টানা আন্দোলনের পর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবি) পরিস্থিতি কার্যত শান্ত হয়ে এসেছে। অনশন ভাঙার সময় উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত থাকার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। গতকাল বৃহস্পতিবার দিনভর ক্যাম্পাসে সে ধরনের কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। তবে সন্ধ্যার পর অহিংস আন্দোলনের অংশ হিসেবে রংতুলির আঁচড়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা যায়। রাতে 'কেমন ভিসি চাই' শীর্ষক আলোচনার আয়োজন করে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীরা। দুপুরের পর থেকে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা ভবনসহ সব ভবনের তালা খুলে দেন।
উপাচার্যের বাসভবনের সামনের অবস্থান প্রত্যাহারের পর ক্যাম্পাসের অতিরিক্ত পুলিশও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সরকারের 'উচ্চ পর্যায়ের' আশ্বাসে অনশন প্রত্যাহারে পর বর্তমানে ক্যাম্পাসজুড়ে পরিবর্তনের অপেক্ষা। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন উপাচার্য নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
গত ১৩ জানুয়ারি বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিয়ে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি অ্যাকশনের প্রতিবাদে তা উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। এই দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কয়েকজন আমরণ অনশন শুরু করলে পরিস্থিতি জটিল হতে থাকে। এই সংকট সমাধানে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ভার্চুয়ালি ও প্রতিনিধির মাধ্যমে আন্দোলনরতদের সঙ্গে আলোচনা করেন। সর্বশেষ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের অনুরোধে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল সাবেক কর্মস্থলে এসে উপাচার্যকে সরিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অনশন কর্মসূচি ভাঙান। এরপর ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পাশাপাশি নতুন উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
উপাচার্যবিরোধী আন্দোলন শুরুর পর ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকে রড ও বালুর বস্তা দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছিল। এ ছাড়া বিভিন্ন ভবনে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছিল আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। গত বুধবার সকালে অনশন প্রত্যাহারের পর রাতে প্রধান ফটকের ব্যারিকেড সরিয়ে নেওয়া হয়। উপাচার্যের বাসভবনের সামনের সবকিছুও সরিয়ে ফেলা হয়। গতকাল সকাল থেকে ক্যাম্পাসে প্রবেশ ও চলাচল স্বাভাবিক হয়ে যায়। প্রশাসনিক কার্যক্রমও স্বাভাবিক হতে শুরু করে। বিভিন্ন একাডেমিক ভবনে দাপ্তরিক কার্যক্রম হয়েছে। তবে উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন ক্যাম্পাসের বাসভবন থেকে বের হননি। অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজন শিক্ষক বুধবার রাত ও গতকাল দিনে উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন শিক্ষক বলেছেন, সবার মধ্যে পরিবর্তন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। এতদিন যারা উপাচার্য ফরিদ উদ্দিনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে ক্যাম্পাসে সক্রিয় ছিলেন; তারাও ঘনিষ্ঠ মহলে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। অন্যদিকে আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। এই বলয় থেকে নতুন উপাচার্য হওয়ার আলোচনাও রয়েছে। ফরিদ উদ্দিন আওয়ামী লীগ ও বামপন্থি শিক্ষকদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আনেন। এদের মধ্যে একটি অংশ কুমিল্লা অঞ্চলের শিক্ষক। এমন কয়েকজন শিক্ষক উপাচার্যের বাসভবনে গেছেন বলে সেখানে কর্মরত কয়েকজন জানিয়েছেন।
শাবির একাধিক শিক্ষক বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সম্পর্ক স্বাভাবিক করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আন্দোলন চলাকালে শিক্ষকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। দফায় দফায় আলোচনার জন্য গেলেও শিক্ষার্থীদের অনড় অবস্থানে ব্যর্থ হয়ে ফিরতে হয়েছে শিক্ষকদের। সর্বশেষ অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও অধ্যাপক ড. ইয়াসমিন হক দম্পতি সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে অনশন কর্মসূচি থেকে সরিয়ে আনতে সমর্থ হন। এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. তুলসী কুমার দাস বলেন, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কোন্নয়ন সবচেয়ে জরুরি। আন্দোলনের সময় অনেক কিছু হয়েছে। একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।
রংতুলির আঁচড়ে আন্দোলন : অহিংস আন্দোলনের অংশ হিসেবে গতকাল সন্ধ্যা থেকে রংতুলির আঁচড়ে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু করেছেন। শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে কিলো রোডে আলপনা আঁকেন। সেখানে উপস্থিত শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আবেদিন বলেন, এখানে যেটা আঁকা হবে তাতে লেখা থাকবে 'মৃত্যু অথবা মুক্তি'।
এদিকে দুপুরে শিক্ষার্থীরা সবগুলো ভবনের তালা খুলে দেন। এ ব্যাপারে শিক্ষার্থী ইয়াছির সরকার বলেন, 'শিক্ষার্থীদের সম্পদ হলো একাডেমিক ভবন। এ ভবনগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রশাসনিক ভবনের তালাসহ সব বিল্ডিংয়ের তালা খুলে দেওয়া হয়েছে। উপাচার্য পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরা অহিংসভাবে আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাব।'
এদিকে শিক্ষার্থীরা 'কেমন শাবিপ্রবি চাই' শীর্ষক এক মুক্ত আলোচনার আয়োজন করে। সেখানে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে আলপনা আঁকা, টং দোকান স্থাপনসহ আন্দোলনের কর্মসূচি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবেন।