যেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা! ভোটের বাঁশিতে ফুঁ দিলেই হলো- সবাই মজেন বাঁধভাঙা প্রেমে। ভোটের মাঠে প্রতিপক্ষ যে-ই থাকুক না কেন, নারায়ণগঞ্জের মানুষ চার-চারবার 'চ্যাম্পিয়ন ট্রফি'টা সেলিনা হায়াৎ আইভীর হাতেই তো তুলে দিলেন। নারায়ণগঞ্জ জয়ের পর স্বাভাবিকভাবেই গতকাল সোমবার নগরের পথেঘাটে, চায়ের টেবিলে মানুষের আলোচনার প্রধান কুশিলব ছিলেন এই 'ভোট জাদুকর'।
আলোচনায় সবাই খুঁজছিলেন আইভীর টানা ভোটজয়ের রহস্য, নেপথ্যের নিয়ামকগুচ্ছ। নগরের মানুষ মনে করে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অগ্নিকণ্ঠ আইভীকে ভোটের মাঠে অনেকখানি এগিয়ে রেখেছিল।
নারায়ণগঞ্জকে 'সন্ত্রাসের জনপদ' তকমা লাগিয়ে অভিযুক্তরা ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের জাতীয় নির্বাচনের পর উড়াল দেন ভিনদেশে। তখনকার সময়টা আওয়ামী লীগের জন্য ছিল প্রতিকূল। স্থানীয় আওয়ামী লীগ সে সময় বিদেশ থেকে উড়িয়ে আনে স্বাধীনতা-উত্তরকালে নারায়ণগঞ্জের প্রথম পৌর চেয়ারম্যান আলী আহাম্মদ চুনকার মেয়ে সেলিনা হায়াৎ আইভীকে। ২০০৩ সালে নারায়ণগঞ্জের পৌর নির্বাচনে চিকিৎসা শাস্ত্রে পড়াশোনা করা আইভী ছিলেন নবাগত। ১৯ বছরের ব্যবধানে সেই চুনকাকন্যার এখন দেশজুড়ে খ্যাতি। নাসিক নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকারকে ৬৬ হাজার ৫৩৫ ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে আরেকবার তিনি হলেন 'নগরকন্যা'।
দেশজুড়ে যখন চলছে একের পর এক প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন, তখন গত রোববার নারায়ণগঞ্জে হয়ে গেল একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ মডেল নির্বাচন। ২০২১ সাল থেকে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের সব নির্বাচন বর্জনের যে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে বিএনপি, তারই ধারাবাহিকতা নাসিক নির্বাচনেও বজায় রাখে দলটি। তবে দলীয় সিদ্ধান্ত উড়িয়ে দিয়ে হাতি প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে দলের সব পদ খোয়ান তৈমূর। এই নির্বাচনে নানা কারণে সরকারি দল আওয়ামী লীগ আইভীতেই ধরেছিল 'বাজি'। স্থানীয় আওয়ামী লীগের উপদলীয় কোন্দল ঠেকিয়ে শেষ পর্যন্ত দৃষ্টান্ত হওয়ার মতো এই নির্বাচনে নৌকা নিয়ে 'ভোটসমুদ্র' ঠিকই পাড়ি দিলেন আইভী।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ধীমান সাহা জুয়েল বলেন, 'অনেক দিন পর দেশে বলার মতো একটি নির্বাচন হলো। তবে নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের ফলে ভোট সংগ্রহ কাঙ্ক্ষিত সংখ্যক হয়নি।' তিনি ইভিএমের টেকনিক্যাল অ্যারর এবং মেশিন ব্যবহার সম্পর্কে নাগরিক সচেতনতা তৈরির ব্যর্থতার জন্য নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করেন।
নারায়ণগঞ্জের সুধীজন মনে করেন, তৈমূর ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে নিজের পার্থক্য বোঝাতে পারেননি। বরং নৌকা প্রতীক নিয়েও আইভী বুঝিয়ে দিয়েছেন, এটা আওয়ামী লীগের মার্কা হলেও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের নৌকাটা আইভীর নৌকা। নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি মাহাবুবুর রহমান মাসুম বলেন, 'নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের ভেতরে সরকারি আওয়ামী লীগ ও বিরোধী আওয়ামী লীগ- দুটি উপদল রয়েছে। সরকারি আওয়ামী লীগ হচ্ছেন ওসমানরা। আইভী সবসময়ই ওসমানদের নৈরাজ্যের বিরোধিতা করে এসেছেন। ত্বকী হত্যার বিরুদ্ধে আইভীর প্রতিবাদ, এই নগরের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তার অবস্থান তাকে এগিয়ে রেখেছিল। তার ভালো কাজের জন্য মানুষ তাকে ভোট দিয়েছে।'
আইভীর ঘনিষ্ঠজন নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি রফিউর রাব্বি মনে করেন, তৈমূর যত ভোট পেয়েছেন, তা তার পাওয়ার কথা ছিল না। আইভীকে নানান প্রতিবন্ধকতার মধ্যে নির্বাচন করতে হয়েছে। সেইসব প্রতিবন্ধকতার কিছু ছিল দৃশ্যমান, কিছু আবার অদৃশ্য- এসবই সরকার এবং সরকারি বিভিন্ন সংস্থার জানা আছে।' রফিউর রাব্বি বলেন, 'ইভিএম জটিলতায় সময়ক্ষেপণ না হলে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ভোট পড়ত এবার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে ভোটারদের অনেকেই ভোট না দিয়ে ফিরে গেছেন, বিশেষ করে নারীরা। নারায়ণগেঞ্জর নারীরা সবসময় একচেটিয়া ভোট দিয়েছেন আইভীকে।'
আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদ সদস্য ও আইভীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আনিসুর রহমান দিপু বলেন, সততা ও দলের প্রতি আনুগত্য আছে তার মধ্যে। তাই নগরবাসী তাকে বিমুখ করেনি।
নারায়ণগঞ্জের সংস্কৃতিকর্মী আফসার বিপুল বলেন, আইভীর নির্দলীয় ভাবমূর্তির বিপরীতে তৈমূরের সরকারদলীয় দুর্বৃত্তদের প্রতি আনুগত্য নৌকাকে এগিয়ে দিয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামালও মনে করেন, 'দলের কেন্দ্রীয় কিছু নেতা বিভিন্নভাবে দলের স্থানীয় নেতাদের হুমকি-ধমকি এবং টেলিফোন করে তৈমূরের পাশে না থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। এতে দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা বিভ্রান্ত হয়েছে। বিএনপির নেতাকর্মীরা তৈমূরকে ভোট দেননি। দিয়েছেন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ।'