ঢাকা বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

সিলেট সীমান্তে কৌশল পাল্টে চোরাচালান

সিলেট সীমান্তে কৌশল পাল্টে চোরাচালান

ফাইল ছবি

 মুকিত রহমানী, সিলেট

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৪ | ১৩:১০

২০২৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর; রাত ৯টা। সিলেট সীমান্তের জৈন্তাপুর উপজেলার বাংলাবাজার এলাকা। ট্রাকভর্তি ভারতীয় পণ্য নিয়ে চোরাকারবারিরা এলাকাটি অতিক্রম করছিল। গোপন সংবাদ ছিল বিজিবির কাছে। ৪৮ বিজিবির অধীন শ্রীপুর বিওপির টহল দল গিয়ে উপস্থিত সেখানে। বিজিবি দেখে পালিয়ে যায় চোরাকারবারিরা। উদ্ধার করা হয় প্রায় তিন কোটি টাকার ভারতীয় শাড়ি, লেহেঙ্গা, শাল, সোয়েটার, রুমাল, বডি লোশন, ক্রিমসহ বিভিন্ন ধরনের প্রসাধনসামগ্রী।

একই মাসের ২৮ ডিসেম্বর রাতে প্রায় একই সময়। সীমান্ত এলাকা কানাইঘাটগামী পাকা রাস্তায় ধাওয়া করে ১৫৯ বস্তা ভারতীয় চিনি উদ্ধার করে জকিগঞ্জ থানা পুলিশ। একসময় গভীর রাত কিংবা ভোররাতে চোরাচালান হতো সীমান্ত এলাকা দিয়ে। এখন সন্ধ্যা কিংবা দিনের বেলায় চোরাচালানের সময় বেছে নিচ্ছে চোরাকারবারিরা। শুধু সময় পরিবর্তন নয়, কৌশল করে পাথরবাহী ট্রাকের ভেতর লুকিয়েও পণ্য নিয়ে আসছে। বড় চালান ছাড়া ছোট চালানগুলো যাত্রীবাহী গাড়ি কিংবা ছোট বাহনে ব্যবহার করছে চোরাকারবারিরা। কখনও বিজিবি ও পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করে, কখনও তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে চোরাচালান করা হয় বলে জানিয়েছেন গোয়াইনঘাটের সীমান্তবর্তী এক ইউপি চেয়ারম্যান।

এ বিষয়ে বিজিবি-৪৮ অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ মুনতাসির মামুন জানিয়েছেন, তাঁর আওতাধীন সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান পণ্য উদ্ধার ও কারবারিদের আটকে তৎপর রয়েছেন বিজিবি সদস্যরা। চোরাচালান স্পট এলাকায় বেশি নজর দেওয়া হচ্ছে। আগের চেয়ে এখন চোরাচালানও কমেছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট, জৈন্তাপুর ও জকিগঞ্জ সীমান্ত এলাকা দিয়ে চোরাচালান পণ্য আসছে বছরের পর বছর। সীমান্তবর্তী পাঁচটি উপজেলার কমপক্ষে ৮০ থেকে ১০০টি স্পট রয়েছে, যেগুলো দিয়ে প্রায় প্রতিদিনই পণ্য আসে। সম্প্রতি মাদকদ্রব্য আমদানি কমে গেলেও থেমে থাকেনি চা পাতা, চিনি, গরু-মহিষ, শাড়ি, মসলা, মটরশুঁটি, থ্রিপিস, সিগারেট, বিস্কুট, প্রসাধনীসহ নানা পণ্য। 

যেসব স্পট দিয়ে ভারতীয় পণ্য সিলেট প্রবেশ করে, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য– গোয়াইনঘাটের জাফলং জিরো পয়েন্ট, বিছনাকান্দি, প্রতাপপুর, সোনারহাট, নলজুড়ি, নকশিয়াপুঞ্জি, লামপুঞ্জি, সংগ্রামপুঞ্জি, কোম্পানীগঞ্জের কালাইরাগ, বরমসিদ্দিপুর, মাঝেরগাঁও, উৎমা, লামাগ্রাম, তুরং, কানাইঘাটের ডোনা সীমান্ত, সোনারখেওড়, বড়গ্রাম, ভালুকমারা, ডেয়াটিলা, ডাউকেরগুল, বাখালছড়া, ছোটফৌদ, জৈন্তাপুর সীমান্তের আলুবাগান, মোকামপুঞ্জি, শ্রীপুর, আদর্শগ্রাম, মিনাটিলা, কেন্দ্রী, কাঁঠালবাড়ী, ডিবিরহাওর, আসামপাড়াসহ জকিগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি স্পট। এসব স্পট নিয়ন্ত্রণ করছেন শতাধিক লোক। এর মধ্যে ঢালারপাড়ের দুলাল, আবদুল্লাহ, মোস্তফা, হেলাল মেম্বার, পশ্চিম জাফলংয়ের শ্যাম কালা, হেলাল আহমদ, তৈয়ব আলী, লক্ষ্মীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়নের শামসুল ইসলাম, আবুল কালাম, সাদ্দাম হোসেন, মারুফ ও ইকবালের নাম জানা গেছে।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, চোরাচালানের অধিকাংশই উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। ১০টি চোরাচালান হলে এক বা দুটি অভিযান করা হয়। সিলেট নগরী ছাড়াও বিভিন্ন বাজারের কমপক্ষে অর্ধশত ব্যবসায়ী এ চোরাচালান পণ্য ক্রয়ের সঙ্গে জড়িত। তারা স্থানীয় লোক মারফতে সীমান্ত দিয়ে এসব পণ্য আনে। মাঝেমধ্যে চালক কিংবা বহনকারী আটক হলেও নাম প্রকাশ পায় না মূল কারবারির। গত তিন মাসে সীমান্ত এলাকা থেকে কমপক্ষে ছয় কোটি টাকার পণ্য উদ্ধার এবং ৯ জনকে আটক করেছে পুলিশ ও বিজিবি। 

সর্বশেষ ১৩ জানুয়ারি সীমান্ত থেকে নগরীতে নিয়ে আসা ২৮৭ বস্তা চিনিসহ দু’জনকে টিলাগড় এলাকা থেকে আটক করা হয় বলে জানিয়েছেন মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (গণমাধ্যম) সাইফুল ইসলাম। এর আগে ২২ ডিসেম্বর রাতে জৈন্তাপুর থানা পুলিশ ৪৯৯টি ভারতীয় শাড়ি ও একটি পিকআপ গাড়ি জব্দ করে।

জৈন্তাপুর থানার ওসি তাজুল ইসলাম বলেন, চোরাচালান রোধে থানা পুলিশ তৎপর। তথ্য পেলেই অভিযান করা হয়। মাঝেমধ্যে নানা কৌশলে ভারতীয় পণ্য নিয়ে আসা হয়। অনেক সময় দিনের বেলায়ও নিয়ে আসা হয়। সম্প্রতি দিনের বেলায় একাধিক অভিযান করে মদসহ বিভিন্ন পণ্য উদ্ধার করা হয়েছে।

সিলেট জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার সম্রাট তালুকদার বলেন, নিয়মিত কাজের পাশাপাশি চোরাচালান রোধেও কাজ করছে পুলিশ। বিভিন্ন পয়েন্টে চেকপোস্ট ছাড়াও সীমান্তবর্তী থানার ওসিরা তৎপর রয়েছেন। মূলত চোরাচালান রোধে বিজিবি মূল ভূমিকা পালন করে।

আরও পড়ুন

×