বহুতল একটি ভবন নির্মাণের সময় মালিকপক্ষকে আটটি স্তরে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হয়। এগুলো হচ্ছে- ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র, নির্মাণ অনুমোদন, নির্মাণকাজ শুরু অবহিতকরণ ও কারিগরি ব্যক্তিদের সম্মতিপত্র, ভবনের ভিত্তিস্তম্ভ পর্যন্ত কাজ সম্পর্কে কারিগরি ব্যক্তিদের প্রতিবেদন, ভবনের নির্মাণকাজ সমাপ্তি অবহিতকরণপত্র, কারিগরি ব্যক্তিদের প্রত্যয়নপত্র ও ব্যবহার সনদপত্র। আবার পাঁচ বছর পর ব্যবহার সনদপত্র নবায়ন করতেও সিডিএর অনুমোদন লাগে। এত ধাপ থাকার পরও চট্টগ্রামে খালপাড়েই গড়ে উঠেছে শতাধিক বহুতল ভবন। সিডিএর নির্লিপ্ততায় তৈরি হওয়া এমন 'ভেজাল ভবন' নিয়ে এখন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পাঁচ হাজার ৬১৬ কোটি টাকায় নেওয়া জলাবদ্ধতার জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প।
অবৈধ এসব ভবনের কিছুর অনুমোদনই নেই। আবার কিছু ভবন এক রকমের নকশা নিয়ে তৈরি করা হয়েছে আরেক নকশায়। এখন এসব ভবন ভাঙতে গিয়েও আসছে বাধা। কেউ কেউ যাচ্ছেন আদালতে। এসব বাধায় গতি হারাচ্ছে জলাবদ্ধতার প্রকল্প। চার বছর আগে গ্রহণ করা এ প্রকল্পটি ছয় মাস পর ২০২২ সালের জুনে সমাপ্ত হওয়ার কথা। অথচ এখন পর্যন্ত কাজ হয়েছে ৬০ শতাংশ। অবৈধ ভবন ভাঙতে গিয়ে যে হারে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে, তাতে করে এ প্রকল্প কত বছরে শেষ হবে তা নিয়েই ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম মহানগর ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা, ২০০৮ অনুযায়ী নগরে ভবন নির্মাণের যাবতীয় অনুমোদন দেয় নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। খালপাড়ে কোনো নকশা অনুমোদনের সময় তা নিয়ম অনুযায়ী ১২ ফুট দূরে নির্মাণ করার কথা। কিন্তু চট্টগ্রামের খালপাড়ে গড়ে ওঠা কোনো ভবনই মানেনি এ নিয়ম। চট্টগ্রামের মাঝিরঘাটে যে তিনটি ভবন সোমবার রাতে হেলে পড়ে, সেগুলোও মানেনি এ নিয়ম। খালপাড় ঘেঁষে এসব ভবন গড়ে ওঠায় প্রকল্পের কাজ করার সময় এগুলো হেলে পড়ে। একই রকমের ঝুঁকি নিয়ে নগরের অন্যান্য খালের পাড়ে আছে শতাধিক ভবন।
চট্টগ্রামের খুলশী এলাকায় গয়নাছড়া খালের ওপর ১৮ তলা একাডেমিক ভবন করেছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউএসটিসি। রাজাখালী খালের ওপর ছয়তলা ভবন করে পরিচালিত হচ্ছে জেপিআর নামে একটি গার্মেন্ট কারখানা। চাক্তাই খালের ওপর ৯ তলা ভবন করে তৈরি করা হয়েছে মান্নান মার্কেট। চট্টগ্রামে এমন কোনো খাল নেই, যেখানে গড়ে ওঠেনি অবৈধ ভবন। চাক্তাই খালের দু'পাড়ে দুই কিলোমিটারের মধ্যে এমন অবৈধ বহুতল ভবন আছে অন্তত এক ডজন। রাজাখালী খালের শুরু থেকে বাকলিয়া থানা পর্যন্ত তিন কিলোমিটারের মধ্যে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বহুতল ভবনে হয়েছে মার্কেট। চলছে গার্মেন্টও। নাছির খালের পাড়ে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে একাধিক বহুতল আবাসিক ভবন। পশ্চিম বাকলিয়ার সৈয়দ শাহ রোডে শাখা খালের ওপর গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন 'আজিজ মঞ্জিল'। ১৫০৯ হোল্ডিং নম্বরের এ ভবনে চলছে আজিজিয়া দারুল আরকাম তাহফিজুল কোরআন মাদ্রাসা ও মসজিদ। ঝুঁকি নিয়ে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে এ ভবনে। হালিশহর ও সিডিএতেও খালের ওপর অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে একাধিক বহুতল ভবন। হালিশহরের বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাতে বহুতল একটি ভবনের কারণে আটকে আছে জলাবদ্ধতা প্রকল্পের কাজ। এই ভবনের মালিকরা আদালতে মামলা করেছেন। ১৮ তলা ভবন রক্ষা করতে একইভাবে আদালতে গেছে ইউএসটিসি কর্তৃপক্ষ।
জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও প্রকল্প পরিচালক মো. শাহ আলী সমকালকে বলেন, প্রকল্পের আওতায় ৩৫টি খাল থেকে এরই মধ্যে প্রায় ৩২ হাজার অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। উচ্ছেদ হওয়া এসব স্থাপনার বেশিরভাগই ছিল সেমিপাকা কিংবা একতলা দালান। কিন্তু বহুতল ভবন উচ্ছেদ করতে গিয়ে আমাদের নানা বাধার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কেউ কেউ দ্বারস্থ হচ্ছেন আদালতের। এ জন্য প্রত্যাশিত গতিতে কাজ শেষ করতে পারছি না। খালপাড় দখল করে শতাধিক বহুতল ভবন উঠল কী করে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটি তদারকির দায়িত্ব ছিল সিডিএর। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে চাই না।
সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী হাসান বিন শামস বলেন, অনুমোদন না নিয়েও কিছু ভবন ওঠানো হয়েছে। আবার কিছু ভবন এক রকমের নকশা দিয়ে ভবন তুলেছে অন্য নকশায়। এসব ভবনের অনেকগুলো আমরা চিহ্নিত করেছি। কয়েক হাজার ভবন উচ্ছেদও করেছি। জনবল সংকটের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান চালানো যাচ্ছে না। কিছুটা সময় লাগলেও অবৈধ কোনো বহুতল ভবন থাকবে না নগরে।
অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন ২০০৩ এবং বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ২০১২ অনুযায়ী সাততলা বা তার ওপরে ভবনগুলোকে বহুতল বলা হচ্ছে। আবার ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় বলা হয়েছে, ১০ তলা বা ৩৩ মিটারের ঊর্ধ্বে যে কোনো ভবন হচ্ছে বহুতল। আইনগত এই অসংগতির কারণে ৭, ৮ ও ৯ তলা ভবনগুলোকেও কখনও কখনও বহুতল ভবন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। খাল দখল করে চট্টগ্রামে গড়ে উঠেছে এমন শতাধিক বহুতল ভবন। এসব ভবনের অধিকাংশ চউক থেকে অনুমোদন নিয়েই গড়ে তোলা হয়েছে। তবে কেউ কেউ অনুমোদনকৃত নকশার বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত তলা সংযোজন করেছে। নিয়মানুযায়ী এগুলো তত্ত্বাবধান করার কথা সিডিএর। কিন্তু অভিযোগ আছে, অর্থের বিনিময়ে ম্যানেজ হওয়ায় এ নিয়ম মানছে না খোদ সিডিএ। চট্টগ্রামের মাঝিরঘাটে যে ভবনটি হেলে পড়েছে, তার অনুমোদন আছে বলে দাবি করেছে তিনতলা ভবনটির মালিক স্বপন দাশ। তিনি বলেন, সিডিএর অনুমোদন নিয়েই এ ভবন নির্মাণ করেছি। তিন থেকে চার বছর আগে পূর্বপুরুষের ভিটাতেই হয়েছে ভবনটি। কিন্তু জলাবদ্ধতা প্রকল্পের কাজ করতে গিয়ে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা না নেওয়ায় এখন হেলে পড়েছে ভবনটি। অভিন্ন দাবি নিয়ে পাশের আরেকটি ভবনের মালিক রাখাল দাশ সমকালকে বলেন, লোহার পাতগুলো পোতার সময় তীব্র ভাইব্রেশন তৈরি হয়। এ জন্য ভবনে ফাটল দেখা দিচ্ছে। আমাদের তিনতলা ভবনটি ভেঙে ফেলতে হয়েছে। সিডিএ কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়নি। এদিকে, ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গাও অধিগ্রহণ ছাড়া জোরপূর্বক প্রকল্পের আওতায় আনা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। আদালতে বিচারাধীন অবস্থায় জায়গার দখলও নিয়ে নিচ্ছে প্রকল্প-সংশ্নিষ্টরা- গণমাধ্যমের কাছে আসছে এমন অভিযোগও। তাদেরই একজন মুহাম্মদী টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ মাহফুজ সামদানী। তিনি বলেন, ষোলশহর শিল্প এলাকায় গড়ে ওঠা আমাদের টেক্সটাইল মিলের দুই একর জায়গা আছে। আমরা এটির বৈধ মালিক; কিন্তু জলাবদ্ধতা প্রকল্পের জন্য এখন আমাদের কাছ থেকে জায়গা নেওয়া হচ্ছে। আইনি প্রতিকার পেতে আদালতে গেছি। আগামী মাসে শুনানি আছে। কিন্তু এর মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার আমাদের সীমানা দেয়াল ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সিডিএসহ বিভিন্ন দপ্তরে গিয়েও বিষয়টির সমাধান পাইনি।'
অভিযোগ অস্বীকার করে সিডিএর অথরাইজড অফিসার মো. হাসান সমকালকে বলেন, অনুমোদিত নকশায় ভবনগুলো তৈরি হয়নি। তাই এগুলো হেলে পড়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো ভাঙতে এখন পদক্ষেপ নেবে সিটি করপোরেশন।

বিষয় : অবৈধ বহুতল ভবন

মন্তব্য করুন