আমরা ক্ষুব্ধ। আমরা দেখছি, সমাজ যেন মানুষরূপী দানবদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে। আবারও ঘটেছে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের বর্বরোচিত ঘটনা; দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজারে। ২২ ডিসেম্বর রাতে স্বামী ও শিশুসন্তানকে নিয়ে সৈকত শহর কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক নারী। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, কক্সবাজারের বাহারছড়ার আশিকুল ইসলাম ওরফে আশিকের নেতৃত্বে পাশবিক ঘটনাটি ঘটেছে। জানা গেছে, অপরাধের মূল হোতা আশিকুল ঘটনার দুই সপ্তাহ আগে জামিনে কারাগার থেকে বের হয়েছে। কক্সবাজার সদর মডেল থানায় তার বিরুদ্ধে হত্যা, ছিনতাই, নারী ও শিশু নির্যাতন, অস্ত্র, মাদকসহ ১৬টি মামলা রয়েছে। সংবাদমাধ্যমে এও বলা হয়েছে, আশিকের নেতৃত্বে কক্সবাজার শহরে একটি সন্ত্রাসী বাহিনী রয়েছে, যাদের দাপটে পর্যটকরা তো বটেই, স্থানীয় লোকজনও তটস্থ!

এই বার্তাগুলো প্রশ্ন দাঁড় করায়- যার বা যাদের দুর্বৃত্তপনার নানা তথ্য সাংবাদিকদের কাছে রয়েছে, তাদের ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসন কি কিছুই জানে না? কেন তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে এত উদাসীনতা কিংবা অনীহা? কক্সবাজারের ঘটনা যেসব বার্তা দিয়েছে তা যে কোনো সভ্য-মানবিক সমাজে কোনোভাবে প্রত্যাশিত নয়। কক্সবাজার সৈকতের মতো জনসমাগমস্থল থেকে যে নারীকে তুলে নিয়ে তার স্বামী ও সন্তানকে জিম্মি করে দুই দফায় তিন দুর্বৃত্ত ধর্ষণ করে একটি রিসোর্টে আটকে রেখেছিল, তাতে সহজেই প্রতীয়মান- তাদের ক্ষমতার শিকড় কত গভীরে। তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সখ্যের খবরও সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। ২৪ ডিসেম্বর সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা ছাত্রলীগ সভাপতির সঙ্গে তাদের ছবি পাওয়া গেছে। ওই ছাত্রলীগ সভাপতিও স্বীকার করেছেন, দুর্বৃত্তদের একজন ইসরাফিল হুদা জয় সংগঠনের সক্রিয় কর্মী। জানা গেছে, বাকি দু'জনের মাথাও রাজনৈতিক ক্ষমতাবানদের হাত স্পর্শিত।

২৪ ডিসেম্বর সমকালেরই আরেকটি প্রতিবেদনে প্রকাশ, কক্সবাজারে ঘটনার ব্যাপক সমালোচনার মধ্যেই দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে এক এসএসসি পরীক্ষার্থী, যশোরের কেশবপুরে এক গৃহবধূ, বান্দরবানের লামায় এক প্রবাসীর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী এবং হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে এক প্রতিবন্ধী তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। প্রায়ই এমন খবর সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে। তবে আমরা এও জানি, খবরের আড়ালেও খবর থাকে এবং সব খবরই সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে না। কক্সবাজারে পুলিশের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সমকালের প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, ওই ধর্ষণের ঘটনায় যাদের নাম এসেছে, তারা এলাকার চিহ্নিত অপরাধী। তাদের আরও অনেক দুস্কর্মের কথা তিনি জানিয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে- জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায় যাদের, তাদের এসব জানা থাকা সত্ত্বেও দুস্কর্মকারীরা সমাজে যদি দাপিয়ে বেড়াতেই থাকে, তাহলে পরিস্থিতি শান্তিপ্রিয় মানুষের বসবাসের কতটা অনুকূলে থাকতে পারে? যাদের দুস্কর্ম সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীলরা জ্ঞাত, তাদের বিচরণ সমাজে এত নির্বিঘ্ন হয় কী করে- এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায় কি তারা এড়াতে পারেন?


আমরা জানি, নীতি-আদর্শবিবর্জিত এক শ্রেণির রাজনীতিকের ছায়াতলে অনেক দুর্বৃত্ত নির্বিঘ্নে দুস্কর্ম চালিয়ে যাচ্ছে দাপটে। তাদের দাপিয়ে বেড়ানোর পেছনের যে শক্তি মদদ জোগায় তাতে কক্সবাজারের জয়, আশিকুল, রিয়াজুদ্দিনরা সামজে বেড়ে ওঠার উর্বর ভূমি পেয়ে যায়। ১৬টি গুরুতর অপরাধের মামলার আসামি আশিকুলের মতো আরও অনেকেই কীভাবে চক্র গড়ে জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে আছে, তা যেমন সমাজের সচেতনরা জানেন, তেমনি জানেন প্রশাসনের দায়িত্বশীলরাও। মানুষ তো আইন হাতে তুলে নিতে পারে না; তা উচিতও নয়। কিন্তু যাদের আইন প্রয়োগে আইনি কাঠামোবদ্ধ ক্ষমতা রয়েছে, তারা কী করছেন? আমরা দেখছি, অনেক অপরাধী ধরা পড়লেও তাদের কেউ কেউ কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা যাচ্ছে। তাতে শুধু আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া-প্রয়োগেই বিঘ্ন ঘটছে না; একই সঙ্গে ঘটনার উৎস সন্ধানক্রমে প্রতিকারের পথও রুদ্ধ হয়ে পড়ছে। আমরা আশা করব, কক্সবাজারের ঘটনায় চিহ্নিত অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে এর উৎস সন্ধান করে দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার নিশ্চিত করা হবে। এমন কোনো কিছু যাতে না ঘটে এবং বিচার প্রক্রিয়া কিংবা উৎস সন্ধানের পথ রুদ্ধ যেন না হয়- এ ব্যাপারে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।

আমরা জানি, ধর্ষকের সর্বোচ্চ দণ্ডের বিধান রেখে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এর পরও ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মতো অপরাধের লাগাম টানা যাচ্ছে না। গণপরিবহন, রাস্তাসহ নানা ক্ষেত্রে ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা বিগত তিন-চার বছরে কম ঘটেনি। ধর্ষণোত্তর হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনা বলে দেয়, নারীর জন্য পথ এখনও কতটা বিপদসংকুল। গত এক দশকে আমাদের অনেক উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু এই উন্নয়নের সঙ্গে যদি মানবিক বোধের সমুন্নত ধারণা ব্যক্তির মধ্যে না থাকে, তাহলে তা বিশ্বজুড়ে মানুষের সামনে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্র বিস্তৃত হবে। প্রশ্ন হচ্ছে- কেন এমন বর্বরোচিত-পাশবিকতার মুখোমুখি আমাদের হতে হচ্ছে? আমাদের সংকট কোথায়? আমি মনে করি, এ জন্য দায়ী বিকৃত মানসিকতা, রাজনীতির নামে অপরাজনীতি চর্চাকারীদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, মূল্যবোধের অবক্ষয়, পারিবারিকভাবে নৈতিক শিক্ষার অভাব এবং বিলম্বিত বিচার কিংবা বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি। কক্সবাজারের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি মনে করি। কারণ, তাদেরই দায়িত্বশীল কেউ কেউ আশিকুল চক্রের দুস্কর্মের খতিয়ান সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরেছেন। যেহেতু তারা তাদের সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন, তাহলে কেন আগেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? পর্যটনের বিকাশে সরকার যখন নানা উদ্যোগ নিচ্ছে, তখন কক্সবাজারের মতো পর্যটন কেন্দ্র, যেখানে যাওয়ার জন্য দেশি-বিদেশিদের আগ্রহ অনেক বেশি, এমতাবস্থায় এই ঘটনা বড় রকমের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াল। দেশের অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন আছে ব্যাপক। এ পরিস্থিতিতে পর্যটনকে আমরা শিল্প হিসেবে কীভাবে দাঁড় করাব?

আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে দুস্কর্ম প্রতিরোধের জায়গায় ব্যক্তির মূল্যবোধ গড়ে তোলার বিষয়টি পুঙ্খনাপুঙ্খরূপে দেখাও জরুরি। ৬০ বছরের বৃদ্ধের ৭ বছরের শিশুকে ধর্ষণ; মাদ্রাসার অধ্যক্ষের তারই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নে অতিষ্ঠ করে তুলে পৈশাচিক কায়দায় হত্যার ঘটনা দূর অতীতের নয়। যারা এমন গুরুতর অপরাধ করেছে তাদের নৈতিকতা, ধর্মীয় অনুভূতি যে শূন্যের কোঠায়- এরও ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ নিষ্প্রয়োজন। আমরা কি সব সময় সরকার কিংবা আদালতের দিকে তাকিয়ে থাকব? তাহলে ব্যক্তি হিসেবে আমাদের মানবিক সচেতনতার জায়গাটি কোথায়? সবকিছুর আগে আমাদের সামাজিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের পথ রুদ্ধ করতে হবে। প্রশাসনের স্তরে স্তরে দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সমভাবে জরুরি। সরিষার ভেতরে লুকিয়ে থাকা ভূত তাড়াতে হবে। ধর্ষণ, হত্যাসহ নানা অপরাধের সঙ্গে আইনি সংস্থার অনেকের আমরা সম্পৃক্ততা দেখেছি। প্রশাসনের দায়িত্বশীল ও সমাজের প্রতিনিধিদের মধ্যে সম্পর্ক নিবিড় করতে হবে, যাতে একে অপরের প্রতি সহায়তার হাত প্রসারিত করে অন্ধকার দূর করতে যূথবদ্ধভাবে কাজ করতে পারেন।

আমরা যেন ভুলে না যাই, ব্যক্তি কোনো একক সত্তা নয়; সামাজিক সমষ্টিরই অংশ। বিচার না পেয়ে ধর্ষিত, নির্যাতিতদের অপমান-লজ্জায় আত্মহননের পথে পা বাড়াতেও আমরা দেখেছি। কক্সবাজারে দুর্বৃত্তদের ছোবলাক্রান্ত নারী যাতে দ্রুত ন্যায়বিচার পান, তা নিশ্চিত করার দায় রাষ্ট্রযন্ত্রের। অপরাধীদের সামনে যদি এই বার্তা থাকে- অপরাধ করে ছাড় পাওয়া যাবে না, তাহলে অপরাধের ক্ষেত্র সংকুচিত হতে বাধ্য। কক্সবাজারের ঘটনা ফের সে তাগিদই দিয়েছে। যারা ধর্ষক আশিকুল ও তার সহযোগীদের নানাভাবে পৃষ্ঠপোষক, সেই মুখোশধারীদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি মনে করি। আমরা মূল্যবোধ নিয়ে অহরহ কথা বলছি। একটা সমাজে যখন মূল্যবোধের ধস নামে, তখন এর নেতিবাচক প্রভাব কতটা ভয়াবহ হয়ে ওঠে, এর অনেক নজির আমাদের সামনে রয়েছে। কক্সবাজারের ঘটনাটি এ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। নষ্টদের বেড়ে ওঠার উৎস নির্মূলে নির্মোহ পদেক্ষপ নেওয়ার বিকল্প নেই। নষ্টদের তো বটেই, মূলোৎপাটন করতে হবে তাদের ছায়াদানকারীদেরও। সে কাজটা বিলম্বে হলেও শুরু হোক কক্সবাজার থেকেই।

সেলিনা হোসেন: কথাসাহিত্যিক