গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভার উজিলাব গ্রামে দশ বছর আগে জাকির হোসেন ও খাদিজা আক্তারের কোল আলো করে এসেছিল ফুটফুটে এক কন্যাসন্তান। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী পরিবারের জন্ম নেওয়া সেই শিশুটির নাম রাখা হল জোনাকি আক্তার। কিন্তু জন্মের ক’দিন পর জানা গেল, সেই শিশুটি অন্ধ। 

নিয়তির নির্মম পরিহাস, সেই জন্মান্ধ শিশুটিকে বাবার জিম্মায় রেখে একদিন হুট করেই চলে যান মা খাদিজা। সন্তান জন্মান্ধ এটা মানতে পারেননি তিনি। জাকির হোসেনের পরিবারের সাত সদস্যও অন্ধ। অভিমানী মায়ের চলে যাওয়ার পর দাদীর স্নেহ-আতিশায্যে বড় হতে থাকে জোনাকি।

অভিশপ্ত শিশু জীবনে একদিন এলেন এক দিলদরিয়া মানুষ। গাজীপুরের ধনুয়া দক্ষিণপাড়া গ্রামের ব্যবসায়ী সাদ্দাম হোসেন এগিয়ে এলেন শিশুটির জন্য। তার সহযোগিতায় মঙ্গলবার রাজধানীর ফার্মগেটের ইস্পাহানী ইসলামি আই ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেলো জোনাকি।

সাদ্দাম হোসেন অনন্ত সমকালকে বলেন, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর আমি ত্রাণ সাহায্য নিয়ে বিভিন্ন গ্রামে ছুটে যাই। একদিন জানতে পারি, উজিলাব গ্রামে একই পরিবারের দৃষ্টিহীন ৮ সদস্য মানবেতর জীবনযাপন করছে। তারপর যাই জাকির হোসেনের বাড়ি, জানতে পারি জোনাকির কথা। আমার মনে হল, জোনাকির চোখে আবার আলো ফুটবে। আমি চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করি।

সাদ্দাম হোসেন প্রথমে মাওনা চৌরাস্তার শামীম চক্ষু হাসপাতালে নিয়ে যান জোনাকিকে। চিকিৎসক আশ্বস্ত করলেন। সম্পূর্ণ নিজের খরচে বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যেতে থাকেন সাদ্দাম। সালনা চক্ষু হাসপাতালের চিকিৎসকের পরামর্শে গত ৬ জানুয়ারি ফার্মগেটের ইস্পাহানী ইসলামি আই ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানকার চিকিৎসক নানারকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর জানান, জোনাকি চোখে দেখবে। চোখের ল্যান্স প্রতিস্থাপন করতে হবে।  

অবশেষে গত সোমবার সকালে এ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. সিরাতুম মুনিরার তত্ত্বাবধানে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। জোনাকির ডান চোখে প্রতিস্থাপন করা হয় কৃত্রিম ল্যান্সে। মঙ্গলবার জোনাকির চোখের ব্যান্ডেজ খুলে দেওয়ার পর সে প্রথম দেখতে পায় পৃথিবীর আলো। 

সমকালকে জোনাকি জানায়, দূরে একটু ঝাঁপসা দেখছে, তবে কাছের সব কিছুই স্পষ্ট। 

সাদ্দাম বলেন, চিকিৎসক জানিয়েছে দূরের জিনিসও স্পষ্ট দেখতে পাবে। তবে সময় লাগবে। জোনাকির বাঁ চোখেও ল্যান্স প্রতিস্থাপন করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

চোখের ব্যান্ডেজ খোলার পর আপ্লুত জোনাকি বলে উঠে, ‘হায় আল্লাহ! পৃথিবী এতো সুন্দর!’

জোনাকির বাবা জাকির হোসেন বলেন, ‘আমি অন্ধ মানুষ। আমার ঘর থেকে জন্ম নেওয়া জোনাকিও অন্ধ। জন্মের দশ বছর পর সাদ্দাম হোসেন অনন্তের মহানুভবতায় আজ আমার মেয়ে চোখে দেখতে পাচ্ছে। এর চেয়ে আনন্দের আর কী আছে!’