ঢাকা বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

ছয় কিলোমিটারে অর্ধশত ইটভাটা

ছয় কিলোমিটারে অর্ধশত ইটভাটা

ইটভাটা

সেলিম সরদার, ঈশ্বরদী (পাবনা)

প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৩ | ২২:৩৪

ঈশ্বরদীর লক্ষ্মীকুণ্ডা ইউনিয়নের প্রবেশমুখে সাঁটানো ‘স্বাগতম’ লেখা সাইনবোর্ড। সেটি ঘেঁষেই ইটভাটা। সেখানে স্তূপ করা কাঠ। পাশেই স মিলে কাঠ চেরাইয়ের সরঞ্জাম। ইউনিয়নের প্রবেশমুখেই পরিবেশ ধ্বংসের এমন যজ্ঞে হতাশ স্থানীয়রা। বারবার প্রশাসনে অভিযোগ করেও মিলছে না প্রতিকার।   

লক্ষ্মীকুণ্ডা ইউনিয়নের নবীনগর থেকে চর কুরুলিয়া পর্যন্ত প্রায় ছয় কিলোমিটারজুড়ে গড়ে উঠেছে ৫২টি ইটভাটা। ভাটার গা ঘেঁষে ফসলি জমি। অদূরেই বসতবাড়ি। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন-২০১৩ অনুসারে স্থানটিতে ইটভাটা স্থাপনের কোনো সুযোগ নেই। এরপরও কয়েক বছর ধরে এসব ভাটায় ইট পোড়ানো হচ্ছে। 

অভিযোগ উঠেছে, এসব ভাটার জন্য নদীপাড়ের চর ও ফসলি জমির মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে দেদার। মাটি পরিবহনের জন্য দাদপুর, লক্ষ্মীকুণ্ডা, নবীনগর ও চর কুরুলিয়ায় নদীপ্রবাহ বন্ধ করে নির্মাণ করা হয়েছে রাস্তা। সেই রাস্তা দিয়ে ট্রাক, ট্রাক্টর চলছে। পরিবহনের সময় এসব যানবাহন থেকে মাটি পড়ে নষ্ট হচ্ছে রাস্তা। শুষ্ক মৌসুমে ধুলায় একাকার হয়ে যায় চারপাশ। এতে প্রকৃতি ও পরিবেশ বিপন্ন হচ্ছে। মাঝেমধ্যে পাবনা জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালালেও তা ‘লোক দেখানো’ বলে অভিহিত করেছেন এলাকাবাসী। 
লক্ষ্মীকুণ্ডায় রেজাউল করিম রাজুর এমআরএইচ ইটভাটার ১৩০ জন শ্রমিক কাজ করেন। ৩ কোটি টাকা লগ্নি করে ব্যবসা করছেন। লাইসেন্সের জন্য তাঁর মতো অন্য ভাটার মালিকরাও আবেদন করেছেন। কিন্তু দেওয়া হয়নি। তাই মালিক সমিতির মাধ্যমে চাঁদা তুলে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ভাটা চালাতে হচ্ছে তাদের। তবে সরকারি নিয়ম অনুসরণ করে নিয়মিত ভ্যাট দিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। একই বক্তব্য অন্য মালিকদেরও।

কথা হলে বিলকেদার গ্রামের কৃষক মজনু প্রামাণিক বলেন, ভাটায় মাটি সরবরাহ করতে ফসলি জমির মাটি কেটে বিক্রি করে দেওয়ায় তিন বিঘা জমি এখন পুকুরে পরিণত হয়েছে। এসব জমিতে ফসল আবাদের উপায় নেই। একই কথা বলেন সাহাপুরের বাসিন্দা গোপালপুর সুগার মিলের কর্মচারী মিলন সরদার। তাঁর ভাষ্য, ইটভাটার কারণে লক্ষ্মীকুণ্ডার শত শত বিঘা ফসলি জমি অনাবাদি হয়ে পড়ছে। প্রতিদিন ভাটার ছাই এসে জমির গাছগাছালি, ফসল নষ্ট করে দিচ্ছে। 

লক্ষ্মীকুণ্ডা ইউনিয়নের কৈকুণ্ডা, বিলকেদার, লক্ষ্মীকুণ্ডা, দাদাপুরসহ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, অবৈধ ইটভাটাগুলোতে কয়লার ব্যবহার নেই বললেই চলে। ইট তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় মাটি আশপাশের ব্যক্তিমালিকানাধীন ফসলি জমি ও পদ্মার তীর থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে। মাটি পোড়াতে ছোট-বড় গাছ কেটে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। মাটি ও প্রস্তুতকৃত ইট পরিবহনের জন্য ইউনিয়নের রাস্তায় চলছে ছোট-বড় ট্রাক ও ট্রাক্টর এবং ইঞ্জিনচালিত গাড়ি। এসব যানবাহনের কারণে লক্ষ্মীকুণ্ডার প্রায় সব রাস্তা ভেঙেচুরে একাকার। পানি উন্নয়ন বোর্ড কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে এলাকার প্রধান সড়ক পদ্মা নদীর মুজিব বাঁধের রাস্তা পাকা করলেও বছর না ঘুরতেই সেটি ভেঙে চলাচল অযোগ্য হয়ে পড়েছে। 
দাদাপুর গ্রামের শিক্ষক জমসেদ আলী বলেন, মাটি বহনের ভারী যানবাহন চলাচলে রাস্তা ভেঙে গেছে। শুকনো মৌসুমে ধুলা ও বর্ষায় এক হাঁটু কাদা মাড়িয়ে শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে আসা-যাওয়া করতে হয়। বাইসাইকেল কিংবা মোটরসাইকেল নিয়েও রাস্তায় চলাচলের উপায় নেই।

ক্ষোভ প্রকাশ করে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর জাতীয় কমিটির সদস্য সহিদ মাহমুদ বলেন, ইটভাটার কারণে একদিকে বন ও গাছপালা উজাড় হচ্ছে, অন্যদিকে বায়ুদূষণে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। জনস্বার্থে অবিলম্বে এসব অপরাধ যজ্ঞ বন্ধ করতে স্থানীয় প্রশাসনকে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। 
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুবীর কুমার দাশ বলেন, অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকটি ইটভাটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কয়েকজন মালিককে জরিমানাও করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব অবৈধ ভাটা বন্ধ করতে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 
 

আরও পড়ুন

×