জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (আইইডিসিআর) গত এক সপ্তাহে ২২ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট করোনাভাইরাস পজিটিভ শনাক্ত হয়েছেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ এবং ল্যাবরেটরিতে তা পরীক্ষার কাজে তারা যুক্ত। অর্ধেকের মতো টেকনোলজিস্ট করোনা সংক্রমিত হওয়ায় এ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইইডিসিআরের এক টেকনোলজিস্ট সমকালকে বলেন, অর্ধেকের মতো টেকনোলজিস্ট সংক্রমিত হওয়ার কারণে তাদের দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হচ্ছে। কিন্তু তারপরও নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে।

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর সমকালকে বলেন, করোনার ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের মধ্যে এ ধরনের ঘটনা উদ্বেগজনক। এর পরও আইইডিসিআর কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর প্রায় সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের চিত্র একই রকম। আগের দুই ঢেউয়ের তুলনায় এবার চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরাও বেশি সংক্রমিত হচ্ছেন। হাসপাতাল ভেদে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ আক্রান্ত পাওয়া যাচ্ছে। সংক্রমিত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নির্জনবাসে (আইসোলেশন) যেতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র ও রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম সমকালকে বলেন, চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্তের হার যেভাবে বাড়ছে, তাতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ তৈরি হবে। আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহ খুব গুরুত্বপূর্ণ। সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী ধারা এ সময় ঊর্ধ্বমুখী থাকবে। এরপর ধীরে ধীরে সংক্রমণ কমতে শুরু করবে। সুতরাং সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। অন্যথায় পরিস্থিতি বিপজ্জনক হতে পারে।

জানা গেছে, গত ২৪ জানুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে একসঙ্গে ৩৪ জন চিকিৎসক করোনা পজিটিভ শনাক্ত হন। এর আগে ২০ জানুয়ারি ২৯ জন চিকিৎসকের পজিটিভ আসে। করোনার ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির কয়েকটি বিভাগের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর অনেকের লক্ষণ-উপসর্গ থাকায় সবার নমুনা পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৭ জানুয়ারি ৪৫ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। তাদের মধ্যে শনাক্তের হার ছিল ৪৩ দশমিক ৩ শতাংশ। আগের দিন ১৬ জানুয়ারি নমুনা দেওয়া ১৭ জন চিকিৎসকের মধ্যে ১৪ জন, চারজন নার্সের মধ্যে তিনজন এবং পাঁচ স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে তিনজনের পজিটিভ শনাক্ত হয়। ১৫ জানুয়ারি ১১ জন চিকিৎসকের মধ্যে পজিটিভ হন সাতজন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. টিটো মিঞা সমকালকে বলেন, গত এক সপ্তাহে ঢাকা মেডিকেলে দুইশর ওপরে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী সংক্রমিত হয়েছেন। অনেক বিভাগ অর্ধেক জনবল নিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সংক্রমণ আরও বাড়লে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক আকার ধারণ করবে।

এত বেশি সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী কেন সংক্রমিত হচ্ছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে টিটো মিঞা বলেন, আগের ইউকে ও ডেলটা ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন সংক্রমণপ্রবণ। একজন চিকিৎসক ঘরের বাইরে বের হলে অবশ্যই মাস্ক পরেন। এরপরও তার সংক্রমিত হওয়ার মূল কারণ, তাদের সরাসরি রোগীর সংস্পর্শে যেতে হয়। অনেক রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে মাস্ক পরা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে অনীহা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এতে করে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সংক্রমিত হচ্ছেন।

রাজধানীর জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালেও সংক্রমণ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। হাসপাতালের পরিচালক ডা. সাইদুল ইসলাম সমকালকে বলেন, চিকিৎসকদের মধ্যে সংক্রমণ কিছুটা কম। তবে নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর প্রায় ৫০ শতাংশ করোনা সংক্রমিত হয়েছেন। এ কারণে চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজধানীর শ্যামলী ২৫০ শয্যা টিবি হাসপাতালের উপ-পরিচালক ও প্রকল্প পরিচালক ডা. আবু রায়হান সমকালকে বলেন, ল্যাবে কাজ করা স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে সংক্রমণ অনেক বেশি। এ ছাড়া চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সংক্রমিত হয়েছেন। এর ফলে চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

বারডেম জেনারেল হাসপাতালসহ বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির অধিভুক্ত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪০ শতাংশ চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী করোনা পজিটিভ হয়েছেন। ডায়াবেটিক সমিতির সেন্টার ফর গ্লোবাল হেলথের প্রকল্প পরিচালক ডা. বিশ্বজিৎ ভৌমিক সমকালকে বলেন, সংক্রমণ পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গত দুই সপ্তাহে ডায়াবেটিক সমিতির অধিভুক্ত হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী মিলে প্রায় ৪০ শতাংশ সংক্রমিত হয়েছেন। এটি উদ্বেগের। সবার প্রতি আহ্বান থাকবে, যেন শতভাগ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেন।

রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিচালক ডা. খলিলুর রহমান সমকালকে বলেন, মাইক্রোবায়োলজি এবং রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের সংক্রমণের হার অনেক বেশি। এর বাইরে অন্যান্য বিভাগে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সংক্রমিত হয়েছেন। ফলে চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যাওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।

সংক্রমিত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের তালিকা করছে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)। সংগঠনটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সালের মার্চ থেকে গত ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী মিলে ৯ হাজার ৪৯৪ জন সংক্রমিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে চিকিৎসক তিন হাজার ১৩৬ জন, নার্স দুই হাজার ৩০৪ জন এবং স্বাস্থ্যকর্মী চার হাজার ৫৪ জন।

বিএমএ মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী সমকালকে বলেন, চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা এভাবে আক্রান্ত হতে থাকলে পরিস্থিতি খুব খারাপ হবে। প্রথম ঢেউয়ের সময় হাসপাতালে ডিউটি করে বাসায় যেতে হতো না। হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এখন কিন্তু সেটি নেই। এখন হাসপাতালে ডিউটি শেষে বাসায় যেতে হয়। এতে করে পরিবারের সদস্যদের জন্যও ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এরপরও চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সেবা দিতে পিছপা হচ্ছেন না। সরকারের প্রতি আহ্বান থাকবে, কভিড ইউনিটে দায়িত্ব পালনকারী চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আগের মতো কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করা হোক।

তবে আগের মতো কোয়ারেন্টাইনের বিষয়ে কিছু বলেননি স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি সমকালকে বলেন, চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা অধিক হারে সংক্রমিত হতে থাকলে স্বাস্থ্যসেবায় বিরূপ প্রভাব ফেলবে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী, আইসোলেশনের সময়সীমা কমিয়ে আনা হয়েছে। পজিটিভ শনাক্ত হওয়ার পর সংক্রমিত ব্যক্তি ১৪ দিনের পরিবর্তে পাঁচ দিন আইসোলেশনে থাকবেন। গুরুতর অসুস্থতা অনুভব না করলে পাঁচ দিন পর কাজে যোগদান করতে পারবেন। তবে বাধ্যতামূলক মাস্ক পরতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। অন্যথায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে।