অভিনেত্রী রাইমা ইসলাম শিমুর বাবা মো. নুরুল ইসলাম রাঢ়ী তার মেয়ে হত্যার বিচার চেয়েছেন। তিনি হত্যাকারীদের ফাঁসি চান। এর আগে সোমবার দুপুরে কেরানীগঞ্জ থেকে বস্তাবন্দি ও খণ্ডিত অবস্থায় শিমুর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

খবর পেয়ে মঙ্গলবার ঢাকায় যাচ্ছিলেন শিমুর বাবা নুরুল ইসলাম। পথে মাওয়াঘাট থেকে ফোনে কেঁদে কেঁদে বলেন, আমার আদরের মেয়েটারে ওরা মেরে ফেলেছে। আমি আর কিছু চাই না এই মুহূর্তে। শুধু আমার মেয়ের হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।

শিমুর গ্রামের বাড়ি বরগুনার আমতলী উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের উত্তর তক্তাবুনিয়া গ্রামে। তার নানা বাড়ি একই উপজেলার আরপাঙ্গাশিয়া ইউনিয়নের তারিকাটা গ্রামে। কিন্তু শিমুর বাবা নুরুল ইসলাম গ্রামের বাড়ি ছেড়ে স্ত্রী, দুই ছেলে হারুন অর রশিদ, সাইদুল ইসলাম খোকন, শিমু ও ছোট মেয়ে ফাতেমাকে নিয়ে ১৯৯৫ সাল থেকে আমতলী শহরের ফেরিঘাটের সবুজবাগ এলাকায় বসবাস শুরু করেন।

শিমু তখন স্কুলছাত্রী। ছোটবেলা থেকেই তার নাচ-গানের প্রতি নেশা ছিল। আমতলীর বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও অংশ নিয়েছিলেন শিমু। তার মৃত্যুতে সেই এলাকায়ও শোকের ছায়া বিরাজ করছে।

১৯৯৬ সালে পারিবারিক কারণে শিমুর মা রাশেদা বেগম ছেলে-মেয়েদের নিয়ে ঢাকায় চলে যান। সেখানে বসবাসের সময় পরিচয় হয় পরিচালক কাজী হায়াতের সঙ্গে। ১৯৯৮ সালে চিত্রজগতে প্রবেশের পর আমতলীর ছোট শহরের মেয়ে শিমুর নাম রূপালী পর্দার বদৌলতে হয়ে যান রাইমা ইসলাম শিমু। এরপর একের পর এক বিভিন্ন সিনেমায় অভিনয় করা হয় তার।

আমতলীর তারিকাটা গ্রামে বসবাসরত শিমুর বড় মামা আনোয়ার হোসেন হাওলাদার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘মোর ভাগ্নিডারে ক্যানো ওরা মাইর্যাক হালাইছে। ও কী অপরাধ করছিল যে, এমন নির্দয়ভাবে খুন করতে হবে। আমি শিমু হত্যাকারীদের কঠোর শাস্তির দাবি জানাই।’

শিমুর ছোট মামা দেলোয়ার হাওলাদার পেশায় একজন শিক্ষক। তিনি বলেন, শিমু ছোটবেলা থেকেই দেখতে খুব সুন্দর ছিল। ওর অনেক গুণ ছিল। স্কুলজীবনে নাচ-গান নিয়ে থাকত। আমার সেই গুণী ভাগ্নিডারে খুনিরা মেরে ফেলেছে। এর বিচার চাই।

শিমুর মামাত বোন আছমা বেগম বলেন, শিমু আপা অনেক ভালো মানুষ ছিল। আমাদের অনেক আদর করত। এখন কে এই আদর করবে।

আমতলী উপজেলা উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি অশোক মজুমদার বলেন, আমাদের আমতলীর একজন গুণী শিল্পীকে যারা হত্যা করেছে, তাদের কঠোর শাস্তির দাবি জানাই।

শিমুর ছোট ভাই সাইদুল ইসলাম খোকন বলেন, আমার বোনকে এই সময়ে দাফনের জন্য আমতলী নেওয়া সম্ভব না। আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হবে।

খোকন আরও বলেন, শিমুর দুটি সন্তান রয়েছে। বড় মেয়ে রীত (১৭) এবং ছোট ছেলে রায়হান (৫)। ওরা এখন মা হারা হয়ে গেল। এসময় শিমুর একমাত্র বোন ফাতিমা নিশাও খুনিদের কঠোর শাস্তির দাবি জানান।

তিনি  বলেন, কেন কে আমার বোনকে হত্যা করেছে, আমরা এখনও বুঝতেই পারছি না। আমার বোন জামাইয়ের সঙ্গে বোনের তেমন কোনো কলহ ছিল না। তাদের ১৮ বছরের সংসার, তারা লাভ ম্যারেজ করেছিল।

তবে যে-ই এ হত্যা করুক, আমরা চাই, সঠিক বিচার হোক, আমরা মামলা করব, যোগ করেন ফাতিমা নিশা।

শিমুর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধারের একদিন পর পুলিশ তার স্বামী ও স্বামীর একজন বন্ধুকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশের দাবি, এরইমধ্যে তার স্বামী শাখাওয়াত আলী নোবেল এ হত্যার কথা স্বীকার করেছেন।

অথচ একদিন আগেই এই অভিনেত্রীকে নিখোঁজ উল্লেখ করে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন গ্রেপ্তার নোবেল।

রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতালে শিমুর মরদেহ শনাক্ত হওয়ার পর ফাতিমা নিশা সাংবাদিকদের জানান, বোনের ফোন বন্ধ পেয়ে এবং তিনি বাসায় না ফেরায় তাদের সন্দেহ হয়।

এরপর তারা হাসপাতাল, থানা ও এফডিসিতে খোঁজ নিতে শুরু করেন। কেরানীগঞ্জে অজ্ঞাত পরিচয়ের নারীর মরদেহ উদ্ধারের খবর জানতে পেরে তারা মিটফোর্ড হাসপাতাল মর্গে এসে বোনের খণ্ডিত মরদেহ দেখতে পান।

এর আগে সোমবার সকালে শিমু নিখোঁজ জানিয়ে কলাবাগান থানায় একটি সাধারণ ডায়রি করেন তার স্বামী। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, রোববার সকালে কাউকে কিছু না জানিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যান শিমু। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ।

কেরানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু সালাম মিয়া বলেন, মরদেহটি টুকরো করে দুইটি বস্তায় ভরে রাস্তার পাশে ফেলে রাখা হয়েছিল। তার গলায় একটি দাগও রয়েছে।

মঙ্গলবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন সরদার বলেন, মরদেহ শনাক্ত হওয়ার পর সোমবার রাতেই আমরা ঘটনাস্থলে যাই। সেখানে গিয়ে সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তার স্বামী এবং একজন বন্ধুকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করি। এরপর সাক্ষ্যপ্রমাণ ও প্রাথমিকভাবে তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।