ছহিউদ্দিন ডিগ্রি কলেজের প্রতিষ্ঠা ১৯৯৪ সালে। মেহেরপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র মোতাচ্ছিম বিলাহ মতু জেলার শিক্ষার মানোন্নয়নে আড়াই একর জমির ওপর গড়ে তোলেন কলেজটি। শহরের লোকালয় থেকে এক কিলোমিটার উত্তরে দুটি বিভাগের অধীনে অল্প কিছু শিক্ষার্থী আর ১৮ জন শিক্ষক নিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়। আগে প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল পৌর কলেজ। বছর দুয়েক আগে নামটি পরিবর্তন করে জেলার মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা ছহিউদ্দিনের নামে করা হয়- ছহিউদ্দিন ডিগ্রি কলেজ।
প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক ১৮ জনের একজন হলেন ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাসুদ রেজা। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে নাড়ির টানে চলে আসেন মেহেরপুরে। আজ কলেজটি যে স্বনামে মহিমান্বিত, তা মাসুদ রেজার প্রকৃতিপ্রেমেরই ফসল। তিনি তিল তিল করে এ কলেজের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে চলেছেন।
যে কলেজে এক সময় ভর্তির কথা বললে শিক্ষার্থীরা মুখ ফিরিয়ে নিত, সেই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারাই আজ গর্বের। কলেজের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রায় প্রতিদিনই আসেন প্রকৃতিপ্রেমীসহ দর্শনার্থীরা। শহরের ব্যস্ত মানুষও একঘেয়েমি জীবন থেকে কিছু সময় দূরে থাকতে বিকেল হলেই ছুটে আসেন এই কলেজ ক্যাম্পাসে। বুকভরে নেন নির্মল বাতাস।
শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রকৃতির সৌন্দর্যকে আরও ফুটিয়ে তুলতে বিশেষ করে পাখিদের অভয়াশ্রম তৈরি করতে বিকেল হলেই ক্যাম্পাসে ছুটে আসেন মাসুদ রেজা। মালী নজরুল ইসলামকে নিয়ে, কখনও একাই গাছের পরিচর্যা করেন তিনি। গাছের গোড়ায় পানি ও সার দেওয়া, মাটি খুঁড়ে দেওয়া, ডাল ছাঁটাইসহ নানা পরিচর্যা করেন নিজ হাতে। বিরল প্রকৃতির আর ঔষধি গাছ সংগ্রহ তার নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাখিদের অভয়াশ্রম তৈরি করতে গাছের ডালে ডালে কলস ও ঝুড়ি বেঁধে দিয়েছেন। সেখানে পাখিরা কিচির-মিচির করে আনন্দে মেতে থাকে।
ঢাকা বার্ড ক্লাবের সদস্য এমএ মুহিত এই কলেজে এসে বিলুপ্তপ্রায় পাখি জারডোন্স লিপের সন্ধান পেয়েছেন। বর্তমানে তিনি পাখিটি নিয়ে গবেষণা করছেন। এ ছাড়া বিরল প্রজাতির পেঁচা, শালিক, দোয়েল, ঘুঘু, ফিঙে, টুনটুনি, বেনে বৌ বাসা বেঁধে আর বাচ্চা ফুটিয়ে থাকছে ইচ্ছেমতো। ক্যাম্পাসে রয়েছে কচ্ছপ, মাছ ও লালপদ্ম। মৌসুম এলেই ফোটে জাতীয় ফুল শাপলা। কলেজের বারান্দায় ফোটে বাহারি ফুল।
মাসুদ রেজা মনে করেন, মানুষ তার ভালো কর্মফলের মাধ্যমে বেঁচে থাকে। এই দুষ্প্রাপ্য গাছ, পাখি, প্রকৃতির মাঝেই বেঁচে থাকতে চান তিনি। এ কাজে তাকে প্রথম উৎসাহ জোগান গাংনী ডিগ্রি কলেজের একই বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক এনামুল আযীম। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকে আমার ইচ্ছা ছিল প্রকৃতি নিয়ে কাজ করা। আমার সক্রিয় অংশগ্রহণ, মাসুদের আন্তরিকতা, ছহিউদ্দিন ডিগ্রি কলেজ কর্তৃপক্ষের সক্রিয় সহযোগিতায় আজ কলেজটি বিরল প্রজাতির পাখি ও গাছে ভরে গেছে।
সহকারী অধ্যাপক মাসুদ রেজার তথ্যানুযায়ী, শুধু জেলাতেই নয়; বর্তমানে এ কলেজে ফলদ, বনজ ও ঔষধি মিলে অন্তত পাঁচশ প্রজাতির গাছ আছে। কলেজের ছাত্রী রুবানা খাতুন বলেন, মাসুদ স্যারের এই নিঃস্বার্থ কাজ দেখে উৎসাহ পাই আমরা। তিনি কোনো কাজকে ছোট মনে করেন না।
কলেজের অধ্যক্ষ একরামুল আযীম বলেন, আমরা আসলেই গুণী মানুষ পেয়েছি। যার কল্যাণে কলেজের শুধু সৌন্দর্যবর্ধনই হচ্ছে না; শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় মনোযোগী হওয়ার পরিবেশও তৈরি করেছেন মাসুদ রেজা। বেড়েছে কলেজের সুনাম। জেলার অন্যান্য কলেজের চেয়ে এ কলেজের ফলও খুব ভালো। শিক্ষার্থীরা এখন এখানে ভর্তি হওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে।