'ইবার বলে মেশিনে ভোট হব। মেশিনডা যে ক্যামন হয়, আমরা তাত (তাতে) ভোট দিবার পারমো কিনা সেইডা নিয়ে চিন্তায় আছি। কেউ কেউ কয় ওই মেশিনে একজনে ভোট দিলে আরেকজন প্যায়া যায়।' বলছিলেন সারিয়াকান্দি উপজেলার বোহাইল ইউনিয়নে ধারাবর্ষা চরের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব নিজাম উদ্দিন।

৩১ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এই প্রথম চরাঞ্চলে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট গ্রহণ করা হবে। ইভিএম সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকায় মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের ভোটারদের মধ্যে এমন সংশয় কাজ করছে।

তবে যমুনা নদীর বুকে দুর্গম ওই জনপদগুলোতে শুধু ইভিএম ব্যবহার নিয়েই নয়, ভোটের দিনের পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। গত ৫ জানুয়ারি পাশের গাবতলী উপজেলার দুই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সহিংসতায় পাঁচজনের প্রাণহানি উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কর্নিবাড়ি ইউনিয়নের চর শোনপচার বাসিন্দা জালাল উদ্দিন বলেন, 'রাস্তা ভালো এমনকি ম্যাস্টেট (ম্যাজিস্ট্রেট) ও বিজিবি থাকার পরও গাবতলীতে ভোট নিয়ে গ্যাঞ্জাম হইছে। মানুষ মরছে। আর আমগো চরাঞ্চলের এক কেন্দ্র থ্যাকা আরেক কেন্দ্রে ঘোড়ার গাড়িতে যাইতেই লাগে ৩-৪ ঘণ্টা। যদি কেউ গ্যাঞ্জাম করে তাইলে পুলিশ আসার আগেই বড় গণ্ডগোল হব।'

ষষ্ঠ ধাপে সারিয়াকান্দি উপজেলার যে ১২টি ইউনিয়নে ভোট হবে এর মধ্যে ৪ ইউনিয়নের ২১টি কেন্দ্র চরাঞ্চলে। ওই ৪টির মধ্যে কাজলা ইউনিয়নের ৯টি কেন্দ্রের সবগুলোই চরে। সেখানে ভোটার ১২ হাজার ৭০০ জন। বোহাইল ইউনিয়নের চরাঞ্চলে ৭টি কেন্দ্রে ভোটার ৯ হাজার ৯৬৭, কর্নিবাড়ি ইউনিয়নের ৩টি কেন্দ্রের ভোটার ৫ হাজার ৩২৩ এবং ১ হাজার ৭২৬ ভোটার রয়েছেন হাটশেরপুর ইউনিয়নের চরবেষ্টিত দুটি কেন্দ্রে। সারিয়াকান্দির মূল ভূখণ্ড থেকে চরাঞ্চলে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম নৌকা। তবে যমুনা নদীর পানি হ্রাস পাওয়ায় অনেক ঘাট বন্ধ। তাই সব কেন্দ্রে নৌকায় যাতায়াত সম্ভব নয়। এমনও কেন্দ্র আছে নৌঘাট থেকে ৩ থেকে ৫ কিলোমিটার হেঁটে বা ঘোড়ার গাড়িতে যেতে হয়।

গত সপ্তাহে কাজলা ইউনিয়নের দক্ষিণ জামথৈল চরে দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতি হয়েছে। গত রোববার সারিয়াকান্দিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন কর্নিবাড়ি ইউনিয়নের স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী কাজী মাহবুব আলম রঞ্জু। তার অভিযোগ, প্রার্থীদের অনেকে ভোটারদের মাঝে ইভিএম নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। রাজনৈতিক দল মনোনীত প্রার্থীরা শহর থেকে সন্ত্রাসীদের চরাঞ্চলে জড়ো করছেন। তিনি সুষ্ঠু ভোট নিশ্চিত করতে চরাঞ্চলে ভোটের আগের দিন থেকে ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিজিবি মোতায়েনের দাবি জানিয়েছেন। এদিকে নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে গত মঙ্গলবার সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে মতবিনিময় সভায় ইভিএমে ভোট নিয়ে বেশ কয়েকজন প্রার্থী সন্দেহের কথা তুলে ধরেছেন। কাজলা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী শাহজাহান মোল্লা সমকালকে বলেন, প্রার্থীরা বিশেষত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বলেছেন, অনেকে মনে করেন তাদের ভোট গণনার সময় অন্য প্রার্থীর পক্ষে দেখানো হবে। তবে ইউএনও সবাইকে এ ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছেন।

ইভিএম নিয়ে সংশয় দূর করতে উদ্যোগ নেওয়া হবে কিনা তা জানতে চাইলে সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ইভিএমে ভোট নিয়ে একটি ভিডিও প্রত্যেক প্রার্থীর কাছে সরবরাহ করা হয়েছে। অনেকে ভোটারদের তা দেখিয়েছেন। তাছাড়া ২৯ জানুয়ারি প্রত্যেক কেন্দ্রে ভোটারদের ভোট প্রদানের পদ্ধতি শেখানো হবে। সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম সমকালকে বলেছেন, চরাঞ্চলে কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন।