মুখ বিড়বিড় করে হাতের আঙুলে কী যেন গুনছিলেন ত্রিশ পেরোনো রোজিনা। হঠাৎ পাঁচে এসে স্থির। প্রশ্ন ছুড়তেই বেরিয়ে এলো কষ্টকথা। হত্যাচেষ্টা মামলায় পাঁচ মাস ধরে স্বামী সিদ্দিক উল্লাহ কারাগারের চৌদ্দ শিকে বন্দি। এ ক'দিন দেখা হয়নি প্রিয় স্বামীর মুখখানা। তাই চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর থেকে ছুটে এলেন সাতসকালে, জেল রোডে।
করোনার ঝাঁজ চারদিকে। স্বজনের সঙ্গে কারাবন্দিদের দেখা-সাক্ষাতেও টানা হয়েছে লাগাম। অগত্যা কারাগার থেকেই স্বামী ফোন করে প্রিয়তমার খোঁজ নেন। দূর থেকে সন্তানদের কণ্ঠ শুনে ভালোবাসার তেষ্টা মেটান।
সপ্তাহ খানেক আগে সিদ্দিক উল্লাহ মোবাইল ফোনে রোজিনাকে জানান, জেল রোডে এলেই দেখা হবে তার (স্বামী) সঙ্গে। কথাও যাবে বলা! প্রথমে বিশ্বাস করেননি রোজিনা। পরে জেল রোডে এসে বুঝলেন, কথামতো কাজ। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের যমুনা ভবনের চতুর্থ তলায় স্ত্রীর অপেক্ষায় ছিলেন স্বামী। রোজিনা আসতেই কারাগারের জানালা দিয়ে চিৎকার করে নজরে পড়ার চেষ্টা করেন সিদ্দিক। জেল রোডের সীমানা প্রাচীরের কাছে যান রোজিনা। কখনও গলা ফাটিয়ে, আবার কখনও হাতের ইশারায় চলে কিছুক্ষণ ভালোবাসার আলাপন! কথা বলতে বলতে কাঁদেন অঝোরে। পরে চোখের পালকিতে প্রিয় মুখটাকে সঙ্গে নিয়ে ফেরেন নীড়ে।
শুধু রোজিনাই নন; নগরের জেল রোডের পাশে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের যমুনা ও হালদা ভবনের চতুর্থ ও পঞ্চম তলার আটটি ওয়ার্ডে বন্দি থাকা আসামিদের সঙ্গে প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বন্দির স্বজনদের এভাবেই ভালোবাসার রং বিলাতে দেখা যায়। তবে উঁচু ও সড়কের পাশে থাকা দুটি ভবনের আটটি ওয়ার্ডে থাকা বন্দিরা সহজেই জানালা দিয়ে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন, একনজর দেখতে পারেন প্রিয় মুখগুলো। তাই কারাগারে ১৫৭টি বন্দি ওয়ার্ড থাকলেও এই আটটিতে থাকার জন্য প্রায় সব বন্দিরই থাকে মরিয়া চেষ্টা।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার দেওয়ান মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, 'সড়ক থেকে নিরাপদ দূরত্বে রয়েছে কারাগারের যমুনা ও হালদা ভবন। বন্দি ভবনগুলো বহুতল হওয়ায় জানালা দিয়ে সহজেই সড়কে কেউ দাঁড়িয়ে থাকলে তা দেখা যায়। চিৎকার করে কথা বললে শোনাও যায়। তাই সড়কের ওপর এসে ওই ওয়ার্ডে থাকা বন্দিদের স্বজনরা চিৎকার করে কথা বলা ও দেখা করার চেষ্টা করেন। নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ঝুঁকি নেই। এ ছাড়া বাতাস চলাচল ঠিক রাখতে ওয়ার্ডগুলোর জানালাও রাখা হয় খোলা।
জেলার তারিকুল আরও জানান, জানালাগুলো চাইলে বন্ধ করে দিতে পারি। সেটা করলে বন্দিরা আলো-বাতাস ছাড়া কষ্ট পাবেন। নানা রোগের প্রাদুর্ভাবও দেখা দিতে পারে। তাই স্বাস্থ্যগত বিষয় বিবেচনায় কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। তবে এ কয়েকটি ওয়ার্ডে বিদেশি বন্দি তথা রোহিঙ্গাদের রেখে কিছুটা ঝামেলা কমানোর চেষ্টা করছি।
চট্টগ্রাম কারাগারে বন্দি বহুতল ভবন আছে ১৫টি। এর মধ্যে কারাগারের পাশে জেল রোডঘেঁষে রয়েছে হালদা ও যমুনা ভবন। যমুনা ভবনের ২০টি ওয়ার্ডের মধ্যে চতুর্থ ও পঞ্চম তলার ১৮, ১৯, ২০ ও ২১ নম্বর ওয়ার্ড এবং হালদা ভবনের ১৮টি ওয়ার্ডের মধ্যে চতুর্থ ও পঞ্চম তলার ১৮, ১৯, ২০ ও ২১ নম্বর ওয়ার্ড থেকে সড়কের লোকজন দেখা যায়। তাই বন্দি, কয়েদি ও হাজতিদের লোভনীয় এই আটটি ওয়ার্ড। এখন এসব ওয়ার্ডের প্রতিটিতে ৮০ থেকে ১০০ জন করে বন্দি বাস করে।
চট্টগ্রাম নগরের আমানত শাহ (রহ.) মাজার থেকে খাতুনগঞ্জের দিকে চলে যাওয়া সড়কটি জেল রোড। কারাগারের ১৮ মিটার উঁচু প্যারামিটার ওয়ালের কারণে যমুনা ও হালদা ভবনটির প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় বন্দি থাকা আসামিদের জেল রোড থেকে দেখা যায় না। সরেজমিন গত রোববার দেখা যায়, ওই আটটি ওয়ার্ডে থাকা বন্দিরা গাদাগাদি করে জানালার পাশে এসে নিচের দিকে তাকিয়ে আছেন। কোনো বন্দি স্বজন দেখলেই চিৎকার করে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। জানালা থেকে আঙুলের ইশারায় প্রকাশ করেন মনের ভাব।
পতেঙ্গার বাসিন্দা রমিজ উদ্দিন জানান, কারাগারে দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ থাকায় ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে পারছি না। জেল রোডে এলে দেখা ও কথার সুযোগ আছে জানার পরই এখানে ছুটে আসি। সড়কের ফুটপাত থেকে ভাইকে দেখলেও ঠিকমতো কথাবার্তা বলতে পারিনি। তবে হাতের ইশারায় অনেক কথা বলা হয়ে গেছে।
জেল রোডের মদিনা স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. রহমান বলেন, প্রতিদিন সকাল ৮-৯টা থেকে সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত দিনভর কোনো না কোনো বন্দির স্বজনরা এখানে এসে দেখা ও ইশারায় কথা বলার প্রতিযোগিতায় নামেন।