জানেন না আইনের 'আ'। তারপরও কাচারিপাড়ায় তারা দাম্ভিক, অন্যদের চেয়ে সরব এক পা। কখনও আইনজীবী, কখনও মুহুরি, আবার কখনও মানবাধিকার কর্মী পরিচয়ে ছদ্মবেশী। কেউ সাংবাদিক কিংবা গোয়েন্দা পুলিশ সেজেও দাপিয়ে বেড়ান আদালতপাড়া। মামলা করা, আসামি ধরা, মামলার নিষ্পত্তি কিংবা জামিন করে দেওয়ার কথা বলে মক্কেলকে বানান 'বেকুব'। চট্টগ্রামের আদালতপাড়ায় তারা 'ফোর টোয়েন্টি' রমণী হিসেবেই চেনা।
নারীদের প্রতারণার বিস্তার কোর্ট-কাচারিতে শুধু নয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আঙিনায়ও আছে ছলনার চোখ। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকার রুবিনা সুলতানা। যিনি পাঁচ পাঁচটি প্রতারণা মামলার আসামি। এর মধ্যে তিনটি চেক প্রতারণার। এ জন্য জেল খেটেছেন দুই বছর ৬ মাস, অর্থদণ্ড গুনেছেন ৬১ লাখ টাকা। রুবিনার মতো পাঁচটি চেক প্রতারণা মামলার আসামি নগরের খুলশী এলাকার মেহেরুন নেছা। পাঁচ মামলায় তাকে দুই বছর ৬ মাস কারাদণ্ড ও ৬৭ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেন আদালত। রুবিনা-মেহেরুনের মতো ব্যাংকের ১৫ কোটি টাকা জালিয়াতির মতো দুঃসাহসিক অপরাধে উঠে আসে লাবিবা বুটিকসের মালিক ফারজানা হোসেন ফেন্সীর নাম। এখনও কারাগারে বন্দি তিন মামলার আসামি ফেন্সী। বারবার চাইলেও মিলছে না জামিন। অর্থ ঋণের মামলায় দণ্ডিত হয়ে জেল খেটেছেন বিএনপি নেত্রী ডা. লুসি খান। দুর্নীতি মামলায় কারাগারে গেছেন গোলজার বেগম। মানি লন্ডারিং মামলার আসামি পারভীন আক্তারকে করতে হয়েছে কারাভোগ।
পুরুষদের মতো আর্থিক প্রতারণার মতো সূক্ষ্ণ অপরাধেও ক্রমেই বাড়ছে নারীর দাপট। চেক প্রতারণা থেকে আর্থিক জালিয়াতি কিংবা আদালতপাড়ায় দুই নম্বরি, কোথাও পিছিয়ে নেই নারী।
পাঁচ বছরে প্রতারণায় ৪০২ নারী : ২০২১ সালে ৯১ প্রতারণা মামলায় ৯২ নারী, ২০২০ সালে ৪৯ প্রতারণা মামলায় ৪৯ নারী, ২০১৯ সালে ১০৪ প্রতারণা মামলায় ১০৪ নারী, ২০১৮ সালে ৯৩ প্রতারণা মামলায় ৯৫ নারী, ২০১৭ সালে ৬৩ প্রতারণা মামলায় ৬৪ নারী গ্রেপ্তার হন।
আর্থিক প্রতারণায় বাড়ছে নারীর সংযোগ :চট্টগ্রামে নারীদের মধ্যে বাড়ছে আর্থিক প্রতারণার ঘটনা। চেক প্রতারণার পাশাপাশি ব্যাংকিং জালিয়াতি, দুর্নীতি করে টাকা আয়, মানি লন্ডারিং করার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে নারী। চেক প্রতারণায় ২০২১ সালে আদালতে ৪৮টি সিআর মামলা রেকর্ড হয়, এতে আসামি ছিলেন ৪৮ নারী। চেক প্রতারণা করে ২০২০ সালে ৩৯ নারীকে জামিন না পেয়ে কারাগারে যেতে হয়েছে। ২০১৯ সালে ৮২ নারী, ২০১৮ সালে ৫৫ নারী, ২০১৭ সালে ৪৩ জন আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইলেও তাদের মুক্তি মেলেনি। জামিন না দিয়ে চেক প্রতারণায় ৫ বছরে ২৬৭ নারীকে কারাভোগ করিয়েছেন আদালত।
এ ছাড়া অর্থঋণ মামলায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয় ৯ নারী।
প্রতারণায় নগরের নারীর সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে গ্রামের নারী : বেআইনিভাবে সম্পত্তি হস্তান্তর, পরিবর্তন, সই জাল করে '৪২০' প্রতারণার মামলায় ২০২১ সালে ৩৭ মামলায় ৩৭ নারী গ্রেপ্তার হন। এর মধ্যে নগরের ২১, গ্রামের ১৬ জন। ২০২০ সালে ১০ নারীর মধ্যে ৭ জন নগরের আর গ্রামের তিনজন। ২০১৯ সালে ২২ নারীর মধ্যে নগরের ১৫ জন আর গ্রামের ৭ জন। ২০১৮ সালে ৩৮ নারীর মধ্যে ২৩ জন নগরের আর ১৫ জন গ্রামের। ২০১৭ সালে ১৯ নারীর মধ্যে ১২ জন নগরের আর ৭ জন গ্রামের।
প্রতারণা করে দণ্ডিত ১২১ নারী :চেক প্রতারণা মামলায় ২০২১ সালে ২৩ নারী আদালতে দণ্ডিত হয়েছেন। এ ছাড়া ২০২০ সালে ২১, ২০১৯ সালে ২৬, ২০১৮ সালে ১৪ এবং ২০১৭ সালে ১১ নারী দণ্ডিত হন। '৪২০' প্রতারণা মামলায় ২০২১ সালে লোহাগাড়ার কামরুন নাহারসহ পাঁচ নারী, ২০২০ সালে ১, ২০১৯ সালে ১০, ২০১৮ সালে ৭ এবং ২০১৭ সালে ৩ নারীকে দণ্ড দিয়েছেন আদালত।
কে কী বলছেন : এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলোজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সাবেক উপাচার্য ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, অর্থলোভ যেমন পুরুষের আছে, তেমনি আছে নারীদেরও। নারীর ক্ষমতায়ন বাড়ার কারণে একশ্রেণির নারীর অর্থলোভ বিকৃত পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। সেই বিকৃত নেশা থেকেই নারীরা আর্থিক প্রতারণায় জড়িয়ে যাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে আবার স্বামী, ভাই ও সন্তানদের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়েও প্রতারণার ফাঁদে পড়ছেন কিছু নারী। লিঙ্গ সমতা অর্থবহ করতে পারলেই অপরাধ প্রবণতা থেকে মুক্তি মিলতে পারে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্পেশাল পিপি অ্যাডভোকেট মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, চেক প্রতারণা মামলায় সবচেয়ে বেশি নারীদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা রেকর্ড হচ্ছে। চেক প্রতারণা মামলার আসামিদের মধ্যে শিক্ষিত নারীর সংখ্যাই বেশি।


বিষয় : 'ফোর টোয়েন্টি' রকমারি

মন্তব্য করুন