কক্সবাজারে সপরিবারে বেড়াতে গিয়ে এক নারী সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত বুধবার সৈকতের লাবনী পয়েন্ট থেকে তুলে নিয়ে স্বামী ও সন্তানকে জিম্মি করে দুই দফায় তিন যুবক ধর্ষণ করে বলে ওই নারী জানিয়েছেন। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়েছে। সাত আসামির মধ্যে তিনজনকে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে শনাক্ত করেছে র‌্যাব।
শনাক্ত প্রধান আসামি আশিকুল ইসলাম আরও ১৬টি মামলার আসামি। তার সহযোগী ইসরাফিল হুদা জয়ের বিরুদ্ধে দুটি মামলা রয়েছে। তাদের রাজনৈতিক সম্পৃক্তিও রয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে তারা সৈকত এলাকায় নানা অপকর্ম করেও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। স্থানীয় এমপি সাইমুম সরওয়ার কমল এবং জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি এস এম সাদ্দাম হোসাইনের সঙ্গে তাদের ছবি পাওয়া গেছে। সাদ্দাম স্বীকার করেছেন, জয় ছাত্রলীগের কর্মী। সংগঠনের কর্মসূচিতে অংশ নেয়।
আশিক ও জয়ের বাসা শহরের বাহারছড়া এলাকায়। সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, কক্সবাজারে একটি সন্ত্রাসী চক্রের নেতা আশিক। এ চক্রের সদস্য সংখ্যা ৩২। তারা দুই-তিনজনের দলে বিভক্ত হয়ে অলিগলি ও সৈকত এলাকায় ছিনতাই, চাঁদাবাজি, হত্যাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে বেড়ায়।
কক্সবাজার পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সমকালকে জানান, ধর্ষণের ঘটনায় যাদের নাম এসেছে, তারা এলাকার চিহ্নিত অপরাধী। নানা ফাঁদ পেতে পর্যটকদের ফাঁসিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয় তারা। ওই নারীর ওপর পাশবিক নির্যাতনের পাশাপাশি তার কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা চাঁদাও দাবি করেছিল চক্রটি।
এরই মধ্যে পুলিশ ভুক্তভোগী নারী ও তার স্বামীর বক্তব্য নিয়েছে। ওই নারী জানিয়েছেন, তার গ্রামের বাড়ি গাজীপুরে। আর তার স্বামীর বাড়ি কিশোরগঞ্জে। ঢাকার জুরাইন এলাকায় তারা বসবাস করেন।
ট্যুরিস্ট পুলিশের এসপি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা জানান, এরই মধ্যে এ ঘটনায় প্রযুক্তিগত তদন্ত তারা শুরু করেছেন। গত তিন মাসে আরও তিনবার ওই নারী কক্সবাজার এসেছেন।
আশিকুল ইসলাম ফেসবুক প্রোফাইল ঘুরে দেখা গেছে, সে নিয়মিত রাজনীতিকদের সঙ্গে ছবি দিত। ছিনতাইকারী হিসেবে তার কুখ্যাতি থাকলেও সৎ উপার্জন ও সৎপথে চলার হিতোপদেশ দিত। গত ২৫ জুন সাইমুম সরওয়ার কমলের সঙ্গে ছবি দিয়ে তার আরোগ্য কামনা করে।
ভুক্তভোগী নারীকে গত বুধবার রাত দেড়টার দিকে কক্সবাজারের জিয়া গেস্ট ইন থেকে উদ্ধার করে র?্যাব। এ ঘটনায় হোটেল ম্যানেজারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। ওই নারী সাংবাদিকদের বলেন, বুধবার সকালে ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে স্বামী-সন্তানসহ কক্সবাজারে বেড়াতে যান তারা। শহরের হলিডে মোড়ের একটি হোটেলে ওঠেন। সেখান থেকে বিকেলে যান সৈকতের লাবনী পয়েন্টে। সেখানে অপরিচিত এক যুবকের সঙ্গে তার স্বামীর ধাক্কা লাগলে কথাকাটাকাটি হয়। এর জেরে সন্ধ্যার পর পর্যটন গলফ মাঠের সামনে থেকে তার আট মাসের সন্তান ও স্বামীকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে কয়েকজন তুলে নিয়ে যায়। এ সময় আরেকটি অটোরিকশায় তা?কে তুলে নেয় তিন যুবক। পর্যটন গলফ মাঠের পেছনে একটি ঝুপড়ি চায়ের দোকানের পেছনে নিয়ে তাকে ধর্ষণ করে তারা।
ওই নারী জানান, এর পর তাকে নেওয়া হয় জিয়া গেস্ট ইন নামে একটি হোটেলে। সেখানে ইয়াবা সেবনের পর আরেক দফা ধর্ষণ করে ওই তিন যুবক। ঘটনা কাউকে জানালে সন্তান ও স্বামীকে হত্যার হুমকি দিয়ে কক্ষের বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে চলে যায় তারা।
ভুক্তভোগী নারীর ভাষ্য, জিয়া গেস্ট ইনের তৃতীয় তলার জানালা দিয়ে তিনি রাস্তায় হেঁটে যাওয়া এক যুবকের সহায়তা চান। পরে তিনি এসে কক্ষের দরজা খুলে তাকে বের করেন। এরপর সহায়তা চেয়ে ৯৯৯-এ ফোন করেন। কিন্তু সহায়তা পাননি; বরং থানায় গিয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর তিনি হোটেলের সামনে থাকা সাইনবোর্ড থেকে র?্যাবের নম্বর পেয়ে ফোন করেন। র‌্যাব তাকে উদ্ধার করে।
ওই নারী জানান, তাকে তুলে নিয়ে যে ঝুপড়ি চায়ের দোকানে ধর্ষণ করা হয়েছে, সেটি শহরের গলফ মাঠের পশ্চিম দিকে ঝাউবনের পাশে। দোকান মালিক ছেনুয়ারা বেগম নামের এক নারী। দোকানের পেছনে কয়েকটি খুপরি ঘর পরিবহন চালক শ্রমিকদের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়। এলাকাটি নির্জন।
ছেনুয়ারা বেগম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, গত বুধবার রাত ৮টার দিকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে এক নারীকে নিয়ে আসে আশিক ও জয়। তাদের সঙ্গে আরও একজন ছিল, যাকে তিনি চেনেন না। আশিক ও জয় প্রায়ই তার দোকানে আসত। দোকানের পেছনে ঘরে নারীটিকে নিয়ে যায় তারা। আধঘণ্টা পর আশিক-জয়রা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে বেরিয়ে যায়। তখন ওই নারী এসে জানান, তার স্বামী-সন্তানকে আটকে রাখা হয়েছে। তাদের ছেড়ে দিতে আশিকের কাছে সুপারিশ করার অনুরোধ জানান। এর কয়েক মিনিট পরে ওই নারী অটোরিকশায় চড়ে কবিতা চত্বরের দিকে চলে যান।
জিয়া গেস্ট ইনের রেজিস্ট্রার অনুযায়ী, ভুক্তভোগী নারীকে নিয়ে আশিক রাত ৯টা ৮ মিনিটে সেখানে যায়। সিসিটিভির ফুটেজ অনুযায়ী ৪০ মিনিট পর বেরিয়ে যায় আশিক। এর কয়েক মিনিট পর ওই নারী বেরিয়ে আসেন।
ওই সময়ে হোটেলের দায়িত্বে থাকা রিয়াজুদ্দিন ছোটনকে আটক করেছে র‌্যাব। র‌্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, আশিকের সঙ্গে আগে থেকেই সখ্য ছিল ছোটনের।
ভুক্তভোগী নারীর স্বামী বলেন, 'সামান্য ধাক্কা লাগার কারণে তারা আমার এত বড় ক্ষতি করল। অপরিচিত বলে শহরের বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে গেলেও সে জায়গা এবং দুর্বৃত্তদের চিনতে পারিনি।'
মামলায় কক্সবাজার শহরের বাহারছড়া এলাকার আশিকুল ইসলাম এবং তার প্রতিবেশী ও বন্ধু ইসরাফিল হুদা জয় এবং হোটেল জিয়া গেস্ট ইনের ম্যানেজার রিয়াজুদ্দিন ছোটনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও দু-তিন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মুনীর উল গীয়াস জানান, মামলাটির তদন্ত করবে পর্যটন পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, নারী পর্যটককে ধর্ষণে জড়িত বলে যাদের শনাক্ত করা হয়েছে, তারা কক্সবাজার শহরের বাহারছড়া এলাকার আশিকুল ইসলাম ও বন্ধু ইসরাফিল হুদা জয়। শহরে চুরি, ছিনতাই, ধর্ষণ, মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু মামলা রয়েছে। একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়ে জেলেও ছিল আশিক।
সর্বশেষ গত ১৫ নভেম্বর জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে আশিকুল ইসলাম। সে শহরের মধ্য বাহারছড়া এলাকার মৃত আবদুল করিমের ছেলে। ইসরাফিল হুদা জয় একই এলাকার মো. শফির ছেলে। তারা দু'জনই বন্ধু ও একই সন্ত্রাসী দলের সদস্য। এর আগে কক্সবাজার র‌্যাব-১৫-এর সিপিসি কমান্ডার মেজর মেহেদী হাসান বলেন, এখন পর্যন্ত তিনজনের মধ্যে দু'জন শনাক্ত হয়েছে। তাদের ধরতে অভিযান চলছে।
ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত যুবকের সঙ্গে ছবি তোলা প্রসঙ্গে সংসদ সদস্য কমল সমকালকে বলেন, সে সময়ে তিনি করোনা আক্রান্ত ছিলেন। আশিককে তিনি চেনেন না। কোনো একদিন হয়তো পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছে। এমপিদের সঙ্গে কত লোকই তো এভাবে ছবি তোলে! সবাই তো চেনা হয় না।
ছবিটি এমপির বাড়িতে তোলা বলে জানা গেছে। অপরিচিত কারও সঙ্গে বাড়িতে ছবি তোলেন কিনা- এ প্রশ্নে সাইমুম সরওয়ার বলেন, 'আসলে আমি মনে করতে পারছি না, কবে কোন ছেলে এসে ছবি তুলেছে। আশিক নামের কাউকে মনেও করতে পারছি না।'
ফেসবুকে ইসরাফিল হুদা জয়ের সঙ্গে কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি এসএম সাদ্দাম হোসাইনকে পাওয়া গেছে। সাদ্দাম হোসাইন সমকালকে বলেছেন, আশিককে চেনেন না। ইসরাফিল হুদা জয়ের সঙ্গে ফেসবুকে তার আট-দশটি ছবি রয়েছে। তবে জয়ের কোনো পদ নেই ছাত্রলীগে।
ছাত্রলীগ সভাপতির ভাষ্য, কত লোকই তো তার সঙ্গে ছবি তোলে। কে কী করে, তার সব খবর কি রাখা সম্ভব?
গতকাল এক বিবৃতিতে এ ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম ও সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু। জাতীয় নারী আন্দোলনের সভাপতি মিতা রহমান ও সাধারণ সম্পাদক নাজমা আক্তারও একই দাবি জানিয়েছেন।