বেশ কবছর ধরেই ওকে খুঁজছি বেইলি রোড থেকে রমনা পার্ক হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল পর্যন্ত এলাকায়। বেইলি রোডে ওর প্রিয় যত কাঠবাদাম গাছ ছিল সব তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য দেখা মেলেনি। একদিন দুপুরে সার্কিট হাউস রোড থেকে বেরিয়ে রমনা পার্কে হাঁটছি। আমার মাথার ওপর দিয়ে সে দ্রুত উড়ে গেল। ওর ওড়ার পথে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে থাকলাম শুধু, ছবি তুলতে পারলাম না। এর বেশ কিছুদিন পর মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে গেলাম প্রজাপতির ছবি তুলতে। বাসায় ফেরার খানিক আগে বিমানবাহিনীর ফায়ারিং গ্রাউন্ডের কাছে গামারি গাছের নিচে যেতেই 'ক্রি-অ্যার-ক্রি-অ্যার ... ' ডাক কানে এলো। সঙ্গে ছিল ছেলে নাফিম রহমান। এবার ওর একটা পরীক্ষা নিলাম। বললাম, 'দেখ তো বাবা কোথা থেকে ডাকটি আসছে? ওকে খুঁজে পাও কিনা?' দুই মিনিটের মধ্যে ছেলে পাখিটিকে খুঁজে বের করল। এরপর এদিক-ওদিক খুঁজে খানিকটা দূরে ওর সঙ্গীরও দেখা মিলল। মনটা প্রশান্তিতে ভরে উঠল। কিন্তু গাছের সবুজ পাতার নিচে লুকিয়ে থাকায় ভালো ছবি তুলতে পারলাম না।

এরপর বহুদিন কেটে গেছে। একদিন আমার কিছু পক্ষীসঙ্গীর সঙ্গে বগুড়া গেলাম সুমচা (Indian Pitta) ও দুধরাজ (Indian Paradise Flycatcher) পাখির ছবি তুলতে। শাজাহানপুর উপজেলার গণ্ডগ্রামে দুধরাজের ছবি তোলার সময় বগুড়ার পক্ষী বিশেষজ্ঞ ও প্রাণিবিজ্ঞানের শিক্ষক ড. এসএম ইকবাল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হলো। তিনি আমাদের সুমচা পাখি দেখালেন এবং দেশের সবচেয়ে বড় টিয়ার সন্ধান দিলেন। দুপুরের খাবারের পর তার দেওয়া ঠিকানামতো দেমাজানি গ্রামে একটি বাজারের কাছে গেলাম এবং বিশাল একটি পুরোনো গাছের ওপর ওদের বাসার সামনেই সবচেয়ে বড় টিয়ার দেখা পেলাম। একটি নয়, দুটি নয়, সংখ্যায় ছিল সাত-আটটি। এর আগে এত খোলামেলাভাবে ওদের কখনও দেখিনি। রৌদ্রোজ্জ্বল আলোয় ওদের বেশকিছু ভালো ছবি তুলে বগুড়া শহরের দিকে পা বাড়ালাম।

অনেক অপেক্ষার পর যে টিয়ার একটি ভালো ছবি তুলতে পারলাম, সেটি হলো এ দেশের বিরল আবাসিক পাখি চন্দনা টিয়া। চন্দনা বা বড় টিয়া নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Alexandrene Parakeet, Large Indian Parakeet বা Large Parakeet. বৈজ্ঞানিক নাম Psittacula eupatria. বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাখিটি বসবাস করে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় টিয়া চন্দনার দেহের দৈর্ঘ্য ৫৬-৬২ সেন্টিমিটার (সেমি); যার মধ্যে লেজই ২৮-৩৫ সেন্টিমিটার। প্রসারিত ডানা ৩৭-৪৩ সেন্টিমিটার ও ওজন ২২০-৩০০ গ্রাম। পালকের মূল রং ঘাস সবুজ। স্ত্রীর তুলনায় পুরুষ খানিকটা বড় হয়। স্ত্রী ও পুরুষের মধ্যে কিছুটা পার্থক্যও রয়েছে। পুরুষের থুতনি কালো ও গলায় গোলাপি পাটল রিং বা বলয় রয়েছে যা স্ত্রী পাখিতে অনুপস্থিত। স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে দেহের ওপরটা ঘাস সবুজ, ডানার গোড়া আলতা-লাল, দেহতল টিয়ে সবুজ, লেজের উপরিভাগ নীলচে ও তলা হলদে-সবুজ। বড়শির মতো বাঁকা চঞ্চুটি লাল যার আগা কমলা লাল। চোখ লেবু-সবুজ, চোখের বাইরের দিকে সরু নীল বলয় ও চোখের পাতা কমলা-হলুদ। পা ও নখ ধূসর। অল্পবয়স্ক পাখি দেখতে অনেকটা স্ত্রী পাখির মতো।

চন্দনা টিয়া প্রধানত ঢাকা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ঘন প্রাকৃতিক বন-বাগানে বাস করে। সচরাচর জোড়ায় বা ছোট দলে থাকে। কাঠবাদাম সবচেয়ে পছন্দনীয় খাবার। এ ছাড়া ফল, শস্যদানা, ফুলের অংশ, কুঁড়ি, ফুলের রস, সবজি ইত্যাদি খায়। সচরাচর ওড়ার সময় 'ক্রি-অ্যার-ক্রি-অ্যার-ক্রি-অ্যার ... ' শব্দে ডাকে।

নভেম্বর থেকে এপ্রিল প্রজনন মৌসুম। এ সময় তুঁত, নারিকেল ও বিভিন্ন ধরনের নরম গাছের খোঁড়লে, বট-পাকুর গাছের প্রাকৃতিক কোটরে, কাঠঠোকরার পরিত্যক্ত বাসায় এবং কদাচ দালানের ফাটলে বাসা বানায়। স্ত্রী চার-ছয়টি সাদা রঙের ডিম পাড়ে। ডিম ফোটে ২৩-২৭ দিনে। ছানারা প্রায় সাত সপ্তাহে উড়তে শিখে। আয়ুস্কাল সাত-আট বছর। পোষা পাখি হিসেবে ব্যাপক চাহিদার কারণে বুনো পরিবেশে বিশ্বব্যাপী ওদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। তবে আশার কথা হলো, বর্তমানে দেশে ওদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
লেখক: অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর