একাকী লড়ে হতে পারলেন না সিটি মেয়র। দলের অমতে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় বিএনপির সব পদ খুইয়ে এখন রাজনীতির মাঠে নিঃসঙ্গ এক নেতা তৈমূর আলম খন্দকার। গত রোববার হয়ে যাওয়া নারায়াণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে পরাজয় মেনে সব কূলই যেন হারিয়েছেন এই 'ভোটযোদ্ধা'। এখন তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও প্রশ্নবিদ্ধ, নামতে পারে আরও নিকষ আঁধার।
তৈমূর ইস্যুতে বিএনপিতেও রয়েছে মতভেদ। একপক্ষ মনে করছে, দলের সিদ্ধান্ত না মেনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দলের চেইন অব কমান্ড ঠিক রাখতে তাকে বহিস্কার করার বিষয়েও অনেকে মত দেন।
এদিকে, দলীয়ভাবে অংশ না নেওয়ায় তৈমূরের পরাজয়ের দায় কোনোভাবেই নিচ্ছে না বিএনপি। তবে নাসিকের এই নির্বাচনকে শিক্ষণীয় হিসেবে সামনে আনছেন দলটির নেতাকর্মীরা। একদিকে 'ধানের শীষ' ছাড়া ভোটে দাঁড়িয়ে তৈমূর খেই হারিয়েছেন, অন্যদিকে ইভিএম ব্যবস্থা যে এখনও ত্রুটিপূর্ণ- এই দুই প্রেক্ষাপট সামনে আনছে দলটি।
এই সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীন কোনো স্থানীয় সরকার ও উপনির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে বিএনপির। সেই সিদ্ধান্তকে পাশ কাটিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা তৈমূর নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন। এ কারণে তাকে ওই কেন্দ্রীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এর আগে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয় জেলা বিএনপির আহ্বায়ক পদ থেকেও। এত কিছুর পরও দমেননি তৈমূর। তার কারণে দলের চেইন অব কমান্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে করছেন শীর্ষ নেতারা।
বিএনপি সূত্র জানায়, তৈমূর নাসিক নির্বাচনে আগ্রহ দেখানোর পর থেকে দলের হাইকমান্ড থেকে তাকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছিল। কিন্তু তিনি তা মানেননি। এর পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনী প্রচার শুরুর পরপরই নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে কঠোর নির্দেশনায় বলা হয়, তৈমূরের নির্বাচনে কেউ অংশ নিতে পারবে না। কেউ প্রচারে যাবে না। ওই বৈঠকে ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকদের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় দপ্তরের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। দলের এমন সিদ্ধান্তে জেলা ও মহানগর বিএনপির বেশিরভাগ নেতাকর্মী নির্বাচন থেকে দূরে সরে যান। জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অধ্যাপক মামুন আহমেদ থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ফোন করে নির্বাচন থেকে দূরে থাকতে বলেন। ফলে নির্বাচনী কার্যক্রমে অনেক বিএনপি নেতাকর্মীকে কাছে পাননি তৈমূর।
তবে তৈমূরের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক থাকায় প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামাল। এর জন্য কামাল দলের কাছে নিজের অনুতপ্ততা প্রকাশ করেন। সমকালকে তিনি বলেন, তৈমূর আলম খন্দকারের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে স্থানীয় অবস্থান ও সম্পর্ককে প্রাধান্য দিয়ে আমি নির্বাচনী মাঠে ছিলাম। যেটা আমার ভুল ছিল। বিএনপির অনেক নেতা মনে করেন, নাসিক নির্বাচনকে ইভিএম দিয়ে প্রভাবিত করা হয়েছে। অন্যান্য যে কোনো নির্বাচনে নির্বাচনী এলাকায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হলেও, এখানে তা হয়নি। নির্বাচনী ফল অনুকূলে রাখতে এ কৌশল নেওয়া হয়েছে। এ নির্বাচন বিএনপির জন্য শিক্ষণীয় ছিল। নির্বাচনী পরিবেশকে ঠিক রেখে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দৃশ্য বজায় রেখে ভোটের ফল উল্টিয়ে দেওয়ার প্রমাণ হচ্ছে এই নির্বাচন। ইভিএম দিয়ে নির্বাচনী ফলকে ম্যানুপুলেট করা যায়, এর প্রমাণও এই নির্বাচন। তাই নির্বাচনে পরাজয় ঘটলেও তৈমূরের মতো ত্যাগী ও বর্ষীয়ান নেতাকে দলের বাইরে রাখা ঠিক হবে না।
স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা জানান, ইভিএম ছাড়াও নাসিক নির্বাচনে অনেক কৌশল নিয়েছে ক্ষমতাসীন দল। এর মধ্যে তৈমূরকে আওয়ামী লীগের এমপি শামীম ওসমানের প্রার্থী হিসেবে অপপ্রচার ছিল অন্যতম। এর বাইরে তৈমূরের ভোট ব্যাংক হিসেবে পরিচিত গার্মেন্ট শ্রমিকদের জন্য সাধারণ ছুটি ঘোষণা না হওয়ায় তারা ভোট দিতে পারেননি। এ ছাড়া বিএনপির কেন্দ্র থেকে দলের নেতাকর্মীদের নির্বাচন থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে বলে এই ভোটেরও একটি অংশ তিনি পাননি। মূলত এই তিন কারণে তৈমূর হেরেছেন।
নাসিক নির্বাচন ও তৈমূরকে নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান সমকালকে বলেন, 'ব্যক্তিগতভাবে এটাকে আমি খুব স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখছি। নির্বাচনটি এ রকমই হবে, তা আমাদের জানা ছিল। তৈমূরের বিষয়ে দলের নেতারা মিলে সিদ্ধান্ত নেবেন।'
ঢাকা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বাবুল বলেন, নাসিক নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। তৈমূর নিজ সিদ্ধান্তে অংশ নিয়েছেন। দলের মধ্যে শৃঙ্খলা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তার বিষয়ে এখন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা সিদ্ধান্ত নেবেন।