গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় অনেক শিশু-কিশোর এখন পুলিশের তালিকাভুক্ত অপরাধী। এদের কারও মা আছে বাবা নেই, কারও বাবা আছে মা নেই, কারও আবার মা-বাবা কেউ নেই। এমন শিশুদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে টঙ্গীর বিভিন্ন এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে দুই ডজন 'কিশোর গ্যাং'। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়ে ওরা নানা অপরাধের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলছে। রাজনৈতিক ওই ব্যক্তিরা কিশোরদের কাছে 'বড় ভাই' হিসেবে পরিচিত।

টঙ্গী ও এর আশপাশে ১৯টি বস্তি রয়েছে। গ্যাংয়ের কিশোরদের বেশিরভাগই এসব বস্তিতে থাকে। এর বাইরে ভাসমান কিশোরের সংখ্যাও কম নয়। আছে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানও।

টঙ্গীর বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, গাজীপুর মহানগরের ৪৮ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি সজল সরকারের রয়েছে একটি কিশোর গ্যাং। এর সদস্য সংখ্যা দুই থেকে আড়াইশ। এর মধ্যে ১০ জন সজল সরকারের ঘনিষ্ঠ, যারা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো স্কুল বা কলেজের ছাত্র। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠ তিনজন- শৈশব, আলী ও সাব্বির। এদের মাধ্যমে সজল সরকার নিয়ন্ত্রণ করেন গ্যাংটি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, অর্থের বিনিময় মারামারিতে অংশ নেওয়া, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি কাজ করে থাকে এ কিশোর গ্যাং। টঙ্গীর বনমালা, হাজি মার্কেট, রসুলবাগ আচারপট্টি ও দত্তপাড়া এলাকায় সজলের কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য। তাদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হলেও ভয়ে কেউ মুখ খোলে না।

সজলের গ্যাং সদস্যদের মধ্যে রয়েছে- বনমালা এলাকার আলী ওরফে ছোট আলী (২০), শৈশব (২১), জোড়া হত্যা মামলার আসামি জুয়েল, মিজান, বাবু, মানিক, বাটলা শাওন (২০), সাব্বির ওরফে কেবিডি (২০), তুষার (২২), রহমত (২১), মহসিন (২৪), রহিম মোল্লা (৩২), লাইনম্যান জাকির (৩২) প্রমুখ। সজলের 'সেকেন্ড ইন কমান্ড' হিসেবে এরা পরিচিত।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনেকেই বলেছেন, বিভিন্ন বস্তিতে বসবাস করা মা-বাবা হারা কিশোরদের টাকাপয়সা দিয়ে সজল লালন-পালন করেন। সজল চুক্তির মাধ্যমে জমি দখল কিংবা কোনো মারামারির সময় বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে হাজির হন। মাদক বিক্রির সঙ্গেও তারা যুক্ত। ২০১৮ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়ে কারাবন্দিও ছিলেন সজল সরকার। সম্প্রতি ডাকাতির প্রস্তুতিকালে সজলের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করে টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশ।

কিশোর গ্যাং গড়ে তোলা নিয়ে সজল সরকার সমকালকে বলেন, 'আমি রাজনীতি করি। রাজনীতি করতে গেলে কিছু ছেলেপেলে লালন-পালন করতে হয়। ২০০-২৫০ ছেলেপেলে আমি লালন-পালন করি। সিনিয়র নেতারা অনেক সময় আমাকে স্মরণ করেন তাদের অনুষ্ঠানে মোটরসাইকেলসহ লোকজন নিয়ে যেতে। তখন লোকজন নিয়ে যাই। এদের বেশিরভাগই স্কুল-কলেজের ছাত্র। তবে কোনো অপরাধের সঙ্গে তারা জড়িত নয়।'

সজল বলেন, 'আমার ঘনিষ্ঠ ১০ জন কিশোর রয়েছে। এদের মাধ্যমে আমি সকলকে নিয়ন্ত্রণ করি।' তার দাবি, 'রাজনীতি করি তো, কেউ হয়তো শত্রুতাবশত আমার বিরুদ্ধে বলেছেন।'

আরিচপুর এলাকার আবদুল মালেকের দুই ছেলে রাজিব চৌধুরী বাপ্পী ও সজীব চৌধুরী পাপ্পুর রয়েছে 'ডি কোম্পানি' নামে একটি কিশোর গ্যাং। এর সদস্য সংখ্যা শতাধিক। স্থানীয়রা জানান, ধনী ও ভদ্র ঘরের অনেকেই ডি কোম্পানির সদস্য। ইয়াবা বিক্রি থেকে শুরু করে নানা রকম অপরাধ ওরা চুক্তির মাধ্যমে করে থাকে। এদের প্রায় প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই টঙ্গী পূর্ব ও পশ্চিম থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। গত বছরের ৭ জুন টঙ্গীর পশ্চিম থানার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ডি কোম্পানির ১২ জনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-১। তাদের কাছ থেকে বিদেশি পিস্তল, গুলি, চাপাতি, রামদা উদ্ধার করে। এ বাহিনীর প্রধান বাপ্পী ও তার ভাই পাপ্পুকেও তখন গ্রেপ্তার করা হয়।

আরিচপুর গেইল ও পারভেজের নেতৃত্বে পরিচালিত হয় আরও দুটি কিশোর গ্যাং। টঙ্গী বাজার এলাকায় আগে শুক্কুর আলী ও ইমরান তালুকদার বশির একই সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্ব দিত। বর্তমানে বশির ও শুক্কুরের পৃথক দুটি গ্যাং রয়েছে। বশিরের নেতৃত্বে রয়েছে মদিনাপাড়া ও নতুন বাজার এলাকায় শুক্কুর আলী, দত্তপাড়া এলাকায় নাতি সুমন ও হুমায়ূনের গড়ে তোলা চক্র আরও বেশি শক্তিশালী।

বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, এরশাদনগর এলাকায় রয়েছে চারটি কিশোর গ্যাং। যুবলীগের এক নেতা, ছাত্রলীগের দুই নেতা এবং তাদের এক সহযোগী মিলে গড়ে তুলেছেন এসব চক্র। স্থানীয়রা বলছেন, এদের নেতৃত্বে অন্তত ২০০ কিশোর রয়েছে। যাদের বেশিরভাগই এরশাদনগর বস্তিতে বাস করে।

এর বাইরে ভরান এলাকায় রয়েছে মেহিনের গ্যাং, মরকুন গুদারাঘাট এলাকায় আসাদ সিকদার, গোপালপুর এলাকায় সাদ্দাম মজুমদার ওরফে বাজান সাদ্দাম, দত্তপাড়া এলাকায় প্রবাসী দুই ভাই খুনের আসামি জুয়েল, টঙ্গী বাজার এলাকায় জুয়েল মাহমুদ পারভেজ, সাগর, জিল্লুর আমান রিফাত, মাছিমপুর এলাকায় দীন মুহাম্মদ নীরব, গাজীবাড়ি এলাকায় ভোলা ও জসীম, সফিউদ্দিন কলেজ রোডে আমিনুল করিম রানা, মধুমিতা তিনতলা মসজিদ এলাকায় বিপ্লব মীম, জয়, সৈকত এবং দত্তপাড়া হকের মোড় এলাকায় নেতৃত্ব দেয় শাহীন, নিলয়, দীপু ও সাজ্জাদ। এদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই থানায় মামলা রয়েছে।

এ রকম ২৪টি কিশোর গ্যাং পুরো টঙ্গী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এর সদস্যরা রাস্তার মোড়ে মোড়ে আড্ডা, তরুণীদের উত্ত্যক্ত করা, মাদক সেবন ও সাধারণ মানুষকে অহেতুক হয়রানি করে। পাশাপাশি চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ করে।

শুক্কুর বাহিনীর এক সদস্য জানায়, সড়ক দুর্ঘটনায় বাবা মারা গেছে ছয় বছর বয়সে। পরে মা অন্য জায়গায় সংসার করছেন। ছোটবেলা থেকেই পথে পথে ঘুরতে হয়। এ সময় এক লোক তাকে শুক্কুরের কাছে নিয়ে যায়। তখন তার বয়স ছিল ১১-১২ বছর।

রাহাত হোসেন নামে এক অভিভাবক বলেন, আমি বেসরকারি একটি চাকরি করি। এক ছেলে এক মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে আমার সংসার। বেশ ভালোই চলছিলাম। হঠাৎ করেই আমার ছেলে পাড়ার অন্য বখাটেদের সঙ্গে মিশতে শুরু করে। এক পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আমার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (অপরাধ দক্ষিণ) ইলতুৎমিশ সমকালকে বলেন, গত এক মাসে কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা হয়েছে। কিশোর অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত বেশিরভাগই ভাসমান ও বস্তিতে বড় হওয়া মানুষ। তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে।

টঙ্গী পূর্ব থানার ওসি মো. জাবেদ মাসুদ সমকালকে বলেন, করোনাকালে কিশোর অপরাধ বেড়েছে। শুধু আইন দিয়ে কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। পারিবারিক শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক অনুশাসন জোরদার করতে হবে।