চিহ্নও রেখে যায়নি। আগুনে সব শেষ। হারিয়ে গেছে স্বজন। এর পরও ছাইয়ের মধ্যে অনেকে খুঁজে ফিরছেন স্বজনদের স্মৃতি। এমনই একজন ৬০ বছরের বৃদ্ধা বরগুনার মানিকনগর গ্রামের ফরিদা বেগম। মেয়ে, জামাই ও নাতিকে হন্যে হয়ে খুঁজছেন পোড়া 'অভিযান-১০' লঞ্চে। ক্ষণে ক্ষণে করছেন বিলাপ। একবার যাচ্ছেন লঞ্চের সামনে, আবার কখনও পেছনে। গতকাল শনিবার ভোরের আলো না ফুটতেই ফরিদা সেই যে কঙ্কাল লঞ্চটিতে উঠলেন আর নামার নাম নেই!
সকাল ৮টার দিকে ঝালকাঠির লঞ্চ টার্মিনালে বেঁধে রাখা লঞ্চটির ভেতরে প্রবেশ করার সময় তার কিছু একটা খুঁজে পাওয়ার বিষয়টি চোখে পড়ে। এ সময় কাকে খুঁজছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'আমার মেয়ে, জামাই ও নাতিকে খুঁজছি। তারা সিঁড়ির পাশে এই কেবিনেই ছিল। এখানে ছাইয়ের ভেতরে নাতি ও জামাইয়ের প্যান্ট, মানিব্যাগ এবং মেয়ের ওড়না খুঁজে পেয়েছি। বড় নাতনির বিয়ের জন্য তারা কেনাকাটা করে ঢাকা থেকে বাড়িতে আসছিল। আমার জামাই হাকিম শরিফ ঢাকা এসএমসি স্যালাইন অফিসে চাকরি করে। মেয়ের নাম পাখি বেগম, নাতির নাম নাসির উল্লাহ। তাদের অনেক খুঁজেও পাই নাই।'
দুই ঘণ্টা ভেসে ছিলেন মা-মেয়ে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার সাধারণ ওয়ার্ডে পোড়ার ক্ষত নিয়ে চিকিৎসাধীন ময়ফুল বিবি (৬৫)। পাশেই আহত তার মেয়ে হালিমা বেগম (৪৫)। বাবা আবদুল হামিদ হাওলাদারকে (৭৫) হারিয়ে বিলাপ থামেনি এখনও। তাদের বাড়ি বরগুনার বামনার গোলাকাটা গ্রামে। রাতে লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের সময় সুগন্ধা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে মা ও মেয়ে দুই ঘণ্টা চেষ্টার পরে তীরে উঠলেও বাবা আবদুল হামিদ এখনও নিখোঁজ।
স্বামীর কথা স্মরণ করে ময়ফুল বলেন, 'লঞ্চে আগুন লাগার সময় নিচতলার ইঞ্জিন কক্ষের পাশে স্বামী ও মেয়ে নিয়ে ঘুমিয়ে ছিলাম। একসময় চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে লাফিয়ে উঠে দেখি লঞ্চে আগুন। পরে ওপরে উঠে মেয়ে ও স্বামীকে নিয়ে নদীতে ঝাঁপ দেই। দুই ঘণ্টা নদীতে ভেসে ছিলাম। পরে এলাকাবাসী আমাদের উদ্ধার করে তীরে নিয়ে আসে। চেতনা ফেরার পর মেয়েকে খুঁজে পেলেও স্বামীকে আর খুঁজে পাচ্ছি না। স্বামীকে নিয়ে ঢাকায় মেয়ের বাসায় গিয়েছিলাম। অনেক দিন পর লঞ্চে দেশে আসার সময় এই দুর্ঘটনায় স্ব্বামীকে হারিয়েছি। তাকে নিয়ে আর বাড়িতে ফিরতে পারলাম না।'
মেয়ে হালিমা বেগম বলেন, 'নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার পরে দেখি সব কুয়াশায় ঢাকা। দুই-তিন হাত পাশের কিছুও দেখা যাচ্ছে না। মাকে নিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা নদীতে ভেসে ছিলাম। পাড়ে উঠে আমার বৃদ্ধ বাবাকে আর পাইনি।'
ঝালকাঠি সদর থানার ওসি খলিলুর রহমান বলেন, 'নিখোঁজদের একটি তালিকা করা হচ্ছে। আমরা তাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।'