'এক সময় এই থানার মেইন গেটের বাইরে লোকজন কান্নাকাটি করত। এখন সে দৃশ্য আর দেখা যায় না। মানুষ নির্ভয়ে থানায় ঢুকে সেবা নিচ্ছে। আসলে সব সময় পরিস্থিতি এক রকম থাকে না। এখন আর প্রদীপের সেই বন্দুকযুদ্ধের কেচ্ছা শুনতে হয় না।'

বলছিলেন টেকনাফ থানার পাশের দোকানি বাদশা মিয়া। সরেজমিন দেখাও গেল, এখন সব সময় খোলা থাকে এ থানার মেইন গেট। অথচ থানা থেকে সেবা পাওয়ার অধিকার থাকলেও আগে মানুষ ভয় পেত ভেতরে যেতে। মাদক উদ্ধারের নামে হরহামেশা ক্রসফায়ার ঘটার কথা জানিয়ে মানুষের মধ্যে ত্রাস তৈরি করে রেখেছিলেন সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাস।

সেনাবাহিনীর মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান নিহত হওয়ার পর প্রদীপের এসব অপর্কম ফাঁস হয়ে যায়। এখন আর এই সীমান্তে মানুষের মৃত্যু সংবাদে কারও ঘুম ভাঙে না।

এমন প্রেক্ষাপটে আজ ৩১ জানুয়ারি আদালত বহুল আলোচিত মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলার রায় দিতে চলেছেন। রায়ে সাবেক ওসি প্রদীপসহ ১৫ আসামির কী হয়, তা জানতে উদগ্রীব সীমান্তসহ সারাদেশের মানুষ। রায়ের জন্য বিশেষভাবে প্রতীক্ষার প্রহর গুনছে নিহত সিনহার পরিবার।

মরদেহ বহনকারী লেগুনাচালক আবদুল মোনাফ বলেন, 'থানা আর আগের মতো নাই। বদলে গেছে। এখন প্রতিদিন লাশ টানতে হয় না। প্রদীপ থাকতে প্রতি রাতেই লাশ টানতে হতো। বন্দুকযুদ্ধে আহত-নিহতদের হাসপাতালে আনা-নেওয়া করতাম। এখন এসব নেই।'

ক্রসফায়ার বন্ধ, তবে মাদক থামছে না :সীমান্তের বাসিন্দারা জানান, মাদক ও চোরাচালানের পয়েন্ট হিসেবে পরিচিত টেকনাফে এখনও মাদক পাচার অব্যাহত রয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তৎপর এবং মাদকের চালান উদ্ধারও করছে। এটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে- মাদকের আগ্রাসন থামাতে 'বন্দুকযুদ্ধ', 'আত্মসমর্পণ', 'ঝটিকা অভিযান', 'গায়েবি হামলা', 'গ্রেপ্তার-মামলা'- এসব দাওয়াই কাজ দেয়নি। তাই নতুন কৌশলে এখন চাঙ্গা হয়ে উঠেছে মাদকের বাজার; বিশেষত মাদক আইসের বাজার। যদিও বহু আগে থেকেই মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের 'জিরো টলারেন্স' জারি আছে।

পুলিশ জানায়, সিনহা হত্যার ঘটনার পর টেকনাফ উপজেলায় মাদকবিরোধী অভিযানে চলতি বছরে দেড় লাখ পিস ইয়াবাসহ ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে ২০২১ সালে ৭ লাখ ৩৫ হাজার ৩০৫ পিস ইয়াবা, ৩ কেজি ৪০ গ্রাম আইস ও ১০০ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনায় ১৩৫টি মামলাসহ ২০২ জন মাদক পাচারকারী গ্রেপ্তার হয়। এ ছাড়া অস্ত্রধারীসহ বিভিন্ন অপরাধে ১৯৬ জন রোহিঙ্গাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে আটটি পিস্তলসহ ৩০টি দেশি অস্ত্র পাওয়া যায়। এসব ঘটনায় ৫৮৪টি মামলা রুজু করা হয়েছে। যেগুলোর মধ্যে ২১টি খুন, সাতটি অপহরণ এবং বাকি ৫৫৬টি মাদক মামলা। এ সময় গ্রেপ্তার করা হয়েছে সাজাপ্রাপ্ত আসামিসহ ১০৪৪ জনকে। অধিকাংশ মাদক মামলাই এদের বিরুদ্ধে।

সিনহা হত্যার আগে ২০১৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২০ সালের ২৫ জুলাই পর্যন্ত তৎকালীন ওসি প্রদীপের সময় মাদকবিরোধী অভিযানে ২২ মাসে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ১২৩ জন নিহত হয়েছিল, যাদের পুলিশ ডাকাত ও মাদক কারবারি হিসেবে দাবি করে। গ্রেপ্তার হয় সাড়ে ২৭ লাখ ইয়াবাসহ ১৯৬৮ জন আসামি। এসব ঘটনায় ৯২৪টি মামলা করা হয়। এ সময় বিজিবি ও র‌্যাব সদস্যদের পৃথক অভিযানে বন্দুকযুদ্ধে ৭৪ জন নিহত হন।

২০২০ সালের ৩১ জুলাই মেরিন ড্রাইভ শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে মেজর (অব.) সিনহা নিহত হওয়ার পর দীর্ঘ পাঁচ মাস পুলিশের সঙ্গে কোনো 'ক্রসফায়ার' বা 'বন্দুকযুদ্ধে' নিহতের ঘটনা ঘটেনি টেকনাফে। এর আগে ২০১৮ সালের ২৬ মে কক্সবাজারের টেকনাফের ওয়ার্ড কাউন্সিলর একরামুল হককে বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যার ঘটনার পর প্রকাশিত অডিওর কারণে 'ক্রসফায়ার' নিয়ে নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। তবে সিনহা হত্যায় জড়িতরা বিচারের মুখোমুখি হলেও একরামের পরিবার গত প্রায় চার বছরে কোনো মামলাই করতে পারেনি।

সর্বশেষ ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি টেকনাফের রাজারছড়া এলাকায় পুলিশের কাছ থেকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় খোরশেদ আলম।

বর্তমানে থানার পরিস্থিতি সম্পর্কে ওসি হাফিজুর রহমান বলেন, অস্বীকার করার উপায় নেই যে, টেকনাফকেন্দ্রিক সবচেয়ে বড় অপরাধ মাদক চোরাচালান। তা ছাড়া নারী নির্যাতনের ঘটনাও আছে। এলাকায় পুরোনো কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ী নতুন করে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। পুলিশ চিহ্নিত মাদক কারবারিদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছে। তিনি জানান, গত এক বছরে সাড়ে ৮ লাখ পিস ইয়াবাসহ ২ শতাধিক মাদক পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।