ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

বনায়নের টাকা পাচ্ছেন না উপকারভোগীরা

বনায়নের টাকা পাচ্ছেন  না উপকারভোগীরা

.

মাসুম মিয়া, ঘাটাইল (টাঙ্গাইল)

প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৩ | ০০:৩৪

রমিছা বেগমের স্বামী ইব্রাহিম হোসেন মারা গেছেন প্রায় চার বছর আগে। দুই মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। একমাত্র ছেলেও বিয়ে করে ঘরজামাই। রোগে জীর্ণশীর্ণ রমিছা। টাকার অভাবে ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে পারছেন না। অনেক সময় না খেয়েই থাকতে হয় তাঁকে। তাঁর স্বামীর নামে সামাজিক বনায়নের একটি প্লট ছিল। এর নমিনি রমিছা বেগম।
সামাজিক বনায়নের প্লটের গাছ নিলামের মাধ্যমে বছর দুই আগে বিক্রি হয়। তবে এখন পর্যন্ত কোনো টাকা তাঁর ভাগ্যে জোটেনি। রমিছার বাড়ি ঘাটাইল উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের কুমারপাড়া গ্রামে। সমকালের অনুসন্ধানে জানা গেছে, রমিছার মতো অনেকেই বন বিভাগের কারণে ভুক্তভোগী।

দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে পরিচালিত বনায়ন কার্যক্রম হচ্ছে সামাজিক বনায়ন। বৃক্ষরোপণ, পরিচর্যা, বনজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনায় জড়িত থাকেন উপকারভোগীরা। দশ বছর গাছগুলো দেখভাল করে সরকারিভাবে নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করে ৪৫ শতাংশ টাকা পান উপকারভোগীরা। তবে ঘাটাইল উপজেলার উপকারভোগীদের 
তথ্যমতে, গাছ বিক্রির প্রায় দুই বছর অতিবাহিত হলেও তাদের অনেকের ভাগ্যে জুটছে না টাকা। উপজেলার বন বিভাগের ঝড়কা বিটের অধীনে মাকড়াই, কুমারপাড়া ও মালেঙ্গা মৌজায় সামাজিক বনায়নের প্লট রয়েছে ১০১টি। এর মধ্যে টাকা পেয়েছেন মাত্র ৩০ থেকে ৩২ জন।

উপকারভোগীরা জানান, বন বিভাগের লোকজন বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে প্লটে কাজের কথা বলে তাদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। শুরুতে প্লট পরিমাপের জন্য নিয়েছেন ১ হাজার ২০০, চারা ক্রয় বাবদ ৫ হাজার, গাছ ছাঁটাই করতে ১ হাজার ২০০ এবং সর্বশেষ নিলামে গাছগুলো বিক্রি করতে নম্বর ফেলা বাবদ আরও ১ হাজার ২০০ টাকা নিয়েছে বন বিভাগ। গাছ বিক্রির টাকা প্লট মালিকদের ব্যাংক হিসাবে পাঠাবে বলে কাগজপত্র ঠিক করার জন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে আরও ২ হাজার টাকা নিয়েছে বন কর্তৃপক্ষ।

উপকারভোগীদের অভিযোগ– মাকড়াই, কুমারপাড়া ও মালেঙ্গা মৌজায় শুরুতে ৪১টি প্লট ছিল। সেই হিসাবে ১০ বছর সন্তানের মতো লালন-পালন করে বড় করেছেন গাছগুলো। গাছ চুরির ভয়ে রাত জেগে দিয়েছেন পাহারা। কিন্তু নিলামে গাছ বিক্রির আগে তারা জানতে পারেন, ৪১টি প্লট ভেঙে ১০১টি করা হয়েছে।
মাকড়াই গ্রামের আলী আকবর বলেন, ‘দশ বছর গাছ দেখভাল করলাম আমরা, আর গাছ বিক্রির সময় দেখি প্লটে অন্যের ভাগ।’ তাঁর ভাষ্য, ৪১টি প্লট ভেঙে ১০১টি করে যাদের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তাদের কেউ প্লট পাওয়ার যোগ্য নয়। গাছের পরিচর্যা দূরের কথা, কোনোদিন তাদের এ এলাকায় দেখা যায়নি।
আলী আকবরের সঙ্গে কথা বলার এক পর্যায়ে এগিয়ে এলেন উপকারভোগী নূরুল ইসলামের স্ত্রী রিনা বেগম। তিনি বলেন, ‘বনের অফিসার গরে টেহা না দিলে কাগজ ড্রয়ারে পইড়া থাকে। দুই হাজার টেহা দিছি তাও কাম অইতাছে না।’

রিনার মতো একই সুরে কথা বলেন জয়নুল আবেদিন, ইদ্রিস আলী, বেলাল হোসেন ও মোহাম্মদ আলী। তাদের অভিযোগ, অনেকবার বন বিভাগের ঝড়কা বিট অফিসে গিয়েও কোনো সুরাহা হচ্ছে না। তবে টাকা পেয়েছেন একই গ্রামের কাবেল উদ্দিন। তাঁর দাবি, কাগজপত্র ঠিক করার নামে ঝড়কা বিট অফিসে ২ হাজার টাকা দেওয়ার পর ১ লাখ ১৮ হাজার টাকা পেয়েছেন তিনি। তাঁর নামের প্লটটি ২ লাখ ৬২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছিল।

ওই তিন মৌজার সামাজিক বনায়নের সভাপতি আজমত আলী জানান, বিষয়টি নিয়ে তাঁর রেঞ্জ ও বিট কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে। দ্রুতই সমাধান করা হবে।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় বন বিভাগে ঝড়কা বিটের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত বিট কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি জানান, তাঁর দপ্তরে যেসব 
কাগজপত্র এসেছিল, তা ঠিকঠাক করে ধলাপাড়া রেঞ্জ অফিসে পাঠানো হয়েছে প্রায় এক মাস আগে। বিষয়টি এখন রেঞ্জারের অধীনে। কাগজপত্র ঠিক করা বাবদ অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের কথাটি অস্বীকার করেন তিনি।
ঘাটাইলের ধলাপাড়া বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা ওয়াদুদ রহমানের ভাষ্য, এসব বিষয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট বিটে যিনি আছেন তিনি। উপকারভোগীদের কাগজপত্রসহ ব্যাংক 
হিসাব নম্বর নিয়ে বিট কর্মকর্তা ওপরে প্রস্তাব পাঠান। তিনি ভালো বলতে পারবেন। উপকারভোগীদের থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়ে তিনি জানান– প্লট পরিমাপ, চারা ক্রয় এবং অন্যান্য বিষয়ে কোনো টাকা নেওয়া হয় না।

আরও পড়ুন

×