নৌকার পক্ষে ভোটের মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের এমপি শামীম ওসমান। নির্বাচনের ছয় দিন আগে গতকাল সোমবার নারায়ণগঞ্জে ৫৬ মিনিটের সংবাদ সম্মেলনে একবারও নৌকার প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর নাম উচ্চারণ না করে তিনি বলেন, 'প্রার্থী কলাগাছ, না আমগাছ- দেখার বিষয় না। বঙ্গবন্ধুর নৌকার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।'
শামীম ওসমান জানান, আইভী যেন আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান- সেই দাবিই জানিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে। দাবি পূরণ না হলেও দলের হয়ে মাঠে নেমেছেন বলে দাবি তার। তবে তার আগেই সোমবার সকালে আইভী বলে দেন, কারও সমর্থন প্রয়োজন নেই তার।
শামীম ওসমান ও সেলিনা হায়াৎ আইভী- দু'জনেই আওয়ামী লীগের নেতা হলেও নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে পরস্পরের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী। তাদের পরিবারের মধ্যেও দ্বন্দ্ব পাঁচ দশকের পুরোনো। আসন্ন নাসিক নির্বাচনে নৌকার পক্ষে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা নামলেও প্রার্থী আইভীর অভিযোগ, তার বিপক্ষে বিএনপি নেতা তৈমূর আলম খন্দকারকে প্রার্থী করেছে 'গডফাদার' শামীম ওসমানের পরিবার।
দলীয় প্রার্থীর বিরোধিতা করলে জীবনে নৌকা পাবেন না- আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকের এ হুঁশিয়ারির তিন দিন পর নারায়ণগঞ্জে আসেন শামীম ওসমান। এ খবরে তার কয়েক হাজার অনুসারী চাষাঢ়ার বঙ্গবন্ধু সড়কে অবস্থান নিয়ে শোডাউন করেন। এতদিন যে নেতাকর্মীদের আইভীর ভোটের প্রচারে দেখা যায়নি, তারাও ছিলেন শামীমের সংবাদ সম্মেলনের মঞ্চে ও মিলনায়তনে।
আলোচিত সংবাদ সম্মেলনের পর সমকালের সঙ্গে কথা বলেন শামীম ওসমান। আইভীকে ব্যর্থ মেয়র আখ্যা দিয়ে ভোটপ্রার্থনা করছেন তৈমূর আলম। প্রথমে পৌরসভার চেয়ারম্যান পরে দুই দফায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন সেলিনা হায়াৎ আইভী। তিনি ১৮ বছর ক্ষমতায় থাকলেও নগরের উন্নয়নে কাজ করেননি বলে অভিযোগ করছেন তৈমূর আলম। মেয়র আইভীর কাজের সমালোচক শামীম ওসমানও।
আইভী সফল না ব্যর্থ মেয়র? এ প্রশ্নে শামীম ওসমান বলেনে, 'এ বিচার জনগণ করবে। আমি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ভোটার নই। আমি ফতুল্লার বাসিন্দা'।
তাহলে তৈমূর আলমের মতো আইভীকে মেয়র হিসেবে ব্যর্থ মনে করেন? প্রশ্নে শামীম ওসমান বলেন, 'তৈমূর আলম কী মনে করেন। তা তার ব্যাপার।' তিনি তৈমূরের মতকেই সমর্থন করেন কিনা- এ প্রশ্নে শামীম ওসমান বলেন, 'গত ১৩ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। শেখ হাসিনা সরকার নারায়ণগঞ্জের যে উন্নয়ন করেছেন, তা ৫০ বছরে হয়নি। এ হিসেবে তিনি (আইভী) সফল মেয়র।' সংবাদ সম্মেলনের মতো সমকালের সঙ্গে আলাপেও মুখে আইভীর নাম নেননি শামীম ওসমান।
গতকালের সংবাদ সম্মেলনকে নিজের জীবনের সবচেয়ে কষ্টের সংবাদ সম্মেলন বলে আখ্যা দেন শামীম ওসমান। দলের চাপেই নৌকার পক্ষে নামার ঘোষণা দিয়েছেন কিনা- এ প্রশ্নে মঞ্চে বসা আওয়ামী লীগ নেতাদের দেখিয়ে বলেন, 'এদের চাপ দেওয়ার ক্ষমতা কারও আছে? এখানে আওয়ামী লীগের মূলধারার সবাই আছেন। আমি এতদিন নামি নাই। মানে, নামতে পারি নাই। আজকে থেকে নামলাম।'
এমপিদের ভোট চাওয়ার ক্ষেত্রে আইনি বাধার কথা তুলে ধরে শামীম বলেন, 'অনেকে নৌকা নিয়ে অনেক কথা বলেন। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ নৌকার ঘাঁটি, আওয়ামী লীগের ঘাঁটি, শেখ হাসিনার ঘাঁটি। এখানে অন্য কোনো খেলা খেলার চেষ্টা করবেন না।'
২০১১ সালের নির্বাচনে শামীমকে হারিয়ে নাসিকের প্রথম মেয়র হন আইভী। সেই নির্বাচনে ভোটের সাত ঘণ্টা আগে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান তৈমূর আলম। শামীমপন্থিরা বরাবরই অভিযোগ করেন, আইভীকে জেতাতে দল সমর্থিত প্রার্থীকে সরিয়ে দিয়েছিল বিএনপি। তবে এবারের নির্বাচনে আইভীর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী তৈমূর আলম খন্দকারকে ওসমান পরিবারের তোতা পাখি বলে আখ্যা দিয়েছেন আইভী। দলীয় নেতাকর্মীদের শামীম ওসমান বলেন, 'মানুষের দ্বারে দ্বারে যেতে হবে। একে-অপরকে দোষারোপ করে ভোট হয় না।'
নির্বাচনে অংশ নিয়ে দলীয় পদ হারানো তৈমূর আলম স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে হাতি প্রতীকে ভোট করছেন। তৈমূরের সঙ্গে কোনো বোঝাপড়া নেই দাবি করে শামীম ওসমান বলেন, আপনি আপনার মতো কথা বলতে থাকেন। কিন্তু হাতি দিয়া নৌকা ডুবানোর চিন্তা করবেন না। হাতি সাইজে বড় হতে পারে; আমরা হাতি কাঁধে নিয়ে দৌড় দেব, কিন্তু নৌকার ওপরে হাতিরে উঠতে দেব না।
বিধি ভেঙে দলীয় প্রতীকে ভোট চাওয়ায় নির্বাচন কমিশনের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন শামীম ওসমান। তিনি বলেন, এতদিন প্রকাশ্যে ঘোষণা না দিলেও নৌকার পক্ষে আড়ালে থেকে কাজ করছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে সব সত্য বলতে পারছেন না। চুপ থাকার কারণে তাকে নিয়ে অনেক আলোচনা তৈরি হয়েছে। এতে দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কেউ উল্টোপথে হেঁটে দলের ক্ষতি করছেন। আবার কেউ দলের সঙ্গে হেঁটে দলের ক্ষতি করছেন। তবে তারা কারা তা উল্লেখ করেননি শামীম ওসমান।
আইভী কেন তাকে 'গদফাদার' বলেছেন- এ প্রশ্নে শামীম বলেন, দু'দিন আগে ইচ্ছে হয়েছে ফাদার বলতে, বলেছেন। তিন দিন আগে মনে হয়েছে ব্রাদার বলতে, বলেছেন। আইভীর দিকে বক্রোক্তি করে বলেন, 'তবে যে যাই বলেন, গডমাদার বলবেন না। কারণ, আমি পুরুষ মানুষ। এসব গালি শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।'
শামীম ওসমান সংবাদ সম্মেলনে তার বাবা এ কে এম শামসুজ্জামান, তার মা নাগিনা জোহা এবং প্রয়াত বড় ভাই নাসিম ওসমানের আওয়ামী লীগের জন্য ভূমিকা তুলে ধরেন। তাদের কবর সিটি করপোরেশন শ্মশানের মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে দাবি করে শামীম বলেন, 'আমি শুধু বলেছিলাম, এটা ইবলিশ, শয়তানের কাজ।'
সেই ঘটনার তদন্ত না হওয়া এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় ফের ক্ষোভ জানান শামীম ওসমান। আইভীর নাম না নিয়ে বলেন, 'একজন মহিলার নাম ধরে প্রশ্ন করা হয়েছিল। আমি তাকে ধমক দিয়ে বলেছিলাম, তার নাম কেন বল, সে তো কোনো সাবজেক্ট না! শীর্ষ নেতাদের বলেছিলাম তাকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে বলেন। গতবার তাকে শাড়ি দিয়েছিলাম। এবার দেব দোয়া। যেন আল্লাহ তাকে হেদায়েত দেন।'
শামীম ওসমানের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি চন্দন শীল, সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা, শহর যুবলীগের সভাপতি শাহাদাৎ হোসেন সাজনু, ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম সাইফউল্লাহ বাদল, সাধারণ সম্পাদক শওকত প্রমুখ। যাদের আইভীর সঙ্গে ভোটের প্রচারে নামতে দেখা যায়নি।
সংবাদ সম্মেলনের পর নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে শামীম ওসমানের সঙ্গে বৈঠক করেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম।
আচরণবিধি লঙ্ঘন :স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিদের নির্বাচনী প্রচার বা নির্বাচনী কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই। বিধি অনুযায়ী এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সংবাদ সম্মেলনে শামীম ওসমান নিজেও বলেছেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের জন্য তিনি নির্বাচন কমিশনের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছেন।
শামীম ওসমানের এই বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার গত রাতে সমকালকে বলেন, স্থানীয় এমপি রাজনৈতিক বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করলেও তিনি নির্বাচন নিয়ে বেশকিছু মন্তব্য করেছেন। এতে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ রয়েছে। তাই এটা আচরণবিধি লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়ে।
যদিও এ বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা মাহফুজা আক্তার কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে ইসি সূত্রগুলো বলেছে, কেউ এ ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ দিলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী, সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নির্বাচন-পূর্ব নির্বাচনী এলাকায় প্রচারণায় বা নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেন না। বিধিমালায় সাংসদদের সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা আছে, যে কারণে তারা স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচনের প্রচার বা নির্বাচনী কাজে অংশ নিতে পারেন না। নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের শাস্তি ৬ মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেনও মনে করেন, নির্বাচনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে নির্বাচন কমিশনের দ্রুত এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। শামীম ওসমান যে বক্তব্য দিয়েছেন তার মাধ্যমে তিনি নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন। যদিও তিনি মনে করেন, বর্তমানে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হচ্ছে দলীয় প্রতীকে। এ কারণে দলীয় মন্ত্রী-এমপিদের প্রচারে অংশ নিতে না দেওয়ার বিধি অযৌক্তিক। এটি পরিবর্তন করা দরকার।