আলী ইমাম মজুমদার ২০০৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিব ছিলেন। একই সময়ে তিনি যুগপৎ প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবেও পূর্ণকালীন দায়িত্ব পালন করেন। তার আগে তিনি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭ সালে প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেওয়ার পর তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত সচিবসহ আমলাতন্ত্রের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির মহাসচিব। সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের নির্বাহী সদস্য আলী ইমাম মজুমদার জাইকাসহ বিভিন্ন সংস্থায় পরামর্শক হিসেবেও কাজ করেছেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগ থেকে ১৯৭৩ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তার জন্ম ১৯৫০ সালে।
সমকাল: যতদূর জানা যাচ্ছে, স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম ডিসি-এসপি সম্মেলন উদ্বোধন হয়েছিল ১৯৭৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। স্বাধীনতার আগেও কি এ ধরনের সম্মেলন হতো?
আলী ইমাম মজুমদার: আমি তখন প্রশাসন ক্যাডারে ছিলাম না। কিন্তু পরে রেকর্ড দেখেছি যে, স্বাধীনতার আগেও এভাবে জেলা প্রশাসকদের সম্মেলন হতো।
সমকাল: এ ধরনের সম্মেলনের আইনগত ভিত্তি কী?
আলী ইমাম মজুমদার: এর আইনগত ভিত্তি নেই। কিন্তু প্রশাসনের দায়িত্ব হচ্ছে সরকারের আইন ও নীতি কার্যকর করা। যেহেতু জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকারের মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালিত হয়; সরকারের নীতি ও কর্মসূচি তাদের কাছে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন আছে। নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নেও তাদের কাছ থেকে মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা শোনার প্রয়োজন আছে। মাঠ প্রশাসনে যাতে শৈথিল্য না আসে, সে জন্য এভাবে একত্র করে তাগিদ দেওয়াও জরুরি।
সমকাল: নির্বাচনের আগের বছর হিসেবে এবারের ডিসি সম্মেলনের কি আলাদা তাৎপর্য রয়েছে?
আলী ইমাম মজুমদার: দেখুন, গত দুই বছর ডিসি সম্মেলন হতে পারেনি করোনা পরিস্থিতিতে। যদিও করোনার প্রথমদিকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তারা নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে প্রয়োজনমতো কথা বলতে পেরেছেন। এবারও কয়েক দফা পিছিয়ে তারপর ডিসি সম্মেলন হলো। এবারের সম্মেলন যে কারণে প্রশাসনিক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল; রাজনৈতিক দিক থেকে তা নয়।
সমকাল: এ ধরনের সম্মেলনের মাধ্যমে জেলা প্রশাসকরা কি সরকারের ভেতরেই একটি শক্তিশালী প্রেশার গ্রুপ হিসেবে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে?
আলী ইমাম মজুমদার: মোটেই না। আমি তা মনে করি না। আমলাতন্ত্রের মধ্যম স্তর সরকার ও রাষ্ট্রের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্তর। তাদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা হওয়া উচিত।
সমকাল: কিন্তু জেলা প্রশাসক পর্যায়ের কর্মকর্তারা তো প্রায়শ বদলি হন। ডিসি সম্মেলনের সিদ্ধান্তগুলো তাহলে ব্যক্তিনির্ভর হয়ে যায় না?
আলী ইমাম মজুমদার: দেখা যাবে, এ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী ২০ জন বদলি হয়ে গেছেন। নতুন ২০ জন এসেছেন। তাতে খুব বেশি সমস্যা হবে না। কারণ যে কোনোভাবে হোক, ব্যক্তিই প্রশাসন গড়ে তোলেন। নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত জোরদার হবে কিনা, পরিবর্তন হবে কিনা, এমনকি বাতিল হবে কি-না, সে জন্য ব্যক্তির ওপরেই নির্ভর করতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তির অতি উৎকর্ষের যুগেও নেপথ্যে থাকেন একজন ব্যক্তি। সামরিক বা বেসামরিক প্রশাসন; যাই হোক ব্যক্তিই চালান। মূল বিষয় হচ্ছে, সিস্টেম ডেভেলপ করা গেছে কিনা। সে ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এ ধরনের সম্মেলনের গুরুত্ব অবশ্যই রয়েছে।
সমকাল: জেলা পর্যায়ে তো আরও অনেক কর্মকর্তা থাকেন। যেমন কৃষি, প্রাণিসম্পদ, তথ্য কর্মকর্তা। তাহলে তাদেরও কি এ ধরনের সম্মেলন প্রয়োজন?
আলী ইমাম মজুমদার: সেটা হতে পারে; তাতে তো দোষের কিছু নেই। কিন্তু জেলা প্রশাসক যেহেতু গোটা জেলার সব কর্মকর্তার মধ্যে সমন্বয় করেন, সেহেতু তার মাধ্যমেই সরকারের নীতি ও কর্মসূচি জেলা পর্যায়ে বাস্তবায়ন হতে পারে।
সমকাল: আগে তো এসপিরাও জেলা প্রশাসকের তদারকিতে থাকতেন। এখন তারা আলাদা হয়েছেন। ঢাকায় ইতোমধ্যে পুলিশ সপ্তাহ শুরু হয়েছে।
আলী ইমাম মজুমদার: এখনও জেলা প্রশাসক ও এসপির মধ্যে সম্পর্কের আইনগত কোনো পরিবর্তন হয়নি। এখনও জেলার সামগ্রিক দায়িত্ব জেলা প্রশাসকের। জেলায় আইনশৃঙ্খলার অবনতি হলে এসপির সঙ্গে সঙ্গে জেলা প্রশাসককেও বদল হতে হয়। নির্বাচনী ব্যবস্থায় সেনাবাহিনী, বিজিবি মোতায়েন হতে পারে, পুলিশ থাকে। তাদের সবাইকে সমন্বয় করেন জেলা প্রশাসক। মাঠ প্রশাসনের সব বিভাগের সমন্বয়ক হচ্ছেন জেলা প্রশাসক।
সমকাল: এবার ডিসি সম্মেলনে তো জেলার উন্নয়ন প্রকল্পও তদারকির দায়িত্ব পেতে চেয়েছেন ডিসিরা।
আলী ইমাম মজুমদার: সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সরকারপ্রধানের বক্তব্য যদি আপনি শুনে থাকেন, দেখবেন তিনি বলেছেন, ডিসিরা আগে থেকেই জেলার উন্নয়ন প্রকল্পের তদারকি করেন; খোঁজখবর রাখেন। নতুন করে কিছু নয়। আমি কক্সবাজার ও সিলেটে ডিসি ছিলাম। তখন যে উপকূলীয় বাঁধ হয়েছে, মহাসড়ক হয়েছে; সেগুলোর তদারকি আমি করেছি। জেলা প্রশাসকরা জনসাধারণের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন। জনগণ তাদের ওপর নির্ভর করে। কোনো সমস্যা হলে ডিসি সাহেবকে জানায়। আমি বিভিন্ন সময় উন্নয়ন প্রকল্পের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রকৌশলীদের যখন কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছি, তারা মর্যাদার সঙ্গে গ্রহণ করেছেন এবং ঠিকাদারদের বলে দিয়েছেন।
সমকাল: তাহলে নতুন করে তদারকি করতে চাওয়ার দাবি উঠল কেন?
আলী ইমাম মজুমদার: এটা আসলে ঢালাও দাবি নয়। তারা হয়তো ছোট প্রকল্পগুলোর কথা বলেছেন। প্রকল্পের ধরনের ওপর নির্ভর করে, কোন প্রকল্প ডিসিরা তদারকি করতে পারবেন। যেমন রূপপুর পরমাণু প্রকল্প। কারিগরি দিক থেকে এখানে পাবনার ডিসির কিছু করার নেই। উচ্চ প্রযুক্তিগত প্রকল্প এলাকাগুলোতে শুধু নির্ধারিত বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরাই প্রবেশ করতে পারবেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সব ধরনের প্রকল্পেই ভূমি অধিগ্রহণের সময় জেলা প্রশাসকদের কাজ করতে হয়। এখন প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় তাদের মতামত ও পরামর্শ নিলে এ ক্ষেত্রে জটিলতা কম হবে। সেটাই হয়তো বলতে চেয়েছেন কেউ কেউ। এ ছাড়া প্রকল্পটি সময়মতো শেষ হচ্ছে কিনা; গুণগত মান রক্ষা হচ্ছে কিনা, সেটাও ডিসিরা দেখতে চাইতে পারেন।
সমকাল: জাতিসংঘ মিশনে প্রশাসন ক্যাডারদের পাঠানোর দাবিও উঠেছে-
আলী ইমাম মজুমদার: প্রশাসন ক্যাডাররা জাতিসংঘ মিশনে যেতেই পারেন। এখানে আমি অসুবিধার কিছু দেখি না। নির্ভর করছে কোন ধরনের পরিস্থিতিতে যাবেন, কী করবেন? তারা নিশ্চয় যুদ্ধ-বিগ্রহে শান্তিরক্ষী হিসেবে যাবেন না। যেখানে সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের কাজ আছে, সেখানে যাবেন। আপনি খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন, আগেও প্রশাসনের কর্মকর্তারা এ ধরনের মিশনে গেছেন। যেমন স্বাধীনতার পর পূর্ব তিমুরের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের একজন সাবেক সচিব যুক্ত ছিলেন। তার নাম মোহাম্মদ ইসমাইল। তিনি খাগড়াছড়িরও ডিসি ছিলেন।
সমকাল: জাতিসংঘ চাইলে প্রশাসক পাঠানোর কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। কিন্তু এতে দেশের প্রতি দায়িত্বশীলতায় ঘাটতি দেখা দেবে কিনা?
আলী ইমাম মজুমদার: দায়িত্বশীলতা মোটেও কমে না, বরং বাড়ে। তারা অনেস্ট ইনকাম করতে চাইলে দোষ কী? এতে তো রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়বে। আমি মনে করি, জাতিসংঘ মিশনে প্রশাসকদের পাঠানো সম্ভব হলে দেশের ভাবমূর্তি আরও বাড়বে।
সমকাল: দক্ষতা ও সততা এ ক্ষেত্রে কি বড় প্রশ্ন হতে পারে? প্রশাসকদের নিয়ে আমরা তো নানারকম নেতিবাচক খবর দেখি।
আলী ইমাম মজুমদার: দেখুন, নেতিবাচক খবর আসে সামগ্রিক সুশাসনের অভাব থাকায়। আপনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন, এর সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যবস্থার যোগ থাকে। রাজনীতি ঠিক থাকলে আমলাতন্ত্র ঠিক থাকে।
সমকাল: ডিসিদের দক্ষতা, সক্ষমতা ও আন্তরিকতা নিয়ে খোদ পররাষ্ট্রমন্ত্রীও প্রশ্ন তুলেছেন। ডিসি সম্মেলনে গিয়ে তিনি বলেছেন, যে কাজগুলো জেলায় বসে নিজেই সমাধান করা সম্ভব, সেটার জন্য ডিসিরা ঢাকার দিকে তাকিয়ে থাকেন। তিনি বলছেন, এগুলো দায়িত্ব এড়ানোর কৌশল।
আলী ইমাম মজুমদার: পররাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়কে আমি খাটো করছি না। কিন্তু তিনি সম্ভবত কথাটা বলেছেন জনপ্রতিনিধি হিসেবে, এমপি হিসেবে। কারণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তো জেলা পর্যায়ে দপ্তর নেই। আমি মনে করি, ডিসিরা যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না জনপ্রতিনিধিদের চাপে। এমপি মহোদয় চাপ দেন, মন্ত্রী মহোদয় চাপ দেন। তখন ডিসি কী করবেন? তিনি সিদ্ধান্তের জন্য ঢাকার দিকে তাকিয়ে থাকেন। রাজনীতিকরা পরিবর্তন না হলে এ সংকট আরও গভীর হবে। রাজনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে।
সমকাল: বিকেন্দ্রীকরণ কীভাবে সম্ভব?
আলী ইমাম মজুমদার: প্রশাসনিক কিছু দায়িত্ব জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও ছেড়ে দিতে হবে। যেমন আমি যখন ইউএনও ছিলাম, তখন উপজেলা পর্যায়েই প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ হতো। এখন কেন্দ্রীয়ভাবে হয়। আগে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগ হতো উপজেলা পর্যায়ে। এখন আলাদা বোর্ড করা হয়েছে। এর জন্য অনিয়মও দায়ী। কিন্তু অনিয়ম দূর না করে সবকিছু কেন্দ্রীভূত করলে তো সমাধান হবে না। স্থানীয় প্রশাসন, স্থানীয় সরকারকে কাজ করতে দিতে হবে; সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে দিতে হবে।
সমকাল: অভিযোগ আছে, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানদের কোনো কাজ নেই। ডিসিরা তাদের কাজের সুযোগ দেন না।
আলী ইমাম মজুমদার: জেলা পরিষদের কাজ নির্ধারিত। জেলা প্রশাসকের সঙ্গে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের বিরোধ হওয়ার কোনো কারণ নেই। আরও কাজ ও দায়িত্ব বাড়াতে হলে আইন সংশোধন করতে হবে।
সমকাল: উপজেলা পরিষদের ব্যাপারে কী বলবেন?
আলী ইমাম মজুমদার: বেশিরভাগ উপজেলা পরিষদের সংকট রাজনীতিকদের সৃষ্ট। সেখানে সংসদ সদস্যকে উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা করা হয়েছে। অধিকাংশ উপজেলায় এমপির সঙ্গে উপজেলা চেয়ারম্যানের বিরোধ থাকে। আবার ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় বড় নেতাদেরও নানা বিষয়ে মতামত থাকে। এর পর থাকে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন, যুব সংগঠন। তাদের সবার সঙ্গে সবার দ্বন্দ্ব ও স্বার্থের সংঘাত রয়েছে। ফলে একজন ইউএনওর পক্ষে সবার কথামতো চলা সম্ভব হয় না। তখন তিনি নিজে যা ভালো মনে করেন, সেটা করেন। যাদের মনমতো হয় না, তারা সমালোচনা করে।
সমকাল: আপনিও তো ইউএনও ছিলেন।
আলী ইমাম মজুমদার: আমাদের সময় উপজেলা পরিষদ যথেষ্ট কার্যকর ছিল। ইউএনও এবং উপজেলা চেয়ারম্যানের মধ্যে মর্যাদার সম্পর্ক ছিল। উন্নয়ন কাজে কোনো বাধা হতো না। জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসকের মধ্যে বিরোধ থাকলে উন্নয়ন কাজ ঠিকমতো হবে না, এটাই স্বাভাবিক। যেমন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন। বর্তমান মেয়রের সঙ্গে যদি প্রশাসনের সম্পর্ক ভালো থাকত, তাহলে আরও উন্নয়ন হতো। কিন্তু প্রশাসন ও পুলিশ মেয়র থেকে দূরে থাকে প্রভাবশালী এমপির কথামতো চলতে গিয়ে।
সমকাল: ডিসি সম্মেলনে এ ধরনের বিষয়ে আলোচনা হতে পারে না?
আলী ইমাম মজুমদার: উপযুক্ত পরিবেশ পেলে নিশ্চয়ই আলোচনা হতে পারে।
সমকাল: উপযুক্ত পরিবেশের প্রত্যাশা আমরাও করি। আমাদের সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
আলী ইমাম মজুমদার: আপনাকেও ধন্যবাদ।