গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের ভেতরেই জন্ম হয়েছিল জেব্রাগুলোর। এখানকার আলো, বাতাস ও পরিবেশেই বড় হয়েছিল। হঠাৎ করে ২০ দিনের ব্যবধানে পার্কের কোর সাফারির অভ্যন্তরেই ৯টি জেব্রার মৃত্যু হয়। কিন্তু কি কারণে মৃত্যু হয়েছে সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারছে না পার্ক কর্তৃপক্ষ। এই ব্যাপারে মঙ্গলবার জরুরি বোর্ড মিটিং ডাকা হয়েছে।

শত্রুতাবশত কেউ হত্যা করেছে, নাকি খাবারে বিষক্রিয়ায় ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে মৃত্যু হয়েছে অথবা কোনো রোগে আক্রান্ত হয়ে ৯ জেব্রার মৃত্যু হলো - এসব বিষয় মাথায় রেখেই সঠিক কারণ অনুসন্ধান চলানো হচ্ছে। ৯ জেব্রার এমন রহস্যজনক মৃত্যুর সঠিক কারণ বের করার জন্য মরদেহগুলোর ময়নাতদন্ত শেষে বিভিন্ন ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে স্যাম্পল। পার্কের দায়িত্বে থাকা সহকারী বন সংরক্ষক মো. তবিবুর রহমান জানান, করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রাণিগুলোর মৃত্যু হয়েছে কিনা সে বিষয়টিও  বিবেচনায় রয়েছে। 

এদিকে ৯টি জেব্রার মৃত্যুর বিষয়টি গণমাধ্যমের কাছে এতো দিন গোপন রেখে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তারা বলছেন, এটা পরিকল্পিত হত্যা  কিনা সেটাও তদন্ত করে বের করা উচিৎ।

পার্ক সূত্র জানায়, বিভিন্ন সময় সাফারি পার্কের কোর সাফারির ভেতরেই ওই ৯টি জেব্রার জন্ম হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করে গত ২ জানুয়ারি ৬টি জেব্রার মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখে কর্তৃপক্ষ। সোমবার পর্যন্ত আরও ৩টির মৃত্যু হয়। 

পার্কের এক কর্মচারী জানান, এ ঘটনার পর সকল কর্মচারী কর্মকর্তাকে ডেকে নিয়ে বিষয়টি কাউকে না জানানোর জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। এ কারণে তারা মুখ খুলেননি। এরই মধ্যে আরও কয়েকটি জেব্রা অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। সুস্থও হয়ে উঠেছে জেব্রাগুলো। গত শনিবার  পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব  মো. মোস্তফা কামাল ও প্রধান বনসংরক্ষক মো. আমিন উদ্দিন চৌধুরী পার্ক পরিদর্শন করে গেছেন। জেব্রার মৃত্যুর বিষয়টি তাদেরকে অবহিত করা হয়েছে বলে জানান পার্কের কর্মকর্তারা। 

বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের প্রকল্প পরিচালক জাহিদুল কবির বলেন, ঘটনার পর থেকেই বিষয়টি নজরদারি করছি। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ও বিভিন্ন ল্যাবরেটরিতে প্রত্যেকটা মৃতদেহের স্যাম্পল পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, আইইডিসিআরসহ বেশ কয়েকটি  প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছে। কিছু রিপোর্ট এসেছে, কিছু আসেনি। মঙ্গলবার জরুরি বোর্ড মিটিং ডাকা হয়েছে। সেখানে রিপোর্টগুলো উপস্থাপন করা হবে। পরে  বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগণ সিদ্ধান্ত দেবেন। 

তিনি বলেন,  কোনো সন্দেহই আমরা উড়িয়ে দিচ্ছি না। খাবারে বিষক্রিয়া হতে পারে, পয়জিং হতে পারে, ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হতে পারে। আবার লোকজন শত্রুতাও করতে পারে। এই সব বিষয়ই বিবেচনায় রয়েছে। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের পরামর্শেই কাজ চলছে বলে জানান তিনি।

এ ঘটনায় এখনও কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। প্রয়োজন হলে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। এ প্রসঙ্গে জাহিদুল কবির বলেন, মঙ্গলবারের বোর্ড সভা শেষে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট প্রধান বনসংরক্ষকের কাছে দেওয়া হবে। তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন তদন্ত কমিটি গঠন করবেন কি না। 

বিশেষজ্ঞ প্রাণি চিকিৎসক ও ঢাকা চিড়িয়াখানার সাবেক পরিচালক ডা. এবিএম শহিদুল্লাহ বলেন, কী কারণে জেব্রাগুলোর মৃত্যু হয়েছে সেটা বোঝা যাচ্ছে না। প্রাথমিকভাবেও কিছু ধারণা করা হচ্ছে না। জেব্রার অঙ্গ, মাংস, রক্ত ও মল পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে। ওখান থেকে প্রতিবেদন দিলে কারণটা বলা যাবে। 

পার্কের দায়িত্বে থাকা সহকারী বনসংরক্ষক মো. তবিবুর রহমান বলেন, জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তার উপস্থিতিতে মরদেহগুলোর ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। পরে স্যাম্পল সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়। সব শেষে জেব্রাগুলো মাটিচাপা দেওয়া হয়।  ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে করোনার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা উকিল উদ্দিন। 

তবিবুর রহমান বলেন, প্রাথমিকভাবে করোনা নেগেটিভ এসেছে। মানুষের করোনা পরীক্ষা আর প্রাণির করোনা পরীক্ষার মধ্যে একটু পার্থক্য রয়েছে। প্রাণির করোনা পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল আসতে একটু বিলম্ব হবে।