কুয়াকাটায় সমুদ্রতীরবর্তী হুইচ্যানপাড়ার কাছের ঝাউবনে পাওয়া গিয়েছিল প্রাচীন একটি নৌকা। সমুদ্রগামী পালতোলা যেসব নৌকা নিয়ে রাখাইনদের পূর্বপুরুষরা পটুয়াখালী ও বরগুনার উপকূলে ভিড়েছিল, সেই সব নৌকার একটি এটি। ভাঙনে উপকূলের বালু সরে যাওয়ায় নৌকাটি বেরিয়ে আসে। ২০১২ সালে যে স্থান থেকে অন্তত ২০০ বছরের পুরোনো নৌকাটি পাওয়া গিয়েছিল, সে স্থানটি এখন সমুদ্রে বিলীন হয়ে গেছে। সাগর ক্রমাগত এগিয়ে আসতে থাকায় সংকীর্ণ হয়ে এসেছে পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় স্থান কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত। এই সৈকতে এক সময় বড় বড় বালুর টিলা ছিল। কিন্তু এখন আর তা দেখা যায় না। কুয়াকাটা শহরই এখন দাঁড়িয়ে আছে সমুদ্রে হারানোর ঝুঁকি নিয়ে।
উপকূলে পাওয়া রাখাইনদের নৌকাটি সংরক্ষণ করা হয়েছে কুয়াকাটা পৌরসভার শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহার ও রাখাইন মহিলা মার্কেটের কাছে। কোনো এক রাখাইন মাতব্বরের নামে গ্রামটির নাম রাখা হয়েছিল হুইচ্যানপাড়া। এখন তা হয়ে গেছে হোসেনপাড়া। আদি নামহারা গ্রামটিতে রাখাইনদের একজনও নেই। নতুন যারা এসে বসতি গড়েছেন, তারাও উপকূলের দিকে সমুদ্রের ক্রমাগত এগিয়ে আসায় আতঙ্কিত।
গোড়া আমখোলা গ্রামের বাসিন্দা চোতেন রাখাইন বলছিলেন, সমুদ্রে বিলীন হয়ে যাওয়া লেম্বুপাড়া, বিলাচোপাড়া ও গেন্ডুপাড়ার কথা। কুয়াকাটা শহর থেকে সমুদ্রসৈকতে নেমে পশ্চিম দিকে তাকালেই দেখা যায় আন্ধারমানিক মোহনা। চোতেন রাখাইনের বর্ণনা অনুযায়ী বিলীন হয়ে যাওয়া রাখাইন গ্রাম তিনটি ছিল ওই মোহনার কাছে।
লেম্বুপাড়াসংলগ্ন পশ্চিম খাজুরার সত্তরোর্ধ্ব আলী হোসেন জমাদ্দার জানান, ওই তিন পাড়ার সাতটি খতিয়ানের সব জমি খেয়ে নিয়েছে সমুদ্র।
শুধু কুয়াকাটায় নয়, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির শীর্ষে থাকা রাষ্ট্রগুলোর অন্যতম বাংলাদেশের উপকূলবর্তী শহর, বন এবং দ্বীপগুলোর সর্বত্রই ভাঙন বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের উদ্বেগজনক অভিঘাত হচ্ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, যার ফলে ভাঙছে উপকূল। প্রশাসন এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠী এতদিন ভাঙনকে মোটাদাগে ভাঙা-গড়ার স্বাভাবিক প্রাকৃতিক নিয়ম হিসেবে দেখে এলেও এখন অস্বাভাবিকতা দেখতে পাচ্ছে। বর্তমানে চলা ভাঙনের সঙ্গে জমির গঠন খাপ খাইয়ে চলতে পারছে না বলেই নির্দেশ করছে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা এবং গবেষণার ফলাফল।
কুয়াকাটার পূর্বদিকে বঙ্গোপসাগরের দুই দ্বীপ হাতিয়া ও সন্দ্বীপের মূল ভূখণ্ড ২৪২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ছোট আকৃতি ধারণ করেছে। সিইজিআইএস-সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসের গবেষণায় তা দেখা গেছে। পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং ব্যবহারবিষয়ক কার্যক্রম পরিচালনায় বাংলাদেশ সরকারকে সহায়তা ও পরামর্শ প্রদানে নিয়োজিত এ প্রতিষ্ঠানের গবেষণাটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জার্নাল স্প্রিঙ্গারে গত জুলাইয়ে প্রকাশিত হয়েছে।
সিইজিআইএসের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মমিনুল হক সরকারের নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে। এতে বলা হয়, ১৯৪৩ থেকে ২০১৮ সাল, এই সময়ের মধ্যে ভূমি গঠনের তুলনায় ভাঙন বেড়ে গেছে। ২০১৮ সালে সন্দ্বীপের আয়তন দাঁড়িয়েছে ১৯৪ বর্গকিলোমিটারে, যা এই দ্বীপের ২৪২ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে ক্ষুদ্র আয়তন। দ্বীপটি সর্বোচ্চ আকার ধারণ করেছিল ১৭৭৬ সালে, যখন এর আকৃতি পৌঁছেছিল ৪৪০ কিলোমিটারে।
প্রায় দুই যুগ ধরে পটুয়াখালীতে উপকূল ভাঙছে অস্বাভাবিকভাবে, বিশেষ করে ২০০৭ সালের সুপার সাইক্লোন সিডর আঘাত হানার পর থেকে। পটুয়াখালী বন বিভাগের সার্ভেয়ার রেজাউল হক জানালেন, ভাঙনের কারণে এ পর্যন্ত দুই হাজার একরের বেশি জমি, যার ৪০০ একরেই ছিল উপকূল রক্ষার জন্য গড়ে তোলা ঝাউবন।
পটুয়াখালী বন বিভাগের ভূমি জরিপের সঙ্গে রেজাউল জড়িত আছেন ২০০২ সাল থেকে। উপকূলীয় এই এলাকাতে কাজে যোগদানের ওই সময়েও তিনি দেখেছেন বালুর বড় বড় টিলা, যেগুলো কোনো কোনোটা আধা কিলোমিটার লম্বাও হতো। টিলাগুলো সাধারণত জোড়ায় জোড়ায় থাকত এবং তাদের ওপরে বেড়ে উঠত এক বিশেষ ধরনের ঘাসের প্রজাতি। কুয়াকাটার সমুদ্রসৈকতজুড়ে বিস্তৃত এই টিলাগুলোর একটিও এখন আর নেই। কুয়াকাটা শহর রক্ষার জন্য দেওয়া হয়েছিল যে বাঁধ তা-ও হুমকির মধ্যে পড়েছে।
'সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উপকূলের সীমানা আরও ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে'- বলছে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত নিয়ে সম্প্রতি করা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) শিক্ষার্থীর একটি গবেষণা। পানিসম্পদ প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী দীপেন সাহা তার গবেষণায় দেখাচ্ছেন, ১৯৭৮ সাল থেকে ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের ১৪ কিলোমিটারই ভাঙছে। এই ভাঙন চলবে এবং ২০২৪ সাল নাগাদ উপকূলের সীমানা আরও ৪৮ মিটার মূল ভূমির দিকে ঢুকে যাবে। ২০২০ সাল পর্যন্ত গত ৪২ বছরে কুয়াকাটাতে ভাঙনের কারণে হারিয়েছে প্রায় পাঁচ বর্গকিলোমিটার এলাকা এবং অন্যদিকে নতুন ভূমি গঠিত হয়েছে চার বর্গকিলোমিটার।
কুয়াকাটা রক্ষা বাঁধ এই প্রথমবারের মতো এত প্রবলভাবে ভাঙনের হুমকিতে পড়েছে বলে জানালেন বুয়েটের পানিসম্পদ প্রকৌশল বিষয়ের অধ্যাপক আতাউর রহমান। এই শহর রক্ষা বাঁধ তৈরি হয়েছিল ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকের মধ্যে। অধ্যাপক আতাউর উপকূলের আরও নানা স্থানে ভাঙনের কথাও জানালেন। এগুলোর অন্যতম কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভে চলতে থাকা ভাঙন। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক হিসাবমতে, কুয়াকাটার উপকূল সীমানা ৩৫০ মিটার মূল ভূমির দিকে সরে এসেছে গত ১০ বছরে।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক 'ফ্রন্টিয়ার্স ইন মেরিন সায়েন্স' নামে বৈজ্ঞানিক জার্নালে এই বছরের জুলাইয়ে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ১৯৮৯ ও ২০২০ সালের মধ্যে প্রতি বছর শূন্য দশমিক ৩২ বর্গকিলোমিটার করে মূলভূমির দিকে সরে এসেছে কুয়াকাটা উপকূলের সীমানা।
'জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যে ভাঙন, তা কখনোই আগের মতো হবে না। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ধরন থেকে বর্তমান ভাঙনকে ব্যাখ্যা করার মতো যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত আমরা এখনও সংগ্রহ করতে পারিনি'- বললেন আতাউর রহমান।
উপকূলের মানুষ অবশ্য বলছেন, সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার ধরনে পরিবর্তন এসেছে। গঙ্গামতির চরের নিজাম হাওলাদার নামে এক দোকানদার বলছিলেন এই পরিবর্তনের কথা। চল্লিশোর্ধ্ব নিজাম বলেন, 'জোয়ারে এহন অনেক পানি ওডে, গাছগাছালি পর্যন্ত ডুইব্যা যায়। বিশেষ কইর‌্যা আষাঢ় মাসে পানি বেশি ওডে, বড় বড় ঢেউ আছড়াইয়া পড়ে গঙ্গামতির বনের ওপরে।'
গঙ্গামতির চরে মূল উপড়ে পড়ে আছে অনেক গাছ, মরে যাওয়া ফ্যাকাশে সাদা কাণ্ডের ওপর ভর দিয়ে। এর মধ্যে অনেক কেওরা গাছ আছে, এই চরে যে বন তার ভেতরের সবটা এলাকায় পানি ছড়িয়ে পড়ে জোয়ারের সময়। এই বনের সামনের দিকটাকে দূর থেকে মনে হয় গাছেদের এক বড় কবরস্থান। কিছু গাছ আছে এখানে, যাদের গলা পর্যন্ত দেবে আছে বালূতে। আগে এই বন ও সমুদ্রের মধ্যে ছিল এক বিশাল সৈকত, যার বুকে ছিল বালুর টিলা ও ঝাউবন।
গত বর্ষায় কুয়াকাটা সৈকতের ট্যুরিজম পার্ক, ইসলামিয়া মাদ্রাসা পয়েন্ট, বেড়িবাঁধসহ বিভিন্ন স্পট ধসে গেছে। এরই মধ্যে প্রায় সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে দর্শনীয় স্থান নারিকেল বাগান ও জাতীয় উদ্যান। সৈকত চলে এসেছে কুয়াকাটা চৌমাথার ২০০ ফুটের মধ্যে।