রংপুর শহরে এসে পা রাখলেই চোখে পড়বে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের ছবি সংবলিত বিশাল বিশাল বিলবোর্ড ও ফেস্টুন। এতে রংপুর সিটি করপোরেশন (রসিক) নির্বাচনের মেয়র পদে নগরবাসীর দোয়া চাওয়া হয়েছে।
'খুব শিগগির সিটি নির্বাচন নাকি?'- জানতে চাইলে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক তাবিউর রহমান প্রধান সমকালকে বলেন, নির্বাচন আগামী ডিসেম্বরে। অথচ এখনই বিলবোর্ডে শুরু হয়েছে দোয়া চাওয়া, জনসাধারণকে সালাম জানানো।
অবাক করা ব্যাপার হলো, যেই নগরবাসীর দোয়া ১১ মাস আগেই চাইতে শুরু করেছেন সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীরা, সেই ভোটারদের বড় একটি অংশই এখনও গ্রামে বাস করেন। সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত হলেও এগুলো এখনও পুরোপুরি গ্রাম। ৩৩টি ওয়ার্ড সংবলিত এই সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মূল সড়ক বাদে বাকিগুলো কাঁচা রাস্তা। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে চলছে ধান ও আলুর চাষ। পাকা সড়কই নেই, তাই সড়কবাতির আশা করা আদিখ্যেতা বৈকি। নূ্যনতম নাগরিক সেবা নেই অনেক এলাকায়। এ নিয়ে নগরবাসীর আক্ষেপও কম নয়। আর এভাবেই প্রতিষ্ঠার দশম বর্ষ ছুঁতে চলেছে রংপুর সিটি করপোরেশন। বিশ্নেষকরা বলছেন, এটা দেশের 'সবচেয়ে অবহেলিত' সিটি করপোরেশন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও এই সিটি করপোরেশনের নেই কোনো মাস্টারপ্ল্যান, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, এমনকি জনবল কাঠামোও। তাই যত্রতত্র গড়ে উঠছে অবকাঠামো। মূল নগরীতে আছে যানজট নামের বিষফোড়া। বর্ষায় জলাবদ্ধতায় সড়কে স্পিডবোটে চলে উদ্ধার কার্যক্রম। মূল নগরীর বাইরে পৌঁছায়নি নাগরিক সেবা। গ্রামীণ কাঁচা সড়কগুলো পাকা হয়নি। তবে করের আওতায় এসেছেন পুরো নগরবাসী।
এভাবে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ধুঁকে ধুঁকে চলছে এ নগর। অন্য সিটি করপোরেশনগুলো হাজার কোটি টাকা সরকারি বরাদ্দ পেলেও উত্তরের অবহেলিত এ নগরের উন্নয়ন বরাদ্দ শত কোটি টাকার ঘর ছাড়াতে পারেনি আজও।
২০১২ সালের ২৬ জুন রংপুর সিটি করপোরেশন যাত্রা শুরু করে। ২০৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ নগরীতে সদর উপজেলার ১০টি এবং কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলার একটি করে ইউনিয়ন সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত হয়।
সাবেক পৌরসভার ১৫টি এবং বর্ধিত এলাকার আরও ১৮টি ওয়ার্ড আছে এ নগরীতে। ২০১২ সালের ২০ ডিসেম্বর এ সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু প্রথম নগরপিতা নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে দ্বিতীয় নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। দুই মেয়রের আমলে মূল শহরে চার লেন মহাসড়ক, বাঘ চত্বর, মূল নগরীর পাকা সড়ক, আধুনিক কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, নগর মাতৃসদন, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ হয়েছে।
অন্যদিকে মূল নগরীতে যত্রতত্র গড়ে উঠছে বহুতল ভবন। এ ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না কোনো বিল্ডিং কোড। ফলে অগ্নিনির্বাপণে প্রায়ই নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয় ফায়ার সার্ভিসকে। মূল নগরীর বুক চিরে বয়ে যাওয়া শ্যামাসুন্দরী খাল সংস্কার না হওয়ায় প্রতি বছর বর্ষায় নগরবাসীকে জলাবদ্ধতার শিকার হতে হয়।
এদিকে সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর থেকে হুহু করে বাড়ছে নগরীর জনসংখ্যা। সিটি করপোরেশনের তথ্য মতে, বর্তমান এ নগরীতে প্রায় ১০ লাখ মানুষ বসবাস করে। বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে একটি ভবনে সেবা প্রদান করা হচ্ছে। ফলে সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। দূরের কোনো সেবাগ্রহীতা সিটি করপোরেশন ভবনে সেবা নিতে এলে সারাদিন কেটে যায়। সেবাপ্রাপ্তির ব্যয়ও বেড়ে যায়। নগরীর বর্ধিত অংশের শ্রমজীবী নগরবাসী নিতে পারছে না নগরসেবা।
অন্যদিকে নগরীর বর্ধিত এলাকাগুলোতে পৌঁছায়নি কলের পানি ও পয়ঃনিস্কাশন সুবিধা। ইউনিয়ন পরিষদে থাকাকালে বর্ধিত এলাকায় দরিদ্ররা কাবিখা, কাবিটা, টিআরসহ নানা সহায়তা পেত। হাতের নাগালে পেয়েছিল ইউনিয়ন পরিষদের সব সেবা। সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ফলে বন্ধ হয়ে গেছে সেসব সুবিধা।
৮ নম্বর ওয়ার্ডের ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম বলেন, সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর নগরীতে বহু মানুষের বসতি গড়ে উঠেছে। খাল-পুকুর ভরাট করে মানুষ ঘরবাড়ি তৈরি করেছে। ফলে বাড়িতে ব্যবহূত পানি যাওয়ার জায়গা নেই। ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষায় চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে।
নেই মাস্টারপ্ল্যান, জনবল কাঠামো : সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিদিনই দোকানপাট, বড় বড় শপিংমল ও বহুতল আবাসিক ভবন গড়ে উঠছে। এসব অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে মাস্টারপ্ল্যান ছাড়াই। পরিকল্পিত রাস্তাঘাট, হাটবাজার, ভবন গড়ে না ওঠার কারণে বাড়ছে যানজট ও দুর্ঘটনা। ভূমিকম্পসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতা হারাচ্ছে সিটি করপোরেশন। পরিকল্পিতভাবে নগর উন্নয়নে ২০১৪ সালে মাস্টারপ্ল্যান প্রস্তুত করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও তা এখনও ঝুলে আছে। এটা সংশোধন করে সম্প্রতি তা আবার মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রণালয়। সংশোধিত মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে সুধী সমাজের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে সেটি দ্রুত মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ নজরুল ইসলাম বলেন, মাস্টারপ্ল্যান না থাকায় পৌরসভা থাকাকালে যেভাবে ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে নকশা পাস করা হতো, এখনও সেভাবেই চলছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে নাগরিক সমস্যা বাড়ছে।
সাবেক পৌরসভার জনবল কাঠামো দিয়ে রংপুর সিটি করপোরেশনের নাগরিক সেবা ও উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে। প্রায় ৯ বছর ধরে জনবল কাঠামো অনুমোদন ঝুলে আছে মন্ত্রণালয়ে। জানা গেছে, সাবেক পৌরসভার ২৬৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে রংপুর সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম শুরু হয়। মৃত্যু ও অবসরজনিত কারণে বর্তমানে সিটি করপোরেশনের ১৮টি শাখায় স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন ২১৪ জন। এ ছাড়া মাস্টাররোলে ৯৩ জন ও দৈনিক হাজিরাভিত্তিক ৩০২ জন জনবল কাজ করছে। ফলে অস্থায়ী জনবল দিয়ে নগরবাসীর সেবা ও উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।
রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন মিঞা বলেন, জনবল কাঠামো জনপ্রশাসন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে পাস হয়েছে। বর্তমানে এটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পাস হলে নতুন জনবল নিয়োগ করা যাবে।
২০১৪ সালের জুনে রংপুর, সিলেট ও বরিশাল বিভাগে নতুন করে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের অনুমোদন দেয় প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটি। তবে এখনও আলোর মুখ দেখেনি রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। মেয়র মোস্তাফিজার রহমান সমস্যার কথা স্বীকার করে সমকালকে বলেন, সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর সবকিছু নির্ভর করছে।
সুশীল সমাজের ভাবনা :মহানগর সুজনের সভাপতি অধ্যক্ষ খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, পরিকল্পিতভাবে নগরের উন্নয়ন না হওয়ায় যানজট বাড়ছে। বিল্ডিং কোড না মেনে বহুতল ভবন নির্মাণ হচ্ছে, ফায়ার ফাইটিং মানা হচ্ছে না। সরকার এ নগরের উন্নয়নে কেন গুরুত্ব দিচ্ছে না, তা ভাবার বিষয়।
উন্নয়ন গবেষক অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, দেশের সবচেয়ে সুন্দর ও পরিকল্পিত নগরী হওয়ার কথা ছিল রংপুর সিটি করপোরেশনের। কিন্তু বর্তমানে এটি সবচেয়ে অবহেলিত ও পিছিয়ে থাকা নগরী। পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গড়ে তোলা প্রয়োজন। নগরীতে যত্রতত্র কলকারখানা, আবাসন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। এ নগর পুরান ঢাকার চেয়েও খারাপ অবস্থার দিকে যাচ্ছে।