পায়রা সমুদ্রবন্দরের নির্মাণকাজ এখন পর্যন্ত বাস্তুচ্যুত করেছে ১০ গ্রামের সাড়ে তিন হাজার পরিবারকে। এর মধ্যে রয়েছে একটি রাখাইন গ্রাম, যে গ্রামে বাস করত ছয়টি পরিবার। এই ছয়টি পরিবারের উচ্ছেদের মধ্য দিয়ে একদা রাখাইন জনপদ হিসেবে পরিচিত কলাপাড়া থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল রাখাইনদের আরও একটি গ্রাম। বাস্তুচ্যুত সাড়ে তিন হাজার পরিবারের বাকি প্রায় সবাই বাঙালি। তবে এই পরিবারগুলোও পটুয়াখালী উপকূলে বাস করে আসছিল কয়েক প্রজন্ম ধরে।

ঐতিহাসিক তথ্য থেকে জানা যায়, ১৭৮৪ সালের দিকে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায় রাখাইনদের কয়েকটি পরিবার এসে আশ্রয় নিয়েছিল। এর পর তারা ছড়িয়ে পড়ে পটুয়াখালী ও বরগুনার বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলে। একসময় তাদের সংখ্যা দাঁড়ায় এক লাখের বেশি। জঙ্গল কেটে তৈরি করেছিল বসতভূমি আর আবাদযোগ্য জমি।

১৯৪৮ সালে পটুয়াখালী ও বরগুনায় রাখাইনপাড়া ছিল ২৪২টি। ৭৩ বছর পর সেই সংখ্যা এখন বরগুনায় ১৪টি এবং পটুয়াখালীতে ২৬টি। ২০২টি গ্রাম এরই মধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হলো আরও একটি। এই উপকূলের প্রায় ৮৪ শতাংশ রাখাইন গ্রাম বিলুপ্তির শিকার হয়েছে। প্রধানত প্রভাবশালীরা নানাভাবে রাখাইনদের জমি দখল করায় ক্রমাগত উচ্ছেদের শিকার হয়ে আসছে তারা। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারি প্রকল্প। বর্তমানে জনসংখ্যা মাত্র কয়েক হাজার।

রাঙ্গাবালী বর্তমানে আলাদা একটি উপজেলা হলেও আগে ছিল কলাপাড়ার অন্তর্গত। রাখাইন তরুণ মং ম্যা রাখাইন বলেন, 'রাখাইন জনপদ হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে এখন রাখাইনরা হাতে গোনা হয়ে পড়েছে। ছয় আনিপাড়া উচ্ছেদের মধ্য দিয়ে যোগ হলো আরও একটি গ্রাম।' মং ম্যা কারিতাসের ইন্টিগ্রেটেড কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের একজন কর্মকর্তা।

নভেম্বরের শুরুতে তুলে দেওয়া হয়েছে প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো রাখাইন গ্রাম ছয় আনিপাড়া। কর্তৃপক্ষ এ পর্যন্ত পায়রা সমুদ্রবন্দর নির্মাণের জন্য সাড়ে চার হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করেছে। সিদ্ধান্ত রয়েছে, আরও প্রায় দুই হাজার একর জমি অধিগ্রহণের।

জমির মালিকানা-সংক্রান্ত বিরোধের কারণে বাস্তুচ্যুত অনেক পরিবারই বিশেষ ব্যবস্থাপনায় করা গৃহায়ন প্রকল্পের সুযোগ নিতে পারছে না। অধিগ্রহণের কারণে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে এই বিশেষ গৃহায়ন প্রকল্পের আওতায় সাতটি গুচ্ছগ্রাম তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে ঘর পেতে হলে ভূমির মালিকানার প্রমাণ থাকতে হবে। রাখাইনদের সেক্ষেত্রে রয়েছে দুর্বলতা। কারণ, সেদিকে তাদের নজর ছিল না।

পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হাসান বলেন, 'ক্ষতিপূরণের দাবিতে আমরা সাত হাজার দরখাস্ত পেয়েছি। এর মধ্যে তিন হাজারের মতো আবেদন (৪২ দশমিক ১৫ শতাংশ) শান্তিপূর্ণভাবে মীমাংসা করা যাবে। বাকি আবেদনগুলো নিয়ে নানা ধরনের বিরোধ আছে।' তিনি বলেন, 'আমরা প্রথমে এই তিন হাজার আবেদনের মীমাংসা করতে চাই। বাকি আবেদনগুলো মীমাংসা করতে সময় লাগবে, বিশেষ করে যারা আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন, তাদের জমির মালিকানার বিরোধ নিষ্পত্তি সময়সাপেক্ষ। সেক্ষেত্রে আমাদের আদালতের রায়ের জন্যে অপেক্ষা করতে হবে।'

ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি মামলাগুলোর বিচার প্রায়ই জটিলতায় পর্যবশিত হয় এবং এর নিষ্পত্তিতে পার হয়ে যেতে পারে দশকের পর দশক। জাল দলিল এবং দুর্নীতির কারণে এই মামলার নিষ্পত্তি সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়ে। ভূমি নিয়ে বিরোধ বাংলাদেশে অতি সাধারণ ঘটনা। পটুয়াখালীতে এই বিরোধ বাংলাদেশের অন্য অনেক জায়গার চাইতে বেশি। এর কারণ, দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপকভাবে বেদখল হয়েছে সংখ্যালঘু আদিবাসী রাখাইনদের জমি।

'চোখের পলকেই আমাদের জমি, যাকে কেন্দ্র করে আমাদের জীবন আবর্তিত হয়েছে কয়েক শতক ধরে, হারিয়ে গেল',- বললেন অতিসম্প্রতি উচ্ছেদ হওয়া রাখাইন গ্রাম ছয় আনিপাড়ার প্রধান চিং দামো। তিনি বলেন, 'এত কিছু হারানোর পরেও প্রশাসনের কথাবার্তায় মনে হচ্ছে আমরা কিছুই হারাইনি। প্রশাসনের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরতে হচ্ছে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্যে।'

ছয় আনিপাড়া গ্রামটির আয়তন ছিল পাঁচ দশমিক ৫৪ একর। এই জমির ক্ষতিপূরণ পাওয়া এখন অনিশ্চিত। কারণ, একদল বাঙালি ৩০০ বছরের পুরোনো এই জমির মালিকানা দাবি করে আদালতে মামলা ঠুকে দিয়েছে।

বাস্তুচ্যুত ছয় রাখাইন পরিবার অবশ্য ৯১ লাখের অধিক টাকা পেয়েছে ক্ষতিপূরণ হিসেবে, যা অস্থাবর সম্পদ যথা বাড়িঘর এবং গাছপালার দাম। বাস্তুচ্যুত রাখাইন হদ্মা চি অং তার অংশের ক্ষতিপূরণের প্রায় পুরোটাই ব্যয় করে ফেলেছেন নতুন জমি, গবাদিপশু কিনতে এবং নতুন বাড়ি বানাতে গিয়ে। আরেক বাস্তুচ্যুত রাখাইন মং চো তার অংশের ক্ষতিপূরণের ছয় লাখ টাকাই ব্যাংকে জমা রেখেছেন, মাসে ৪ হাজার ৮০০ টাকা সুদ হিসেবে পাবেন বলে। কিন্তু মাসিক এই আয় মং চোর পাঁচ হাজার টাকা বাড়ি ভাড়ার প্রয়োজনও মেটাতে পারবে না।

মং চো বললেন, 'আমাদের ঠেলে দেওয়া হয়েছে এমন এক জীবনে যেখানে পানি ছাড়া আর সবই কিনে খেতে হয়।' শুধু মংচো নন, যারা পায়রা সমুদ্রবন্দরের কারণে জমি হারিয়েছেন কিছুদিন আগেও তারা বছরে তিন ফসল ফলাতেন নিজেদের জমিতে। তাদের বাড়িতে ছিল ফলদ ও ঔষধি গাছের বাগান। পুকুরে ছিল মাছ।

'জমিই ছিল আমার জীবন'- বললেন মুজিবুর রহমান নামে একজন বাস্তুচ্যুত বাঙালি, যার ২১ দশমিক ৭৩ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে পায়রা সমুদ্রবন্দরের জন্যে। শুধু ধান চাষ করেই মুজিবুর বছরে পাঁচ লাখ টাকা আয় করতেন। তার ক্ষতিপূরণ পাওয়া অনিশ্চিত, কারণ তার জমির মালিকানা নিয়েও রয়েছে বিরোধ। তার জমির ওয়ারিশ দাবি করেছে এক রাখাইন পরিবার। তারা বলছে তাদের ওয়ারিশ বঞ্চিত করে এই জমি বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল।

পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞ হাফিজা খাতুন সমকালকে বলেন, 'যে ভূমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের কারণে যে এমন সংকটের জন্ম হবে তা আগে থেকে ধারণা করাটা খুব একটা কঠিন কাজ ছিল না।'

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত এই অধ্যাপক বলেন, 'বাংলাদেশের ভূমি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হস্তান্তরিত হয় উত্তরাধিকার সূত্রে এবং সেই হস্তান্তর প্রায়ই রেকর্ড করা হয় না। প্রায় সব এলাকায় এমন অনেক লোক পাওয়া যাবে দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখলে থাকলেও যারা তাদের জমির কোনো কাগজ উপস্থাপন করতে পারবে না।'

একটি অতি সাধারণ উদ্যোগের মাধ্যমে জমির মালিকানা-সংক্রান্ত এই সংকট মোকাবিলা করা যেত বলে মনে করেন অধ্যাপক হাফিজা খাতুন। তিনি বলেন, ভূমি অধিগ্রহণের আগেই একটি সংস্থাকে নিয়োগ করা যেতে পারত অধিগ্রহণ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে যাওয়া মানুষকে প্রয়োজনীয় কাগজ তৈরিতে সাহায্য করার জন্যে। পুনর্বাসনের জন্যে এই কৌশল খুবই সাধারণ এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা প্রয়োগ হয়ে থাকে।

'উন্নয়ন প্রয়োজনীয়, তাই বলে মানুষকে উদ্বাস্তু করে তা করা যাবে না'- বললেন নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন। তিনি একটি নাগরিক প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে পরিস্থিতি জানবার জন্য গিয়েছিলেন পায়রা বন্দর এলাকার উচ্ছেদ হওয়া রাখাইন গ্রামটিতে। তিনি বলেন, 'আমরা বলেছি যে মামলা রয়েছে রাখাইনদের জমি নিয়ে, দ্রুত তা নিষ্পত্তি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক। আদিবাসী পরিবারগুলোকে তাদের সংস্কৃতি জীবনধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, এমন জায়গায় পুনর্বাসনও করতে হবে।'

পায়রা সমুদ্রবন্দরের কারণে বাস্তুচ্যুতদের পুনর্বাসন কীভাবে হবে তার কোনো সুষ্পষ্ট পরিকল্পনা দেখতে পাওয়া যায় না। প্রজন্মান্তরে কৃষক ও জেলে পরিবারগুলো হঠাৎ করে হারিয়েছে মাছ ধরার জলাশয় এবং ফসল চাষের মাঠ। তারা এখন সংগ্রাম করছে নৈশপ্রহরী এবং এরকম আরও অনেক অচেনা পেশা গ্রহণ করতে।

পায়রা সমুদ্রবন্দর কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, তারা ইতোমধ্যে দুই হাজার ৮০০ কোটি টাকা দিয়েছেন ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ডিসি অফিসকে, যা সরকার নির্ধারিত প্রকৃত মূল্যের তিনগুণ। তারা একটি ট্রেনিং প্রোগ্রামের মাধ্যমে চার হাজার ২০০ মানুষকে কম্পিউটার পরিচালনা, মোবাইল সার্ভিসিং, ড্রাইভিং ও সেলাইয়ে দক্ষ করে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান। এই প্রোগ্রামের আওতায় ইতোমধ্যে দুই হাজার ৮০০ লোককে বিভিন্ন কাজে দক্ষ করে গড়ে তোলার দাবিও তারা করেন। বন্দর কর্তৃপক্ষ যদিও এই দক্ষ জনশক্তির মাত্র ১০ থেকে ১৫ জনকে চাকরি দিয়েছে।