চট্টগ্রামে এক রোগীর নেত্রনালীর অস্ত্রোপচার করতে গিয়ে চোখের ছানি অপারেশন করে কৃত্রিম লেন্স লাগিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। ঘটনাটি ঘটেছে নগরের খুলশী থানার জাকির হোসেন সড়কের লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালে। যদিও হাসপাতল কর্তৃপক্ষ বলছে, হালিমা নামে দু’জন রোগী থাকায় অনিচ্ছাকৃত এই ভুল হয়েছে।

ওই রোগীর নাম হালিমা। তিনি চাঁদপুর জেলার কচুয়া থানার ওসমান চেয়ারম্যান বাড়ির মো. শহিদুল ইসলামের মেয়ে। তবে নগরের একটি সোয়েটার কারখানায় কর্মরত হালিমা নগরের দেওয়ানহাট এলাকার মিস্ত্রি পাড়ায় ভাড়া বাসায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছেন।

এ ঘটনায় হাসপাতালটির চিকিৎসক ডা. মিজানুল হকের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ৩-৪ জন চিকিৎসক-নার্সকে আসামি করে খুলশী থানায় মামলা করেছেন ভুক্তভোগীর ভাই আবুল হোসেন আকাশ। 

মামলার এজাহারে বাদী আবুল হোসেন আকাশ উল্লেখ করেন, তার বোনের নেত্রনালীতে সমস্যা দেখা দেওয়ায় গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালের চিকিৎসক ফারহানা আফরোজের শরণাপন্ন হন। প্রাথমিক চিকিৎসার পর ওই চিকিৎসক তার বোনের নেত্রনালী অস্ত্রোপচার করতে হবে জানিয়ে চিকিৎসক মিজানুল হকের কাছে পাঠান। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর মিজানুল হক গত ৮ জানুয়ারি অস্ত্রোপচার করার সময় নির্ধারণ করেন। এজন্য ছয় হাজার টাকা খরচ হবে বলেও জানান। 

গত শনিবার হালিমাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওইদনি সকাল সাড়ে ৯টার দিকে হাসপাতালের তৃতীয় তলায় তার অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। অস্ত্রোপচার শেষে চিকিৎসক মিজানুল হক অপারেশনের বিল বাবদ ১৫ হাজার টাকা জমা দিতে বলেন। আগে ছয় হাজার টাকা লাগবে বলেছিলেন- এমন প্রশ্ন করা হলে ডা. মিজানুল হক বলেন, হালিমার চোখে ১৫ হাজার টাকা দামের লেন্স লাগানো হয়েছে। পরে তার মা এর প্রতিবাদ করলে ডা. মিজানুল হক ভুলের বিষয়টি বুঝতে পেরে হাসপাতাল থেকে সরে যান। 

বিষয়টি নিয়ে তারা প্রতিবাদ করলে একজন নার্স এসে জানায় বিলে নাকি তিন হাজার টাকা ছাড় দিয়ে ১২ হাজার টাকা করা হয়েছে। এ অবস্থায় হালিমার চোখে জ্বালাতন শুরু হয়। সে যন্ত্রণায় চিৎকার করতে থাকে। পরে তারা জানতে পারেন হালিমার নেত্রনালীর বদলে ভুলে চোখের ছানি অপারেশন করা হয়েছে। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ায় পুরো হাসপাতালে হইচই শুরু হয়। ডা. মিজানুল হকের কাছে এমন ভুলের কারণ জানতে চাইলে তিনি কথা না বলে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে পড়েন। হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, সিনিয়র চিকিৎসকসহ অনেকের কাছে ধরনা দিলেও কেউ তাদের কথা শুনতে আগ্রহী হননি। বরং তাদেরকে হাসপাতাল থেকে বের করে দিতে চান। 

আবুল হোসেন আকাশ বলেন, চিকিৎসকের অবহেলার কারণেই আমার বোনের এতবড় ক্ষতি হয়ে গেল। চোখ ভালো করতে এসে এখন বোনের দৃষ্টিশক্তি হারানোর শঙ্কায় পড়েছি আমরা। আমি ডাক্তারের বিরুদ্ধে মামলা করেছি। যেকোনো মূল্যে এর বিচার হতে হবে। চিকিৎসকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। 

জানা গেছে ডা. মিজানুল হক লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালে চাকরির পাশাপাশি নগরের বন্দরটিলায় ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখেন। 

এই ব্যাপারে খুলশী থানার ওসি সন্তোষ কুমার চাকমা জানান, হালিমা নামের এক নারীর নেত্রনালীর বদলে চোখের ছানি অপারেশনের অভিযোগে এক চিকিৎসকের নাম উল্লেখ করাসহ অজ্ঞাত আরও ৩-৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে ভুক্তভোগী নারীর ভাই। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করছি। পাশাপাশি অভিযুক্ত চিকিৎসককে গ্রেপ্তারেও আমাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে। 

অভিযোগ প্রসঙ্গে কথা বলতে ডা. মিজানুল হকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সেক্রেটারি ডা. দেবাশীষ দত্ত ভুল স্বীকার করে বলেন, এই ভুলটি ইচ্ছাকৃত নয়। মূলত হালিমা নামে দু’জন রোগী থাকায় অনিচ্ছাকৃত এই ভুল হয়েছে। একই নামের দুই হালিমার একজন নেত্রনালীতে ও আরেকজন চোখের ছানি অপারেশন করাতে এসেছিলেন। হালিমার চোখের যাতে কোনো সমস্যা না হয় তার সকল ব্যবস্থায় নিচ্ছি আমরা। ওর চিকিৎসা বাবদ সকল খরচ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বহন করবে। এ ঘটনায় আমরা একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করছি। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অভিযুক্ত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।