পটুয়াখালী ও বরগুনায় রাখাইনদের শেষ গ্রামগুলোর প্রায় ৭০ ভাগ শ্মশান এবং ৫০ ভাগ মন্দিরই ভূমি দখলে আক্রান্ত। এগুলোর বেশিরভাগই দখল হয়েছে গত তিন দশকে। কোনো কোনো শ্মশান ও মন্দির পুরোপুরি বেদখল হয়ে গেছে। কয়েকটি এখন নামে মাত্র টিকে আছে। দখলদাররা চারপাশ থেকে এমনভাবে ঘিরে ফেলেছে যে কিছু মন্দির ও শ্মশানে ঢুকবার রাস্তাই বন্ধ হয়ে গেছে। 'এসবই ঘটছে  প্রশাসনের নাকের ডগায়'- রাখাইন নেতারা এমন অভিযোগই করছেন।

পটুয়াখালী কলাপাড়া উপজেলার ছয়টি রাখাইন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, ভূমিদস্যুরা তাদের দখল করা জমিতে দোকানপাট, মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণ করে ফেলেছে। যদিও ওইসব জমির মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। পটুয়াখালী ও বরগুনায় রাখাইন জনসংখ্যা প্রায় ৯৫ ভাগ কমে গেছে গত এক শতকেরও কম সময়ে। মূলত ভূমি দখলের কারণেই এমনটা ঘটেছে।

'আমাদের বাস করার জায়গা এতটাই কমেছে যে আমরা এখন শেষকৃত্যও নিজেদের ঐতিহ্য অনুযায়ী করতে পারি না,'- বলছিলেন চিংমা থ্রু, নাচনাপাড়া নামে এক রাখাইন গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ব্যাখ্যা করলেন, রাখাইনদের সব শ্মশানেই থাকে দুটি অংশ। শ্মশানকে তারা বলে চানসাই। ধর্মীয় বিশ্বাসে রাখাইনরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও বাঙালি বৌদ্ধ, এমনকি অন্য আদিবাসী বৌদ্ধদের সঙ্গেও রাখাইন রীতিনীতির অনেক পার্থক্য রয়েছে। রাখাইন রীতি অনুযায়ী শ্মশানের দুটি অংশের একটিতে অতিথিদের শেষকৃত্য করা হয়। ঐতিহ্য অনুযায়ী তারাই অতিথি, যারা তাদের গ্রামের বাইরে মারা যান। অন্য শ্মশানটিতে গ্রামে যাদের মৃত্যু হয় তাদের শেষকৃত্য সম্পাদন করা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অতিথি শ্মশান তো বটেই, মূল শ্মশানেরও জমি দখল করে নিয়েছে ভূমিদস্যুরা।

নাচনাপাড়া গ্রামের শ্মশানটি কাগজেকলমে ৩০ শতাংশ জমিতে হলেও ১০ শতাংশ জমিও নেই আর। এই শ্মশানে ঢুকবার রাস্তাটিও পুরোপুরি দখল করে নিয়েছে ভূমিদস্যুরা। শ্মশানের তিন পাশেই তৈরি হয়েছে স্থাপনা, যার মধ্যে রয়েছে দোকানপাট ও মাদ্রাসা। 'শ্মশানে লাশ নিয়ে যাওয়ার একটি বিশেষ নিয়ম আছে, সেটি হচ্ছে এই লাশ বা লাশ বহনকারী কফিন কোনোভাবেই অন্য কোনো কিছু স্পর্শ করতে পারবে না,' বললেন ফ্রুয়ে রাখাইন। শ্মশানের যে পাশটি এখন দখল হয়নি সেই পাশে বইছে আরপাঙ্গাসিয়া নদী। আরপাঙ্গাসিয়া নদীর পার ধরেও ভাঙছে শ্মশান। ভূমি দখলদাররা শ্মশানটিকে পরিণত করেছে ময়লার ভাগাড়ে। শ্মশানের মধ্যে হাঁটতে হয় খুবই সাবধানে, কারণ এখানে অনেক বাঙালি আসে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে।

নাচনাপাড়ার অন্য একটি শ্মশান ইতোমধ্যেই দখল হয়ে গেছে আরও অনেক রাখাইন পাড়ার মতো। এই দখলগুলো হয় সাধারণত জাল দলিলের মাধ্যমে। দখলের আরেকটি প্রক্রিয়া হচ্ছে, প্রথমে আশপাশের খাসজমি দখল করা। তারপর ধীরে ধীরে বাড়ানো হয় এই দখলদারিত্ব। দখলের শুরুটা অনেক সময় শান্তিপূর্ণ হতে পারে, যেমন দোকান ভাড়া নেওয়া। ভাড়া নেওয়া দোকান অচিরেই পরিবর্তিত হয় নিজের দোকানে।

কুয়াকাটার মিস্ত্রিপাড়ার বিখ্যাত সীমা বৌদ্ধবিহারের জমি এই প্রক্রিয়ায় দখল শুরু করছে একটি বাঙালি পরিবার। এই পরিবারটি মন্দিরের কাছ থেকে মাসিক ৫০ টাকায় দোকান ভাড়া নিয়েছিল দুই দশক আগে। 'বছরের পর বছর ভাড়া দিয়ে থাকার পর এখন তারা এটা নিজেদের জমি বলে দাবি করছে,' বললেন মিস্ত্রিপাড়া বৌদ্ধবিহারের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মংলা চিং। এই বিহারটি এক দশমিক ৮৬ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। বিহারের জমি দখলের ঘটনায় অভিযুক্ত সেলিম মুন্সির দাবি, তারা জমি কিনে দোকান করেছেন। মন্দিরকে কোনো দিনই ভাড়া দেননি। তবে উৎসবপার্বণে 'চাঁদা-টাদা' দিয়েছেন।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সদস্য মং ম্যা রাখাইন বলেন, 'স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় চলছে রাখাইনদের ভূমি দখল।' তিনি বলেন, ১৯৫০-এর প্রজাস্বত্ব আইন অনুযায়ী শ্মশান বা মন্দিরের জায়গা হস্তান্তরযোগ্য নয়, কিন্তু সেই জমির মালিকানা দাবি করে কোনো না কোনোভাবে প্রশাসনের সহায়তায় দখল করে রাখছে ভূমিদস্যুরা।

'রাখাইনদের ভূমি দখলের বিষয়টা খুবই সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয় ১৯৯০-এর দশকে, যখন কুয়াকাটাসহ পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার পর্যটন সম্ভাবনা বাড়তে থাকে অনেকগুণে'- বললেন মং ম্যা। মং ম্যা রাখাইন কারিতাসের ইন্টিগ্রেটেড কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের একজন কর্মকর্তা। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ২০০৭ সাল থেকে কারিতাস রাখাইনদের শিক্ষা, ভূমি ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিয়ে কাজ করে আসছে।

কারিতাসের এই প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, পটুয়াখালী ও বরগুনার অবশিষ্ট ৩৯টি রাখাইন গ্রামে শ্মশান আছে ২২টি। বাকি শ্মশানগুলো হয় পুরোপুরি বা আংশিকভাবে দখল হয়ে গেছে। কমপক্ষে ১২টি গ্রামে কোনো শ্মশান অবশিষ্ট নেই। মন্দিরের ক্ষেত্রে রাখাইনদের শেষ ৩৯টি গ্রামের ২০টিতে মন্দির আছে।

সমুদ্রশহর কুয়াকাটার প্রাণকেন্দ্র কেরানীপাড়ায় একটি প্রাচীন বৌদ্ধমন্দিরের ধ্বংসাবশেষ এখনও দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। মন্দিরটি বহুকাল শহরে পর্যটকদের জন্য এক বিশাল আকর্ষণ হিসেবে ছিল। ২০১৭ সালেও এই মন্দির মূল সড়ক থেকেই দৃশ্যমান ছিল। কিন্তু এই মন্দিরের কিছু অংশ দখল হয়ে গেছে কয়েক মাস আগে। দেয়াল ও দোকান তুলে ঢেকে দেওয়া হয়েছে মন্দিরের পুরোটাই। এই পুরোনো মন্দিরটি আসলে কুয়াকাটা শহরের মূল রাখাইন মন্দিরের পরিত্যক্ত অংশ। ১৯৬২ সালের বন্যার পরে এই মন্দিরের মূল অংশ স্থানান্তরিত হয়েছিল উঁচু ভূমিতে। এই পুরোনো মন্দিরের যে বেদিতে এক সময় মূল মন্দিরের বিগ্রহটি ছিল, সেখানে এখন শুকানো হয় মাছধরার জাল।

এটা মানতে পারছেন লুমা রাখাইন। এই বৃদ্ধা বলেন, 'এই জায়গায় একসময় শুধু যে রাখাইন মন্দির ছিল তা নয়। এখানে রাখাইনরা ছাড়াও অনেকেই আসত মিষ্টি পানির কুয়া থেকে পানি নিতে।' লুমা রাখাইন এখনও প্রতি সকাল ও সন্ধ্যায় এখানে প্রার্থনা করেন। লুমা আক্ষেপ করছিলেন, 'এটাও কি হতে পারে? ডাকাতরা (ভূমিদস্যুরা) মন্দিরের জমি দখল করার জন্যে কেটে ফেলেছে অনেক গাছও। অন্যের জন্যে একটু সম্মানও কি অবশিষ্ট নেই? এমনকি ভগবানের জমি দখলেও ভয় নেই?'

লাগামহীন ভূমিদখল বাংলাদেশকে অচিরেই রাখাইনশূন্য করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আদিবাসী ফোরামের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক দীপায়ন খীসা। তিনি গত নভেম্বরের ২৬ থেকে ২৮ তারিখ পর্যন্ত একটি নাগরিক প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে পটুয়াখালীর কয়েকটি রাখাইন গ্রাম ঘুরে আসার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, 'পটুয়াখালীতে রাখাইন গ্রামের সংখ্যা ১৪৪ থেকে কমে ২৬টিতে ঠেকেছে। বরগুনায় ৯৩ থেকে কমে হয়েছে ১৩টি। ১৭ শতকের শুরুতে বসতি গড়ে রাখাইনরা বনজঙ্গল কেটে আবাদি জমি তৈরি করে এ অঞ্চলকে বসবাসযোগ্য করেছিল। এলাকাটি কয়েক দশক আগেও লক্ষাধিক রাখাইনের পদচারণায় মুখরিত ছিল, এখন এখানে তাদের সংখ্যা মাত্র আড়াই হাজারে নেমে এসেছে।'