'পদ্মার ঢেউ রে/ মোর শূন্য হৃদয়- পদ্ম নিয়ে যা যারে/ এই পদ্মে ছিল রে যার রাঙা পা/ আমি হারায়েছি তা'রে ...'
পদ্মা নিয়ে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের এত ব্যাকুলতা। তবে সেই পদ্মাপাড়ে দাঁড়িয়ে পেলাম না জলের দেখা। যতদূর চোখ যায় ধূসর বালুকাবেলা। মাঝেমধ্যে সবুজ চাষবাসের উঁকি।
মঙ্গলবারের মঙ্গলময় সকাল। নামতে হলো ফিলিপনগরে। মাইক্রোবাস আর যাবে না। যাবে না মানে, যাওয়ারই রাস্তা নেই। এবার চেপে বসতে হবে শুকনো মৌসুমে এলাকার যোগাযোগের প্রধান বাহন মোটরসাইকেলে। পদ্মার বুকে বাইকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলে আমরা পৌঁছাব গন্তব্য চিলমারী।
না, ভুল বলছি না- চিলমারীই। এ নাম শুনলে অধিকাংশের চোখে ভাসবে কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্রপাড়ের চিলমারী উপজেলার কথা। তবে আমাদের লক্ষ্য কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ফিলিপনগরের পদ্মা নদীর পাড়ে। এলাকার বাসিন্দা ওয়াসিম কবিরাজ জানালেন, চিলমারী ইউনিয়নের অবস্থান একদম পদ্মার নদীর মাঝে। যাতায়াতের কোনো রাস্তা নেই। সেখানেই সেদিন সমকাল সুহৃদ সমাবেশের দুস্থদের মাঝে কম্বল বিতরণের আয়োজন। আর এ উদ্দেশ্যেই যাওয়া। দুর্গম এই চরে বর্ষায় যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌকা। শুকনো মৌসুমে নদীতে পানি না থাকলে
সেই পথ হয়ে যায় রুদ্ধ। তখন ভারী মালপত্র পরিবহন হয় মহিষের গাড়িতে।
সম্প্রতি এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ট্রাক্টর বা পাওয়ারটিলার। তবে সাধারণের সার্বক্ষণিক বাহন মোটরবাইক। পাশের রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ছবিও একই।
চরের বালু থেকে রক্ষা পেতে শরীরে গামছা জড়িয়ে দলেবলে কয়েকটা বাইকে উঠে পড়লাম। নদীর একটা মরা সোঁতার ধার দিয়ে আমরা চললাম এগিয়ে।
কিছুদূর এগোতেই ওয়াসিমের কথার সত্যতা মিলল। একটু পরপর বিপরীত দিকে বাইকে চেপে নানা বয়সের মানুষ, জিনিসপত্র, এমনকি গরুর বাছুরসহ বাইকে সওয়ার হয়েছে। বাইক চালক বিজয় আহমেদ জানালেন, চিকিৎসাসহ নানা কাজে তারা প্রতিদিন এভাবেই যাতায়াত করেন। ভাগজোত ঘাটে বাঁশের সাঁকো পারাপারের টাকা তুলছিল রতন কবিরাজ। তিনি জানালেন, চিলমারী-ফিলিপনগর লাইনে প্রায় ১০০ বাইক ভাড়ায় চলে। চিলমারী ২০০ টাকা, আর বাংলাবাজার পর্যন্ত গেলে দিতে হয় ৩০০ টাকা। বাঁশের সাঁকো পার হওয়ার জন্য বাইকপ্রতি তারা নেন ১০ টাকা।
পদ্মার প্রায় শুকিয়ে যাওয়া ধারাটায় জেলেরা বাঁশ ফেলে কাঠা দিয়ে রেখেছেন। এর ওপর বসে সাত-আটটা পানকৌড়ি পাখা মেলে সকালের রোদ তাপাচ্ছিল। নেমে ছবি তুলতে যেতেই সবগুলো উড়ল আকাশে। একটু পরপরই দেখা মিলছিল মাছরাঙা, শালিক আর খঞ্জনা পাখির। দুই ধারে ধারাবাহিকভাবে মাষকলাই, মটরশুঁটি বা কুসুম ফুলের ক্ষেত। আহা! কী অপরূপ নীল, বেগুনি বা কমলা রঙের ফুলের ঢেউ। দিগন্ত পর্যন্ত সবুজ করে রেখেছে গম, ভুট্টা, পেয়াঁজ, রসুন, ধনে আর বেগুনের ক্ষেত। মাচার লাউ বা শিমের লকলকে পাতা আর ফুল মন চায় একটু ছুঁয়ে দিই। কেমন একটা মায়ালাগা সকাল। দেখতে দেখতে আমরা গন্তব্যস্থল বসিরুননেসা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে চলে আসি।
হঠাৎ একটা ভাবনা মাথায় আসে- এই পদ্মার ওপর দিয়েই বহুবার যাতায়াত করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রমত্ত পদ্মার রূপ তাকে অভিভূত করেছিল। পদ্মার বুকে এই সবুজ শস্যভূমি তিনি যদি দেখতেন কেমন লাগত তার? সেই ভাবনায় যাওয়ার আগেই চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান সাহেব বলেন, প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এই চিলমারী চর। ব্রিটিশরা নীল চাষের উদ্দেশ্যে ফরিদপুর, পাবনাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ নিয়ে এসে এই চরে বসতি গড়ে দেয়। সেই বসতি এখন প্রায় ৫৬ হাজার মানুষের। গড়ে উঠেছে ২২টি গ্রাম। ইউনিয়নে ১১টি প্রাইমারি, তিনটি মাধ্যমিক স্কুল ও একটি মাদ্রাসা আছে। গত বছরের জানুয়ারিতে পদ্মা নদীর মাঝ দিয়ে সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে বিদ্যুতায়নের ব্যবস্থা হয়েছে। এ ছাড়া চিলমারী এলাকায় একটি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ না থাকায় সবাইকে কষ্ট নিয়েই চলতে হয়।
তিনি বলেন, ভাগজোত আর সিরাজনগরে দুটি ব্রিজ করা গেলেই এই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। ওয়াসিম কবিরাজ জানালেন, এই যোগাযোগের দুরবস্থার কারণেই এলাকায় বিশেষ করে মেয়েরা লেখাপড়ায় তেমন এগোতে পারে না। অল্প বয়সেই বিয়ে দিতে হয়। ফলে এখানে বাল্যবিয়ের ঝোঁক একটু বেশি।
পদ্মার 'একুল ভাঙে, ওকূল গড়ে' এই নিয়মেই এখনও ভাঙছে গড়ছে। ভাঙনের কবলে পড়ে প্রতিবছরই চরের মানুষকে ভূমিহীন হতে হচ্ছে বলে জানালেন শতবর্ষী বৃদ্ধ নূর মোহম্মদ। বর্ষায় শুধু ফসলের মাঠই নয়, ইউনিয়নের ২২ গ্রামের অনেকগুলোই ডুবে যায় পানির নিচে। তাই চিলমারীর অনেকেই এলাকা ছেড়ে খাজানগর, গাজীপুর, টাঙ্গাইল গিয়ে নতুন করে বসতি গড়েছেন বলে জানালেন এলাকাবাসী।
বাইকে আসতে আসতে এ ধরনের মুগ্ধতা পেয়ে বসেছিল। কিন্তু চিলমারী মানুষের সঙ্গে কথা বলতে বলতে কোথায় যেন হারিয়ে গেল সেই শিহরণ। বরং গা-শিউরে উঠছিল কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে যখন মোটরবাইকে করে সদরে নিয়ে আসা হয় কিংবা সন্তানসম্ভবা কোনো মাকে যখন হাসপাতালে আনা হয় তার করুণ অবস্থার কথা ভেবে!



বিষয় : পথে প্রান্তরে

মন্তব্য করুন