তামিল মারদাঙ্গা মুভির এমন কিছু চিত্রনাট্য আছে, যা অনেকের মনে বুনে থাকে আজীবন। সবার বিশ্বাস, এসব গল্প কেবল চলচ্চিত্রের পর্দাতেই দর্শকের তালি কুড়ায়। তবে কল্পিত নয়, অমোঘ সত্য গল্পও উঠে আসে মাঝে মাঝে জীবনের আকাশে। তেমনই বাস্তব এক চরিত্র শেখ হাতেম আলী। তার জীবনগল্পের পাণ্ডুলিপি যে কোনো মারদাঙ্গা চলচ্চিত্রের চেয়েও ঢের মর্মস্পর্শী। স্বাধীনতার পরবর্তী ৩০ বছরে হাতেম পরিবারে আঁকা হয়ে আছে মর্মঘাতী এক অধ্যায়। স্বাভাবিক মৃত্যু যেন ভুলতে বসেছে পরিবারটি। অস্বাভাবিক মৃত্যুতে রক্তে ভিজেছে পরিবারের সাত সদস্য। এর মধ্যে হাতেম আলীসহ তার চার ছেলের জীবনপ্রদীপ নিভেছে সন্ত্রাসীদের বুলেটে। কেন বারবার পরিবারটি প্রতিপক্ষের 'চোখের বালি'- সেই রহস্য ভেদ করতে সমকাল চালিয়েছে অনুসন্ধান।
খুলনা নগরীর বড় বয়রা এলাকায় 'প্রভাবশালী' হাতেম আলী পরিবারের বাস। হাতেম এখন আর বেঁচে নেই। তার পাঁচ ছেলের মধ্যে আছেন কেবল একজন। পরিবারের সেই 'বাতির নাম' মো. আলমগীর শেখ।
হাতেম পরিবারের সদস্যরা মনে করেন, এলাকায় প্রাধান্য বিস্তার নিয়ে সন্ত্রাসীদের এই ক্রম হত্যাযজ্ঞ। এ ছাড়া হত্যা-পরবর্তী মামলা থেকে 'বাঁচতে' শীর্ষ সন্ত্রাসী ও চরমপন্থিরা একের পর এক হত্যাকাণ্ড চালিয়ে গেছে। পরিবারের সদস্যদের কাউকে হত্যার পর বাদী হয়ে যে ব্যক্তি মামলা করেছে, তার জীবনটাই সন্ত্রাসীরা তুলে নিয়েছে।
তবে তাদের এই বক্তব্যের বিপরীতে আছে ভিন্ন মতও। পুরোনো স্মৃতি হাতড়ে এলাকার অনেকে বলেন, হাতেম আলী ও তার পরিবারের সদস্যরা এলাকায় প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করতেন। পরিবারের দু-একজন সদস্য দাপটও দেখাতেন। সেখান থেকেই প্রতিপক্ষের সঙ্গে তাদের সম্পর্কটা ছিল 'দা-কুমড়া'।
গল্পের শেষ 'দাঁড়ি' এখানে নয়, হত্যাকারী ও তাদের মদদদাতারা ভেবে নিয়েছে এই সিরিজ হত্যার বদলা এক সময় না এক সময় আসবেই। আর সে কারণে হাতেম আলীর নাতি ও শেখ শাহজাহানের ছেলে নগরীর ১৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শেখ সাইদুর রহমান শাওনকে তিন তিনবার হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। শাওনের ওপর সবশেষ গুলি ও বোমা হামলা হয়েছে গত ১৬ জানুয়ারি।
সাত হত্যাযজ্ঞ : হত্যাকাণ্ডের শুরুটা মুক্তিযদ্ধের বছর একাত্তরে। যুদ্ধ চলাকালেই ১৯৭১ সালের ৯ মে খুলনার জংশন এলাকায় খুন করা হয় হাতেম আলীর আপন ভাই রুস্তম আলীকে। এই হত্যার ঠিক দুই বছর পর ১৯৭৩ সালের ৩০ মে খুলনার বৈকালী পালপাড়া এলাকায় হত্যা করা হয় আরেক ভাই ইসমাইল শেখকে। এর পর হত্যাযজ্ঞের খানিকটা বিরতি।
১৯৮৫ সালের ২৯ নভেম্বর আবার নগরীর বৈকালী এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন হাতেম আলীর ছেলে শেখ জাহাঙ্গীর। এরপর ১৯৮৭ সালের ১০ জুলাই একই এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলি ও বোমা হামলায় নিহত হন হাতেম আলীর আরেক ছেলে শেখ হুমায়ুন। ওই হত্যা মামলায় ইতোমধ্যে ১২ আসামির সাজা হয়েছে।
১৯৯৮ সালের ১১ ডিসেম্বর বয়রা আইজ্যার মোড়ে সন্ত্রাসীদের গুলিতে খুন হন হাতেম আলীর ছেলে শেখ শাহজাহান। এ ঘটনায় হাতেম আলী বাদী হয়ে ১৩ জনকে আসামি করে মামলা করেন। ২০০৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি শেখ শাহজাহান হত্যা মামলায় ছয় আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। শাহজাহান হত্যা মামলার অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে মামলার বাদী ও তার বাবা হাতেম আলীকে ১৯৯৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ছোট বয়রা এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তার ছেলে শেখ বাবর বাদী হয়ে ১২ জনকে আসামি করে মামলা করেন। ২০০৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি হাতেম আলী হত্যা মামলায় ১০ আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়।
২০০১ সালের ১৮ জুলাই হাতেম আলী হত্যা মামলার বাদী ও তার ছেলে শেখ বাবর আলীকে বয়রা বাজার এলাকায় সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে। এ ঘটনায় পরিবারের সদস্যরা আর কেউ বাদী হয়ে মামলা করার সাহস দেখাননি। শেষ পর্যন্ত ওই হত্যায় পুলিশ বাদী হয়ে ১৫ জনকে আসামি করে মামলা ঠোকেন। এরপর তিন দফা হত্যাচেষ্টা হয়েছে হাতেম আলীর
নাতি শাওনের ওপর। গত ১৬ জানুয়ারি বয়রা বাজারে গুলি ও বোমা হামলা লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে অল্পের জন্য প্রাণে বাঁচেন তিনি। এ সময় অস্ত্র, গুলি ও বোমাসহ সাইদুর ওরফে সাইদুল নামে এক সন্ত্রাসীকে আটক করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেনেড বাবুর নেতৃত্বে কালা তুহিন, চিংড়ি পলাশ, ফুলতলার রাসেল, সাইদুর ও ইমন এই হামলায় অংশ নেয়। তাদের নামে মামলাও হয়েছে।
এর আগে ২০১২ সালে নগরীর বয়রা আইজ্যার মোড়ে শাওনকে লক্ষ্য করে সন্ত্রাসীরা গুলি করার চেষ্টা করে। ওই সময় গুলি বের না হওয়ায় অস্ত্রের বাঁট দিয়ে আঘাত করে তার মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়। ২০১৫ সালের ২০ এপ্রিল আবার নিউমার্কেটের সামনে সন্ত্রাসীরা শাওনের বুকে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে। ওই সময় বুক দিয়ে ঢুকে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যায় গুলি। অলৌকিকভাবে প্রাণক্ষয় থেকে বাঁচেন শাওন।
ক্রম হত্যার কারণ : আশির দশকের শুরুতে আধিপত্য নিয়ে হাতেম আলীর সঙ্গে বয়রা এলাকার ব্যবসায়ী কামরুল আলম মিন্টু খালাসি পরিবারের বিরোধ তৈরি হয়। খালাসি পরিবারের একাধিক সদস্যের সঙ্গে নগরীর কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী ও চরমপন্থির সম্পর্ক ছিল 'মধুর'। তারা সন্ত্রাসী ভাড়া করে প্রথমে হাতেম আলীর ছেলে জাহাঙ্গীরকে হত্যা করায়। তখন হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এরপর ক্ষুব্ধ হয়ে মামলা থেকে নিজেদের আড়ালে রাখতে শীর্ষ সন্ত্রাসী ও চরমপন্থিরা একের পর এক হাতেম আলীর পরিবারের সদস্যদের হত্যার মিশনে নামে। এ ছাড়া জমি নিয়ে হাতেম আলীর পরিবারের সঙ্গে রায়েরমহল এলাকার একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে বিরোধ ছিল। তারাও এই হত্যাগুলোর নেপথ্যে ছিল বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে কামরুল আলম মিন্টু খালাসি সমকালকে বলেন, 'হাতেম আলীর ছেলে শেখ জাহাঙ্গীর খুন হওয়ার পর নগরীর দুই থেকে তিনটি প্রভাবশালী পরিবারের প্ররোচনায় হাতেম আলীর পরিবার আমাকে এবং আমার ভাই পলাশের নামে হত্যা মামলা দেয়। পরবর্তী সময়ে আদালত মিথ্যা মামলা থেকে আমাদের খালাস দেন।' তিনি বলেন, 'হাতেম আলীর পরিবারের সঙ্গে আমাদের কোনোদিন কোনো বিরোধ ছিল না। অন্য কোনো মামলায়ও আমাদের পরিবারের কাউকে আসামি করেনি তারা।'
মিন্টু খালাসি আরও বলেন, 'সন্ত্রাসীদের সঙ্গে তাদের পরিবারের কোনো সখ্য নেই।' এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, 'হাতেম আলীর পরিবারের কয়েকজন সদস্য বরং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল।'
হাতেম আলীর নাতি শাওনের মা লিজা বলেন, 'কারা একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে, তা আমাদের জানা। তবে ভয়ে প্রভাবশালী ওই ব্যক্তিদের নাম বলতে পারছি না। তারা শাওনকে তিনবার হত্যার চেষ্টা করেছে। ওরা আমার শাওনকে বাঁচতে দেবে না।'
তবে স্থানীয় লোকজন জানান, নগরীর একাধিক প্রভাবশালী পরিবার ও সন্ত্রাসী গ্রুপের সঙ্গে হাতেম আলীর পরিবারের বিরোধ দীর্ঘদিনের। হাতেম আলীর নাতি শাওনের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলাসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। কয়েক বছর আগে শাওন একজনকে হত্যা করে লাশ টয়লেটের ট্যাঙ্কের মধ্যে রেখে দেয়। ওই ঘটনার পর থেকে সে এলাকায় 'ট্যাঙ্কি শাওন' নামে পরিচিত।
তবে এ ব্যাপারে শাওনের মা লিজা বলেন, 'প্রতিপক্ষ তার ছেলে শাওনকে সন্ত্রাসী বানানোর উদ্দেশ্যে তার বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ২৫ থেকে ২৬টি মিথ্যা মামলা দিয়েছে। এর অধিকাংশ মামলাতেই শাওন অব্যাহতি পেয়েছে। এখন তার নামে তিনটি মামলা চলমান।' কেন মামলা দিচ্ছে- এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, 'যাতে শাওন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখে শীর্ষ সন্ত্রাসীতে পরিণত হয়। যদি শাওন ক্রসফায়ারে মারা যায় তাহলে তাদের পথের কাঁটা দূর হবে, সে জন্য মামলা দেয়।'
শাওন বলেন, 'এলাকায় কেউ অন্যায় করলে আমার দাদা, বাবা ও চাচারা ওই ঘটনার প্রতিবাদ করতেন। এ কারণেই এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জন্য আমাদের পরিবারের সদস্যদের একের পর এক হত্যা করা হয়েছে।' তার বিরুদ্ধে অভিযোগের ব্যাপারে শাওন বলেন, 'আমার নামে যেসব মামলা দেওয়া হয়েছে, তার সবগুলোই মিথ্যা।'
হাতেম আলীর একমাত্র জীবিত ছেলে আলমগীর শেখ। তিনি জানান, হুমায়ুন, শাহজাহান ও হাতেম আলী হত্যা মামলায় বেশ কয়েকজন আসামির কারাদণ্ড হয়েছে। চাচা রুস্তম ও ইসমাইল হত্যার পর তখন মামলা হয়নি। জাহাঙ্গীর ও বাবর হত্যা মামলার পরিণতি কী হয়েছে তা তাদের জানা নেই। তিনি বলেন, 'আমার পরিবারের সদস্যদের কাউকে হত্যার পর যে বাদী হয়ে মামলা করেছে, তাকেই সন্ত্রাসীরা মেরে ফেলেছে। যাদের সাজা হয়েছিল তাদের বেশ কয়েকজন বর্তমানে জামিনে বাইরে রয়েছেন। এ কারণে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।'
পুলিশ যা বলছে : এ ব্যাপারে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহাবুদ্দীন আহমদ বলেন, শাওনের নামে হত্যাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। তবে এর আগে তাদের পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য খুন হওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব। পরিবারটির পক্ষ থেকে কেউ নিরাপত্তাহীনতার কথা জানায়নি। জানালে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিষয় : হাতেম আলী

মন্তব্য করুন