হাজার টাকার। আবাসিক ভবন দেখান ৩৫ লাখ টাকার। স্ত্রীর নামে ৩৩ লাখ টাকার। ২০০৮ সালের হলফনামায় এনামুল হক ১১টি ব্যাংকে একক, যৌথ ও প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান/পরিচালক হিসেবে ঋণ দেখান ৩৭ কোটি ৭৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকার। ২০০৮ সালে তার কোনো গাড়ি না থাকলেও ২০১৩ সালে এসে নিজের ও স্ত্রী দুজনেরই আলাদা গাড়ি হয়। ২০২৩ সালে নিজের নামেই তিনটি দামি গাড়ি। এর একটিরই দাম সোয়া দুই কোটি টাকার বেশি।

২০১৩ সালের হলফনামায় এনামুল হক কোনো ঋণই দেখাননি। মাত্র ৫ বছরে এমপি থেকেই তিনি পুরো ঋণমুক্ত হন। তবে ২০১৮ সালে আবারও তিনি ঋণ দেখানো শুরু করেন।

২০১৮ সালে এনামুল হক বাড়ি ভাড়া আয় দেখান ১৫ লাখ, ব্যবসা থেকে ২৪ লাখ, সংসদ ভাতা ১৬ লাখ টাকা দেখান। নগদ টাকা নিজ নামে দেখান ৩৬ লাখ ৭৬ হাজার ৫৯৮। স্ত্রীর নামে দেখান এক কোটি ১৩ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা অর্থ দেখান সাত লাখ ৮৭ হাজার ১১৪ টাকা। স্ত্রীর নামে দেখান চার লাখ টাকা। কোম্পানির শেয়ার এনামুলের নিজ নামে দেখান চার কোটি ৬৬ লাখ ৫০ হাজার। স্ত্রীর নামে শেয়ার দেখান সাত কোটি ৬৭ লাখ ১০ হাজার টাকা এবং নির্ভরশীলের নামে শেয়ার দেখান তিন কোটি ২৯ লাখ ৯০ হাজার টাকার। স্থায়ী আমানতে বিনিয়োগ দেখান নিজ নামে ৩৬ লাখ ১৮ হাজার ৯৫৬ টাকা। স্ত্রীর নামে ৭৫ লাখ ১৫ হাজার টাকা।

২০১৮ সালে এনামুল হক শুধু এনা বিল্ডিং প্রডাক্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আইএফআইসি ব্যাংক থেকে ঋণ দেখান ২১ কোটি ৯৭ লাখ ১৩ হাজার ৪৮৬ টাকা।

২০২৩ সালে এনামুল হক বাড়ি ভাড়া থেকে আয় দেখান ১৩ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। ব্যাংক আমানত দেখান ৫৫ লাখ ৬১ হাজার ৮৪২ টাকা। চাকরির সুবাদে আয় দেখান ৩২ লাখ তিন হাজার ৪৬ টাকা। সংসদ ভাতা দেখান ২৪ লাখ ৫১ হাজার ৩৮৩ টাকা। নিজের নগদ টাকা দেখান ২৫ লাখ টাকা। স্ত্রীর তিন লাখ টাকা। ব্যাংকে জমা অর্থ দেখান ১১ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। স্ত্রীর নামে জমা দেখান ৩২ লাখ ১০ হাজার ৪৪ টাকা। কোম্পানির শেয়ার নিজ নামে দেখান  চার কোটি ৬৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা। স্ত্রীর নামে দেখান সাত কোটি ৬৭ লাখ টাকার। নির্ভরশীলের নামে এক কোটি ৬৪ লাখ ৯০ হাজার টাকার। স্থায়ী আমানতে বিনিয়োগ স্ত্রীর নামে দেখান এক কোটি ৭৪ লাখ ৮৯ হাজার টাকা। 

২০০৮ সালে যেখানে একটি গাড়ি ছিল না, সেখানে ১৫ বছর এমপি থেকে ২০২৩ সালে নিজ নামে টয়োটা হার্ড জিপ দেখান ৬৩ লাখ ৪২ হাজার ৮০২ টাকার। মার্সিডিজ বেঞ্জ হার্ড জিপ দেখান দুই কোটি ১২ লাখ ৮৫ হাজার টাকার। টয়োটা হার্ড জিপ ৯০ লাখ টাকার। স্ত্রীর নামে ১২ লাখ ৭০ হাজার টাকার টয়োটা জিপ দেখান। নিজের নামে সাড়ে চার লাখ টাকার ৪০ তোলা এবং স্ত্রীর নামে ৪০ তোলা স্বর্ণ উপহার দেখান। দুই লাখ ৬০ হাজার টাকার ইলেকট্রনিক সামগ্রী দেখান। আববাবপত্র দেখান দুই লাখ টাকার। স্ত্রী তহুরা হকের অন্যান্য ব্যক্তিগত ঋণ প্রদান দেখান ৫৯ লাখ টাকার। কৃষি জমি দেখান নিজ নামে এক কোটি ২৬ লাখ ৫৫ হাজার ৯১৯ টাকার। স্ত্রীর ১৫ হাজার টাকার। অকৃষি জমি দেখান ৬৯ লাখ ৪৮ হাজার টাকার। স্ত্রীর নামে এক লাখ ২০ হাজার টাকার। আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন দেখান ৩৫ লাখ টাকার। স্ত্রীর নামে দেখান ৩৪ লাখ ২৫ হাজার টাকার। ২০২৩ সালে এসে আইএফআইসি ব্যাংকে ঋণ দেখান ৩২ কোটি ৮৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা। 

২০০৮ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য হন এনামুল হক। এসময় বারবার নারী কেলেংকারিসহ অনিয়ম, দুর্নীতি, নিয়োগ ও মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এবছর তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েও পাননি। ফলে নির্বাচন করছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে।

এ বিষয়ে কথা বলতে এনামুল হকের ফোন নম্বরে একাধিকবার কল করেও বন্ধ পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন

×